আপনার সন্তান কি বুলিয়িং এর শিকার? ৫ টি উপায়ে তা বন্ধ করা সম্ভব

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

ইংরেজি বুলিয়িং শব্দটির বাংলা হলো উৎপীড়ন, আর যে বুলি করে তাকে বলে উৎপীড়ক অর্থাৎ যে ব্যক্তি ভয় ও বল প্রয়োগ করে অন্য কাউকে কিছু করতে বাধ্য করে। স্কুল বুলিয়িং আপেক্ষিকভাবে নতুন ধারণা, কিন্তু এর চর্চা বহু পুরাতন।

আমার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় অনুভূতি হলো যখন একজন মা/বাবা অথবা অভিভাবক জানতে পারেন যে তার সন্তান স্কুলে বুলিয়িং-এর শিকার হচ্ছে। স্কুল বুলিয়িং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এমন একটি সমস্যা যা অভিভাবক বা পিতামাতার পক্ষে চিহ্নিত করা কঠিন। অন্যদিকে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য বুলিং অসম্ভব ক্ষতিকারক।
বুলিয়িং যে শুধু শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ, তা নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বুলিয়িং বন্ধ করা সম্ভব না হলে শারীরিকভাবে আঘাত পাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। কারণ আজ যে ছেলে বা মেয়েটি তার সহপাঠিকে বুলি করছে তাকে শুরুতেই বাধা না দিলে সে আরো বুলি করার প্রণোদনা পায়।

আমার এক বন্ধুর কাছে ঢাকার নামিদামি এক স্কুলের বুলিয়িং-এর গল্প শুনেছিলাম। যেখানে বাচ্চাটিকে তার সহপাঠিরা মানসিক ও শারীরিকভাবে এতোটাই অপদস্ত করেছিল যে বাচ্চাটি শেষ পর্যন্ত স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।

দুঃখজনক হলো বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্কুলগুলোতে বুলিয়িং এর উপরে কোন ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি হয় না, সেভাবে কোন পলিসিও অনুসরণ করা হয় না। অধিকাংশ সময়ই শিশুরা না বুঝেই সহপাঠিকে বুলি করে থাকে। অন্যদিকে যদি কোন সচেতন বাবা/মা/অভিভাবক সেটা বুঝতেও পারেন, খারাপ দিকটা উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ নিয়ে যান না, বা কখনও কখনও নিয়ে যেতে পারেন না কারণ স্কুলে বুলিয়িং প্রতিরোধে সেভাবে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, যা সচরাচর উন্নত দেশের স্কুলগুলোতে বাধ্যতামূলক।

পলিসিগত পরিবর্তন হয়তো রাতারাতি সম্ভব নয় কিন্তু পারিবারিক সচেতনতার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়েই যদি বুলিয়িং বন্ধ করা যায় তাহলে আপনার শিশুর শৈশব এবং স্কুল অভিজ্ঞতা দুটোই সুন্দর হতে পারে যা তার মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য ফলপ্রসূ।

যে পাঁচটি উপায়ে আপনি আপনার শিশুকে বুলিয়িং প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারেন, তা হলো:

১. শিশুর সাথে নিয়মিত গল্প করুন: শিশুকে সরাসরি বুলিয়িং নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করে, গল্পের ছলে জানার চেষ্টা করুন আপনার অনুপস্থিতিতে সে কী করে, স্কুলে বা খেলার মাঠে তার সময় কীভাবে কাটে, কী তার ভালো লাগে আর কী ভালো লাগে না। পাশাপাশি তাকে বুঝিয়ে বলুন কাউকে আঘাত করা ঠিক নয় এবং অন্যের আঘাত চুপ করে মেনে নেয়াও কাংক্ষিত নয়। শিশুর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন যেন সে নির্দ্বিধায় তার সমস্যার কথা আপনাকে বলতে পারে।

২. ফরমাল অভিযোগ করার নিয়ম শিখিয়ে দিন: বুলিয়িং প্রতিরোধে প্রথম বাধা হলো, শিশুরা সাধারণত বুলিয়িং এর শিকার হলে তা গোপন করে যায়। তারা বুঝতে পারে না কীভাবে বা কাকে বিষয়টি বলবে। তাই যখন বুলিয়িং নিয়ে শিশুর সাথে আলোচনা করবেন, তাকে শিখিয়ে দিন ঠিক কার কাছে গেলে সে সহায়তা পেতে পারে।

৩. যে বুলি করছে তাকে শুরুতেই বাধা দিতে বলুন: শিশুর এটা জানা খুবই জরুরি যে, সহপাঠি যদি বুলি করে তাকে বাধা দিতে হয়। উচ্চস্বরে এবং দৃঢ়ভাবে বলতে হয় “তুমি থামো, আমার এটা ভালো লাগছে না” বা “আমাকে ধাক্কা দিও না” ।

৪. খেপে যেতে বারণ করুন: বুলিং বন্ধ করতে শক্ত প্রতিবাদ প্রায়ই সহায়ক, তবে বুলিয়িং-এর শিকার শিশু খেপে গেলে তা বুলিয়িং করছে এমন শিশুদের আরও করার প্রণোদনা জোগায়। তাই শিশুকে বোঝান, কেউ বুলি করলে হয় তাকে শান্তভাবে বাধা দিতে অথবা খেপে না গিয়ে, কান্নাকাটি না করে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলে এড়িয়ে যেতে। তাহলে এক পর্যায়ে যে বুলি করছে সে বুলি করার আগ্রহ হারাতে পারে।

৫. বন্ধুদের সাথে থাকার পরামর্শ দিন: সাধারণত যে সকল শিশু একা থাকতে পছন্দ করে বা ইন্ট্রোভার্ট হয় তারাই বেশিরভাগ সময় বুলিয়িং এর শিকার হয়। তাই শিশুকে পরামর্শ দিন বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে। প্রয়োজনে তাকে বন্ধু তৈরিতে সহায়তা করুন।

তথ্যসূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া

লেখক:
পিএইচডি ক্যান্ডিডেট
ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসল, অস্ট্রেলিয়া

শেয়ার করুন:
  • 195
  •  
  •  
  •  
  •  
    195
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.