মৌলবাদের স্বরূপ ও ভাস্কর্য ইস্যুতে আমাদের ব্যর্থতা

আলী আদনান:

এক.
সভ্যতা এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তারাই মৌলবাদি। তাদের চোখে সবই খারাপ, সবই হারাম। একসময় তারা বলতো, ইংরেজি শিক্ষা হারাম। যদিও এখন বাংলাদেশে মৌলবাদিদের প্রথম সারির নেতা যারা আছেন তাদের অনেকের সন্তানরাই দেশের বাইরে শুধু যে ইংরেজি পড়ছে বা শিখছে তা নয়, বরং তাদের পুরো জীবন পদ্ধতিটাই পশ্চিমা সভ্যতার আদলে করে নিয়েছে। এই মৌলবাদিগোষ্ঠী একসময় বাংলাকে ‘হিন্দুয়ানী’ ভাষা বলে চালাতে চেষ্টা করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, উর্দু মুসলমানের ভাষা, আর বাংলা হিন্দুর ভাষা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলো তাও ধর্মের দোহাই দিয়ে। দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু প্রতি পদে পদে মৌলবাদি শক্তিটির অজুহাত কমলো না। তাদের চোখে সবই হারাম।

তারা একসময় বলতো ছবি তোলা হারাম, ভিডিও করা হারাম। যদিও এখন সেই ভিডিও থেকেই ওরা আয় করছে। ইউটিউব ছাড়া হুজুরদের বাজার এখন অচল হয়ে যাবে। এরা একসময় মাইক হারাম বলেছিল। পরে নিজের সুবিধার্থে ফতোয়া দিল, ভালো কাজে মাইক ব্যবহার করা যাবে। একসময় তারা টেলিভিশনকে হারাম বলেছিল। “গ্রামে টেলিভিশন ঢোকানো যাবে না” এমন বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করে ফেলেছেন। কিন্তু গত দুই দশকে এই মৌলবাদীগোষ্ঠী এদেশে অনেকগুলো প্রাইভেট চ্যানেলের মালিকানা নিয়েছে। দেশে এখন এমন কোন টেলিভিশন চ্যানেল নেই যেখানে তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠান বানাচ্ছে না। যে টেলিভিশনের বিরুদ্ধে একসময় তারা ফতোয়া দিত সেই টেলিভিশন এখন তাদের আয়ের উৎস, নিজেদের ব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম হাতিয়ার। তারা একসময় নারী নেতৃত্বকে হারাম বলেছিল। তবে একথা এখন বলে না। কারণ একথা বললে তাদের খুঁটি ঝুঁকির মুখে পড়বে। জিহাদিরা জিহাদ করবে, কিন্তু খুঁটি নাড়ানোর রিস্ক নিতে রাজী নয়।

তারা একে একে সবকিছুরই বিরোধিতা করেছে। মানুষ চাঁদে গিয়েছে। তারা বললো, এসব হারাম ও মিথ্যাকথা। এটা সম্ভব না। দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রচারে সরকার ও এনজিওগুলো এগিয়ে আসলো। তারা বললো, জন্মনিয়ন্ত্রণ হারাম। “মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি” এমন একটা কথাকে তারা জনপ্রিয় করার চেষ্টা করলো। আশ্চর্য্য হলেও সত্য, ২০২০ সালের শেষ সময়ে এসেও এদেশে অনেকে একথা মন থেকে বিশ্বাস করে। পাশাপাশি এটাও সত্য, জন্মনিয়ন্ত্রণ এ প্রজন্মের অনেকের কাছেই জনপ্রিয়। তারা কো- এডুকেশনের বিরোধিতা করলো। যদিও কো- এডুকেশন ছাড়া আজকের পৃথিবী কল্পনা করা যায় না। মেয়েরা চাকরি করবে- মৌলবাদীরা সেটার বিরোধিতাও করলো। তাদের দাবি, নারীরা হচ্ছে শস্যক্ষেত্র। সন্তান উৎপাদন, স্বামীর মনোরঞ্জন ও ঘরসংসার সামলানো নারীর কাজ। এভাবে তারা বিরোধিতা করেই যাচ্ছে। তাদের কাছে নাচ হারাম, গান হারাম, ছবি আঁকা হারাম, ছবি দেখা হারাম, পুরুষের টাখনুর নিচে কাপড় পরা হারাম, নারীর মুখ খোলা রাখা হারাম, মাথায় কাপড় না দেওয়া হারাম। এরকম তালিকা লিখে শেষ করা যাবে না।

