‘ব্রেস্ট ট্যাক্স’ এর পরম্পরায় অন্যান্য নারীবাদী আন্দোলন

উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক:

পৃথিবী অনেক এগিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির চূড়ান্ত বিকাশের যুগ চলছে। মানুষের অধিকার নিয়ে আমরা খুব সচেতন। কিন্তু “নারীর” অবস্থা কী? পৃথিবীর এই অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখনও অধিকার বঞ্চিত। নারীর অধিকারের জন্য লড়াইও হচ্ছে। এই লড়াই নারীবাদ নামে পরিচিত। নারীবাদী আন্দোলন উনিশ শতকে শুরু হয়। উনিশ শতকের শেষ আর বিশ শতকের শুরুতে দেশে দেশে নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ষাটের দশকে নারী আন্দোলনে গুরুত্ব পায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা। ষাটের দশকে শুরু হওয়া প্রবল নারীবাদী আন্দোলনে ভিত কেঁপে ওঠে সনাতনপন্থীদের। নারীরা শুধু যে গৃহস্থালি কাজ আর সন্তান উৎপাদনের মেশিন নয়, তা সরবে জানিয়ে দেয় নারীবাদী আন্দোলনকারীরা।

৬০ দশকে একটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন হলো “ব্রা বার্নিং”। আমেরিকায় নারীরা রাস্তায় বেরিয়ে এসে ব্রা রাস্তায় স্তূপ করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাদের সাহসী উচ্চারণ পুরুষের “ভোগের” জন্য সুঠাম দেহ নয়, বরং বন্ধনহীন স্বাধীন জীবন। আন্দোলনে ভীত হয় পড়ে প্রতিক্রিয়াশীল সনাতনপন্থীরা। আন্দোলনকারীরা “মিস আমেরিকা” প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে। ১৯৬৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আটলান্টা সিটিতে আয়োজিত প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনে নামে।নারীর সৌন্দর্যের স্টান্ডার্ট নির্ধারণ কিংবা প্রতিযোগিতার নামে নারীকে “ভোগ্য” বস্তু রুপে নিলামে তোলার বিরুদ্ধে তারা রাস্তায় নামে।
তাদের হাতের প্লাকার্ডে লেখা ছিলো, “No more beauty standards”, ” Welcome to the cattle auction”.অনেক হলিউড অভিনেত্রীও আন্দোলনে শামিল হয়। ব্রা পোড়ানোর আন্দোলন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তবে এখন আবার সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে যখন জানা গেলো, ব্রা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ব্রা এর ব্যবহার কমাতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে। সেই লক্ষ্যেই সম্ভবত ২০১১ সাল থেকে বিশ্ব “নো ব্রা দিবস” পালিত হচ্ছে। (সুশান্ত ওঝা)

কেরালায় নিয়ম ছিলো ব্রাহ্মণ নারী ব্যথিত অন্য নারীরা তাদের স্তন ঢাকতে পারবে না! যদি ঢাকে তবে তাকে ট্যাক্স দিতে হতো। একে বলা হতো “ব্রেস্ট ট্যাক্স বা স্তন কর”। ট্রাভাঙ্কর রাজ্যে (বর্তমান ভারতের কেরালা) নিম্ন জাতি এবং অস্পৃশ্য হিন্দু নারীদের উপর ১৯২৪ সাল পর্যন্ত আরোপিত এক কর ছিল। নিম্ন বর্ণের নারীদের স্তন বর্ধনের সাথে সাথে প্রকাশ্য স্থানে স্তনযুগল ঢেকে রাখার জন্য সরকারকে এই কর পরিশোধ করতে হতো। নিম্নবর্ণের পুরুষরা তাঁদের মাথা ঢাকতে তলা-করম নামের কর দিতেন। ট্রাভাঙ্করের কর প্রধানরা প্রতিটি ঘরে গিয়ে যৌবনপ্রাপ্ত নারীদের থেকে কর সংগ্রহ করতেন। স্তনের আকারের ওপর ভিত্তি করে করের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই করের কারণ এবং স্তনের আকারের সাথে সম্পর্কের ঐতিহাসিক তথ্য একেবারে কম। (উইকিপিডিয়া)

স্থানীয় ভাষায় এই স্তন করকে বলা হয় মুলাক্কারাম। এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন সংঘটিত হয়। ১৮০৩ সালের ঘটনা। নাঙ্গেলী নামে এক নিম্নবর্ণের হিন্দু নারী এর প্রতিবাদ করেন এবং গায়ে কাপড় দিয়ে স্তন ঢাকেন। ফলে যারা ট্যাক্স তুলতো তারা তার কাছে ট্যাক্স দাবি করলে তিনি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার স্তনযুগল কেটে কলাপাতায় মুড়ে তাদের হাতে দেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু হয়। তার স্বামীও তার চিতার আগুনে আত্মাহুতি দেন। এই ঘটনার পর স্তন ট্যাক্স বন্ধ হয়। তবে গায়ে কাপড় দেয়ার জন্য আরো আন্দোলন করতে হয়। ১৮৫৯ সালে এ নিয়ে একটি দাঙ্গা হয় যা “কাপড়ের দাঙ্গা” নামে পরিচিত।

আমরা সেসব দিন ফেলে এসেছি। আজ ২১ শতকে। নারী কি আজও তার অধিকার পেয়েছে? তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, নিজের পছন্দমত চলার অধিকার??পুরুষতন্ত্র আর পুঁজিবাদের যাঁতাকলে পড়ে অধিকাংশ নারী (বিষেশত প্রান্তিক নারীরা) জানেই না তার অধিকার কী! এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অধিকার বঞ্চিত করে আমরা কি পারবো উন্নত সমাজ, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে?

মোটেও না! যদি নারীরা তাদের মর্যাদা আর সমঅধিকার নিয়ে জীবন ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে না পারে, তবে আমাদের উন্নত ও মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে!

আবার এদিকে ক্লাইটোরিস বা ভগাঙ্কুর হলো নারীদের সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল অংশ। শারীরিক সম্পর্কের সময় এই জায়গায় সবচেয়ে বেশি অনুভব সৃষ্টি হয়।
অথচ বিশ্বের এখনো ৩০ টি দেশের নারীদের ভগাঙ্কুর কেটে ফেলার ট্র্যাডিশন আছে। এটাকে ফিমেল সারকামসেশন বা নারীদের খৎনা বলা হয়। এটাকে Female Genital Mutilation বা সংক্ষেপে FGMও বলা হয়। জন্মের পর কয়েক মাস বয়স থেকে বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হওয়ার আগেই এটা সম্পন্ন করা হয়। ২০১৬ সালে সারা পৃথিবীতে ২০০ মিলিয়ন নারীর এই সারকামসেশন করা হয়।
আফ্রিকার দেশগুলোতে তো হয়ই, এর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ইয়েমেন মালয়েশিয়ার কিছু অংশে এই প্রথা চালু আছে। এমনকি লন্ডনে বসবাসরত অনেক মুসলিম পরিবার এখনো এটা মেনে চলে। এর মধ্যে বাংলাদেশীও আছে।
মেয়েদের যৌন আকাংখা যাতে কম থাকে বা যৌন সম্পর্ক পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে না পারে বা তাদের সতীত্ব যেন রক্ষা থাকে, এজন্য এফজিএম মূলত করা হয়।
আবার অনেক মুসলিম ও কিছু খ্রিস্টান সম্প্রদায় ধর্মীয় কারণ হিসেবে এটা করে।

(লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  • 167
  •  
  •  
  •  
  •  
    167
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.