ফতোয়াবাজের দেশে শুভবোধ ফিরবে না

ফারদিন ফেরদৌস:

অবশেষে ‘দেশের শীর্ষ উলামা মাশায়েখ’ নামের Self proclaimer গণলিখিত ফতোয়া দিয়েছেন। ফতোয়ায় বলা হয়েছে, মানুষ বা অন্য যেকোনো প্রাণীর ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ভাস্কর্য ও মূর্তি দুই-ই শরিয়তে নিষিদ্ধ। পূজার উদ্দেশ্যে না হলেও ভাস্কর্য সন্দেহাতীতভাবে নাজায়েজ, হারাম এবং কঠোর আজাবযোগ্য গুনাহ।

এই ফতোয়ায় দেশের ৯৫ জন মুফতি ও উলামায়ে কেরাম স্বাক্ষর করেছেন। তারা নিজেরাই নিজেদেরকে শীর্ষ আলেম বলে উল্লেখও করেছেন।

এই রাষ্ট্র তো শরিয়া বেইজড না, তাহলে আপনাদের ফতোয়া কার্যকর করবে কারা? এইবার কি তবে আরো কয়েকটি ফতোয়া দেয়া হবে এমনভাবে…

¶ নারী নেতৃত্ব হারাম, তাই শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে মৌলভীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এরশাদের মতো সচ্চরিত্রবান কোনো পুরুষের কাছে…

¶ গণতন্ত্র হারাম, ভোট হারাম, তাই এসব ছেড়ে খেলাফত কায়েম করতে হবে…

¶ মৌলভীদের কাছেই থাকবে রাজনীতির চাবিকাঠি, তাই পুলিশ, আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স এবং বিমানের পাইলট নারীদের বোরখা পরতেই হবে, নইলে পুরুষের বেহেশতে যাওয়া মারাত্মক ডিস্টার্বেন্সে পড়বে…

¶ অতঃপর সেই আগেকালের মতো ফতোয়া আসবে, ট্রেন নিষেধ, ইংরেজি পড়া নিষেধ, মেয়েদের পড়াশোনা নিষেধ, টিভি, রেডিও, পত্রিকা, বিশ্ববিদ্যালয়, ইশকুল সব নিষেধ…

¶ থাকবে শুধু ঘরে ঘরে কওমী মাদ্রাসা। সেখানকার একশ্রেণীর শিক্ষকরা লুত(আ.) এর জমানার মতো অযাচারে লিপ্ত হলেও কোথাও কোনো রাও-শব্দ হবে না…

উল্লেখিত এইসব ফতোয়া যদি না দিতে পারেন, তাহলে জানবেন আপনারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য এক ধরনের গর্দভতুল্য ফতোয়াবাজ। আপনাদের ফতোয়ায় আসলে কারো কিছু এসে যায় না।

আপনারা ফতোয়া দেয়ার আগে থেকেই আমরা জানি মূর্তি এবং ভাস্কর্য এক। ধর্মদর্শন এসব সমর্থন করে না। কিন্তু কেউই আজ পর্যন্ত ধর্ম ও শৈল্পিক ঐতিহ্যের বিষয়টিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সাংঘর্ষিক অবস্থায় নিয়ে যায়নি, আপনাদের মতো গুটিকয়েক রাজনৈতিক অভিলাষী ছাড়া।

মানুষ ধর্ম মেনেই চলছে, তারপরও হাজার বছরের ভাস্কর্যের সুকুমার বৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবার মতো গোঁড়ামি করেনি। মুসলিমদের পিতৃভূমি খোদ সৌদি আরবেও বিপুলসংখ্যক দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য আছে। বাকিসব মুসলিম দেশে তো হাজারও ভাস্কর্য রয়েছেই।

মানুষ যদি বাঙালি মৌলভীদের মতো গোঁড়ামি ও ব্যাকডেটেড সংস্কারে আটকে থাকতো তবে নারীরা দেশ শাসন করতে পারতেন না। নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারতেন না।

আমাদের সময়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, বেনজির ভুট্টো ও সুকর্ণপুত্রী। আর ইতিহাসে আছে মুসলিম প্রধান দেশ মিসর, ইয়েমেন, ইরান, মধ্য এশিয়া, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ায় সার্বভৌম মুসলিম রানীরা শাসন করেছিলেন। তারা কোনো রাজাদের অলঙ্কার-মার্কা রানী ছিলেন না, তারা ছিলেন রাজদণ্ডধারী সার্বভৌম শাসনক্ষমতার অধিকারী মুসলিম রানী। তাদের কারও কারও নিজের নামে মুদ্রা ছিল, তাদের অনেকের নামে মওলানারা দোয়া (খুতবা) করতেন মসজিদে। ‘নেত্রীত্ব’ বনাম নেতৃত্ব -শীর্ষক নিবন্ধে লেখক হাসান মাহমুদ তেমন ১৭ জন সার্বভৌম মুসলিম রানীর উদাহরণ দিয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফাতিমা মার্নিসির বই ‘ইসলামের বিস্মৃত রানীগণ’ (দ্য ফরগটেন কুইনস অফ ইসলাম) পৃষ্ঠা ৯০-৯১ থেকে–