তারা এই হালাল হারামের ফতোয়াটা দেয় ধর্মের দোহাই দিয়ে। এবং নিজেকে নিরাপদ রেখে। দেশের মাদ্রাসাগুলো আজ বলাৎকারকারীদের জন্য নিরাপদ স্থান। এটা নিয়ে তারা কিছু বলে না। কৌশলে সেটা এড়িয়ে যায়। প্রেমিক – প্রেমিকা নিজের মতো করে একা বসে কথা বলবে, এ বিষয়টি যারা মানতে পারে না, নারী পুরুষের স্বাভাবিক মেলামেশা দেখলে যারা হৈ হৈ করে উঠে, আজ তাদের বলাৎকারের মুখেই আমাদের ছোট সোনামণিদের প্রজন্মটা হুমকির মুখে পড়েছে। এটা নিয়ে কিন্তু তাদের কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তারা ওয়াজ করে, একটাকা সুদ খেলে সাতটা যেনা (ব্যাভিচার) – এর সমান অপরাধ। অথচ তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসা, এতিমখানা, মাজারে কী পরিমাণ হরিলুট চলে তা কারো নজরে আসেনা। এমন প্রসঙ্গ আসলে হয় তারা এড়িয়ে যায় নয়তো বলবে- “সবাই এক সমান না। সব জায়গায় ভাল খারাপ আছে”।

আজ থেকে কয়েক দশক আগেও তারা বলত, অন্য ধর্মাবলম্বীদের বাড়ীতে খাওয়া হারাম, তাদের পূজা দেখা হারাম, তাদের সাথে বাণিজ্য বা লেনদেন করা হারাম। কিন্তু এখন সেই অন্য ধর্মাবলম্বীদের তৈরি পণ্য মোবাইল, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনসহ নানা ধরনের পণ্য তারা দেদারছে ব্যবহার করছে। এখন সেটা আর ‘হারাম’ নয়। গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক সহ ইন্টারনেট জগতে তাদের যে রমরমা অবস্থান – তখন কিন্তু তারা ভুলে যায়, এসব কোনটাই মুসলমানদের আবিষ্কার নয়। সারাদিন যাদের ইহুদি বা নাছারা বলে গালি দিয়ে মুখে ফেনা তুলি তাদের উৎপাদিত পণ্য দিয়েই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখি। অন্য ধর্মাবলম্বীদের পূজা দেখা হারাম। কিন্তু পূজার অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জার জন্য লাইট বা ডেকোরেশান ভাড়া দেওয়া হারাম নয়। বৈশাখী উৎসব হারাম, কিন্তু বৈশাখী ভাতা হারাম নয়।

এসব নিয়ে আপনি যতোই যুক্তি দেন না কেন, তারা যুক্তির ধারও ধারবে না। মৌলবাদিরা সবসময় অস্থির, অসহিষ্ণু ও খিটখিটে স্বভাবের হয়। তারা দু’লাইন শোনার আগে বা পড়ার আগে ‘নাস্তিক’ ‘কাফের’ গালি দিয়ে উঠবে ও পরকালে আমাদের কী কী ভয়াবহ পরিণাম হবে তা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করতে করতে বিদায় নিবে। তাদের আক্রমনের অন্যতম আরেকটি বিষয় হলো পরকাল। না, নিজের পরকাল নয়, অন্যের পরকাল। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে তারা মৃত্যুর পর বেহেশতে যাবে যেখানে আছে হুর সহ অনন্ত সুখ আর সুখ। যারা তাদের মতাদর্শের সাথে একটুও এদিক ওদিক করবে- তারা অনন্তকাল আগুনে পুড়বে।

দুই.

আমরা একটা বিষয় নিশ্চয়ই খেয়াল করেছি। মামুনুল হক, চরমোনাই পীর, বাবুনগরী- এ নামগুলো এখন খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের চেয়ে মিডিয়ায় বেশী আলোচিত হচ্ছে। এরকম নামগুলোতে বেহেশতে যাওয়ার আকাংখায় যাদের চিত্ত ছটফট করে – তাদের মনের খোরাক যোগানোর মতো রশদ নিশ্চয় অনেক বেশী। মামুনুল হক, চরমোনাই, হেফাযত – এদের যে কাউকে নিয়ে কোন পোর্টাল নিউজ করলে সেসব নিউজের কমেন্টবক্সগুলো আমি প্রায়ই পড়ি। পড়ার পর আমার বাংলাদেশকেই দেখি!

একটা বিষয় অনেকেই খেয়াল করে থাকবেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য্য স্থাপিত হবে কী হবে না বা এ সংক্রান্ত যেকোন নিউজ যখন গণমাধ্যমে আসে সেখানে প্রতিক্রিয়াশীলরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঐ নিউজ লিংকে যদি সাড়ে তিনহাজার কমেন্ট পড়ে তার মধ্যে শ’দুয়েক ছাড়া বাকি সবই প্রতিক্রিয়াশীলদের কমেন্ট। তারা অনলাইনেই রীতিমত জিহাদ ঘোষনা করে। অনলাইন জগতে খুনোখুনির সুযোগ থাকলে আমরা অনেক আগেই তাদের ভাষায় ‘কতল’ হয়ে যেতাম।