• ১২৩৬ সাল দিল্লি, মানুষের ইতিহাসে একমাত্র কুমারী রানী সুলতানা রাজিয়া। তখনকার খলিফা আমিরুল মুমেনিনের সমর্থনও পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর মুদ্রায় খোদাই করা আছে:

“সুলতান ইলতুৎমিসের কন্যা মালিকা ইলতুৎমিস, যিনি আমিরুল মুমেনিনের সম্মান বাড়ান।” মুদ্রাটা এখনও থাকার কথা কোলকাতার মিউজিয়ামে।

• ইরানের তুরকান অঞ্চলের রানি তুরকান খাতুন, ১২৫৭ থেকে ১২৮২ পর্যন্ত একটানা ২৫ বছর। মসজিদে তাঁর নামে খুতবা পড়া হতো।

• তুরকান খাতুনের কন্যা পাদিশা খাতুন। নামাঙ্কিত মুদ্রা।

• ইরানের সিরাজ অঞ্চলে আবশ খাতুন। ১২৫৩ থেকে ১২৮৭, একটানা ৩৪ বছর। খুতবা ও নামাঙ্কিত মুদ্রা, দুটোই ছিল।

• ইরানের লুরিস্থান অঞ্চলের ১৩৩৯ সালের মুসলিম রানি (নাম জানা নেই)।

• রানি তিন্দু, ১৪২২ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত (জায়গা সম্বন্ধে মতভেদ আছে)।

• মালদ্বীপের সুলতানারা খাদিজা, মরিয়ম ও ফাতিমা। ১৩৪৭ থেকে ১৩৮৮, একটানা ৪১ বছর। এক সময়ে ইবনে বতুতা সেখানকার সরকারি কাজি ছিলেন।

• ইয়েমেনের সুলায়হি (শিয়া-খেলাফত?) বংশের দুই রানি আসমা ও আরোয়া, প্রায় ৫০ বছর রাজত্ব করেছেন। মসজিদে তাদের নামে খুতবা হত।

• ১২৫০ সালে মিসরের রানি সাজারাত আল দুর, ১২৫৭ থেকে ১২৫৯, মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত দুবছর। তাঁর নামে মুদ্রা ও মসজিদে খুতবা দুটোই। মামলুক খেলাফতের সমর্থনও পেয়েছিলেন তিনি।

• সুলতানা ফাতিমা, মধ্য এশিয়ায় কাসেমি খেলাফতের শেষ সার্বভৌম সুলতানা, শাসন করেছেন ১৬৭৯ থেকে ১৬৮১ দুবছর।

• ইন্দোনেশিয়ায় ১৬৪১ থেকে ১৬৯৯ পর্যন্ত ৫৮ বছর ধরে একটানা শাসন করেছেন সুলতানা শাফিয়া, সুলতানা নুর নাকিয়া, সুলতানা জাকিয়া, ও সুলতানা কামালাত শাহ। ওখানকার মওলানারা মক্কা থেকে ফতোয়া এনে সুলতানাদের উৎখাত করার চেষ্টা করেও পারেননি রানিদের জনপ্রিয়তার জন্য।

অথচ এই উত্তরাধুনিককালে আমাদের দেশের মোল্লারা আটকে আছে প্রগতিবিরোধিতায়, মানবতাবিরোধিতায়। যুগে যুগে পুরুষেরা নিজেদের সুবিধাবাদের পক্ষে ফতোয়া দিয়েছে। নারীর কোনোরূপ ফতোয়া দেয়ার অধিকার নেই‌। একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী নারী নেতৃত্ব হারাম মনে করে। কিন্তু খালেদা জিয়ার বশ্যতা তারা স্বীকার করে আসছে। এটাকে তারা বলে পরিস্থিতির জন্য বিষয়টা তারা মেনে নিয়েছে। তাহলে এইসব ধর্মাচারীর সুবিধাবাদের সিচুয়েশন বিবেচনায় ‘ফতোয়া’ ক্ষণে ক্ষণে চেঞ্জও হতে পারে।