তাহলে কী পুরো দেশটাই তাদের? ভাষ্কর্য্যের পক্ষে কী দেশে কেউ নেই? আছে। সংখ্যার দিক থেকে প্রতিক্রিয়াশীলরা আমাদের তুলনায় নগণ্য। কিন্তু আমরা অনলাইনে সংঘবদ্ধ নই। এদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে যারা কথা বলে, অসাম্প্রদায়িক বলে যারা নিজেদের দাবি করে, তাদের অন্যতম আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো। কিন্তু এরা কেউই অনলাইনে সংঘবদ্ধ নয়। একজন ছাত্রলীগ কর্মী বা একজন যুবলীগ কর্মী তার নিজ সংগঠনে পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বা নিজ নিজ এলাকায় কাউন্সিলর, মেয়র হওয়ার জন্য যতোটা উৎসাহী ও তৎপর, ঠিক ততোটাই নিরুৎসাহী অনলাইনে মৌলবাদী চক্রের বিরুদ্ধে যৌক্তিক আক্রমণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ইন্টারনেট জগৎটা বিশাল জগৎ। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের এখানে অনেক তরুণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছে যারা ফেসবুকের বাইরে আর কিছুই বুঝে না। এবং সেই ফেসবুকটাকেও তারা সচেতনভাবে ব্যবহার করছে না। তারা বুঝতে পারছে না, এমন ইস্যু সচেতন বা অসচেতন ভাবে এড়িয়ে গেলে জাতীয় জীবনে বিপদ আসন্ন।

আলী আদনান

সরকার বনাম খেলাফত মজলিস, রাষ্ট্র বনাম হেফাজত- এসব ইঁদুর বিড়াল খেলায় কে জিতবে কে হারবে সেটা হয়তো পরের কথা, কিন্তু তার আগেই একটা বিপদ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের তরুণদের নির্লিপ্ততা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর জনমত সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তাদেরকে আরও শক্তিশালী হতে সুযোগ করে দিচ্ছে। আমি যেখানে চুপ সেখানে আমার প্রতিপক্ষ আওয়াজ করার সুযোগ পেয়ে যাবে। তাই প্রতিপক্ষের আওয়াজকে ঢাকা দেওয়ার জন্য আমাকে আরো জোরে আওয়াজ দিতে হবে। অপ্রিয় সত্য হলো, আমরা অনলাইনে তা করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

আরো একটা বড় ঘাপলা এখানে ঘটে গেছে। তা হলো ছাত্রলীগ, যুবলীগে এমন অনেক তরুণ রাজনীতি করছে, যারা তার রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে সচেতন না। তারা মৌখিকভাবে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে কিন্তু আচরণে পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক। তারা মুখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বলে, কিন্তু যে চার মূলনীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে তা তারা মানতে চায় না। উদাহরণ দিয়ে বলি, ফেসবুকে এমন অনেককে পাই, যাদের কাভার ফটোতে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেওয়া। তার প্রোফাইলে ঘুরলে দেখা যায় বিভিন্ন জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু তারাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে গিয়ে ভাষ্কর্য্যের বিরোধীতা করছে। তারা দাবি করছে, “সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে মূর্তি বসাতে দেওয়া হবে না”। আমার বক্তব্য হচ্ছে এটা মূর্তি হোক বা ভাষ্কর্য্য হোক, দুটোই এদেশে বসানোর অধিকার আছে। এবং সে অধিকার ১৯৭১ সালে দেশটি প্রতিষ্ঠার সময় নিশ্চিত হয়ে গেছে। আপনি এ বিরোধিতা করার অধিকার রাখেন না তাও আবার কাভার ফটোতে বঙ্গবন্ধুর ছবি রেখে।

হতে পারে এরা অনেকের অগোচরে ছদ্মবেশে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আবার এটাও হতে পারে সে ছাত্রলীগ করলেও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক দর্শন সম্পর্কে সচেতন না বা তার সংগঠন, তার উর্দ্ধতন নেতৃবৃন্দ তাকে সচেতন করতে পারেননি। যেটাই হোক না কেন, এমন কেউ রাষ্ট্রের জন্য, প্রজন্মের জন্য নিরাপদ নয়।

আওয়ামী লীগ নেতাদের স্পষ্ট করা উচিত এমন কর্মীদের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য কী? স্পষ্ট করতে হবে তারাও কী ঐ কর্মীর মতো মনোভাব ধারন করে কীনা। এসব নিয়ে এখন লুকোচুরির সুযোগ আর নেই। তুমি হয় আমার পক্ষে না হয় বিপক্ষে। মাঝামাঝি কোন কথা নেই। যে শিবির কর্মী, যে হেফাযত কর্মী তার সম্পর্কে আমি সতর্ক। কিন্তু যে কাভার ফটোতে বঙ্গবন্ধুর ছবি রাখে তার সম্পর্কে আমি সতর্ক না। তার দায়ভার আমি তার নেতাদের উপরেই চাপাব।

(লেখক: আলী আদনান, লেখক, সাংবাদিক ও
অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস্ট)

শেয়ার করুন:
  • 668
  •  
  •  
  •  
  •  
    668
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.