অথচ ধর্মীয় বাণী চিরকালের জন্যই অপরিবর্তনীয়। আসলে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিজেরাই জানে না, তারা আসলে কী যে জানে না। নামের পেছনে ব্র্যাকেটে দে.ব. লিখে গর্বিত বোধ করা এরা একদিকে ভারতের দেওবন্দকে তীর্থ মানে, দেওবন্দের সিলেবাসেই নিজেদের মাদ্রাসায় পড়ায়, আবার ব্যক্তিগত স্বার্থবিবেচনায় সেই দেওবন্দের ফতোয়াই এড়িয়ে যায়…

দেওবন্দের সেই আলেমদের সাম্প্রতিক কিছু ফতোয়া দেখে নেয়া যাক…

¶ হে মুমিন বান্দাগণ ছবি, ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়া হারাম। বিশেষ প্রয়োজন হলে পাসপোর্ট বা আইডি কার্ড জাতীয় কাজে শুধু ছবি ব্যবহার করা যাবে।

¶ হে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক ফেসবুক, ইউটিউবে ছবি শেয়ার করিও না।

¶ সিসিটিভি ব্যবহার করলে সে আর মুসলমান থাকবে না।( যদিও মক্কা মদিনাতে সিসি ক্যামেরা আছে)।

¶ হে খেলাফত মজলিস ছবি, ভিডিও ইহুদি নাছারা ও পৌত্তলিকতার সংস্কৃতি, এগুলোর সংশ্রবে ঈমান থাকবে না।

¶ ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করলে কাফের হয়ে যাবে।

বাঙালি মুসলমান বিশেষত যারা ভাস্কর্যবিরোধী, তারা কি দেওবন্দের ফতোয়া মানেন? এক কথায় উত্তর মানেন তো নাই-ই, বরং ইহুদিদের সোশ্যাল মিডিয়া পারলে পানিপড়ার মতো গিলে খায়, তাবিজ বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখে। কারণ এখানে প্রচার পাবার জাদু আছে, অর্থের মধু আছে।

এবং আমরা হয়তো অচিরেই দেখবো একাত্তরের পরাজিত মোল্লাদের এইসময়ের বংশধরেরা ভাস্কর্যের রাজনীতি নিয়ে সঙ্গোপনে সরকারের সাথে মূলোমূলিতে লিপ্ত হবে, কিছু নগদনারায়ণ উপঢৌকন গ্রহণ করে মুখ বন্ধ করে রাখবে। মাঝখান থেকে তাদের হুজুগে শিষ্যসাবুদেরা পুলিশের প্যাদানি খাবে, আর বাপের কষ্টার্জিত টাকায় কেনা জুতো হারাবে। অথচ ওইসব ফতোয়াবাজ মৌলভীদের হারাবার কিচ্ছু নাই। সাদাসিধে অবুঝদার বশংবদদের জন্য ন্যূনতম ত্যাগ না থাকলেও আন্দোলনের গুড় পুরাটাই চিল্লাবাজ ও অন্ধকারে আলোচনাবাজ মৌলভীদের উদরপূর্তির খোরাক হবে।

অতঃপর মাদ্রাসার নিগৃহীত ও নির্যাতিত শিশুরা সেই তাদের আদিমতম তিমিরেই রয়ে যাবে। প্রতিদিন পত্রিকায় খবর হবে। আমরা সংবেদনশীল মানুষেরা খানিকটা আহ উহ করব, এইত। মাদ্রাসায় মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে না, অভিভাবকরাও সচেতন হবে না। বড় হুজুরের কাছে ধর্ষিত হতে হতে শিশুটি মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে গেলে জ্বীনে ধরেছে বলে পুনরায় সেই ধর্ষক হুজুরের কাছেই জ্বীন তাড়ানোর দাওয়াই খোঁজা হবে। এইভাবে দেশটায় জাহান্নাম জারি রাখা হবে ঠিকঠাক। কোথাও কেউ এই শিশুদেরকে নরক থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে না।

ভাস্কর্যের ফতোয়া স্তিমিত হবে। আবার এক নতুন ফতোয়া চাগাড় দিয়ে ওঠবে। কিন্তু শিশুদের জাহান্নামকে কেউ স্বর্গ গড়ে দেয়ার কথা বলবে না।

এইভাবে এক জগদ্বল পাথর বুকে নিয়ে শিশুরা মরে মরুক, ইহকাল ও পরকালে এইসব ফতোয়াবাজ মোল্লাদের স্বর্গসুখের সীমা পরিসীমা থাকবে না।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতির কুজ্ঝটিকাগ্রস্ত দেশটায়
পালিয়ে যাওয়া শুভবোধও আর কখনোই ফিরে আসবে না।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  • 199
  •  
  •  
  •  
  •  
    199
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.