সেই পূজা এখন কেমন আছে?

উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক:

পূজা এখনও ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি। সে বর্তমানে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। সে ঘরে বাইরে কোথাও একা থাকতে পারে না, ভয় পায়। পূজাকে ধর্ষণের সময় ধারালো ব্লেড দিয়ে তার যোনিপথ কাটা হয়েছিল যা আর কখনও জোড়া লাগবে কিনা সন্দেহ। ঘটনার পর থেকে পূজা প্রস্রাব আটকে রাখতে পারে না। স্কুলে যাওয়ার সময় তার মা প্যান্টের ভেতর অনেকগুলো কাপড় দিয়ে দেন, যাতে প্রস্রাব বাইরে চলে না আসে।

পূজার বয়স এখন ৯ বছর। ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর তার বয়স ছিল ৫ বছর, যখন সে পার্বতীপুর উপজেলার জমিরহাট তকেয়াপাড়া দুপুর ১১-১২টার দিকে খেলতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। এর পরদিন বাড়ির পাশে হলুদের ক্ষেত থেকে উদ্ধার হয়েছিল তার ক্ষতবিক্ষত দেহ। পূজাকে ধর্ষণ করে তারই খেলার সাথী রেশমার বাবা সাইফুল। ঘটনার পর ২০ অক্টোবর পূজার বাবা সুবল দাস নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হলেন সাইফুল ইসলাম ও আফজাল হোসেন কবিরাজ। পার্বতীপুর মডেল থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়। গত চার বছর ধরে সেই মামলার নিষ্পত্তি আজও হয়নি।

 

কী হয়েছিল সেদিন?

পূজার বাবা সুবল দাসের কাছ থেকে জানা যায়, গ্রামের সব বাড়ি, মাঠে তারা পূজাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এরপর মসজিদে মাইকিং করা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই তার কোনো খোঁজ না পেয়ে থানায় জিডি করেন। এরমধ্যে আসামী সাইফুল তাকে ফোন দিয়ে বলে “তুই নাকি এবার দূর্গাপূজার চাঁদা দিস নাই, আবার শ্বশুর বাড়ি যায়া পূজার দিন মাছ মাংস খাইছিস। তাই তোর মেয়ে হারায় গেছে। তবে আমি বলতেছি তুই তোর মেয়ে পাবি, আজকেও পাইতে পারিস, বা কালকে পাইতে পারিস।’ সেই অবস্থায় পূজার বাবা সুবল ভাবেন সাইফুল মনে হয় তাকে সান্তনা দিচ্ছেন। সাইফুলকে পূজার বাবা বলে ভাই কি করে আমি আমার মেয়ে ফিরে পাব। সাইফুল বলে- ‘তুই মসজিদে ১০১ টাকা দিবি, আর তোর মন্দিরে মানাচিনা কর।’ এরপর রাত ৮/৯ টার দিকে সাইফুল তাকে ডেকে নেয়। বলে- ‘তোর মেয়েকে পেতে পারিস তবে আমার সাথে তোর একা যাইতে হবে। আমি তোকে যেখানে নিয়ে যাব সেখান থেকে এসে কাউকে কিছু বলবি না, তাহলে তোর মেয়ের ক্ষতি হবে।একা একা যেতে হবে বলে- সুবল তখন একটু ভয় পেয়েছিলেন। সুবল ভাবছিলেন হয়ত সাইফুল তার কাছে টাকা পয়সা চাবে। কিন্তু না দেখলেন সাইফুল তাকে খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে জমির মধ্যে দিয়ে তাদের পাশের গ্রামে নিয়ে যাচ্ছেন। কোথায় যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে সাইফুল বলে– ‘আমরা পাশের গ্রামে কবিরাজের কাছে যাই’। প্রত্যুত্তরে সুবল বলেন এই গ্রামে তো কোনো কবিরাজ নাই। সাইফুল তখন আফজাল কবিরাজের বাসায় গিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে তিনজনমিলে গ্রামের নদীর ধারে যায়। সেখানে গেলে আফজাল কবিরাজ সেই একই কথা বলে। বলে- ‘তুই রাতে অথবা সকালে মেয়েকে পেয়ে যাবি।’আর কথায় কথায় জানতে পারে সাইফুল এরআগে একবার এসে আফজালের সাথে দেখা করে গেছে। এই কথা শোনার পর সুবলের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। এরপর বাসায় ফিরে আসেন।

পরের দিন সকালে পাশের বাড়ির এক ভাইয়ের চিৎকার শুনে হলুদক্ষেতে দৌড়ে গিয়ে দেখেন তার মেয়েকে সেই ভাই কোলে নিয়ে আছে। তাড়াতাড়ি তাকে নিয়ে স্থানীয় ল্যাম্ব হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার ডাক্তাররা বলে নির্যাতনের শিকার পূজার আরো ভাল চিকিৎসা লাগবে তাই তাকে রংপুরে নিতে হবে। সেদিনই তাকে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। সেখানে পূজার অবস্থার উন্নতি না হলে, তার মহাজন, বড়ভাই সবাই বলেন তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য। এরপর রংপুর মেডিকেলে ২ দিন থাকার পর তাকে ঢাকার ওসিসিতে নিয়ে আসা হয়।

রংপুর মেডিকেল কলেজের ডাক্তাররা বলেন, অপহরণের পর ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। ১৮ ঘন্টা আটকে রেখে তার উপর পাশবিক নির্যাতন করা হয়। শিশুটির সারা শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। সারা মুখে গলায় নির্যাতনের চিহ্ন। কামড়ের দাগ শরীরে। মাথায় আঘাতের চিহ্ন। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তাকে তার বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় হলুদ ক্ষেতে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।

পূজার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির চিকিৎসায় গাইনি বিভাগের প্রধান ফেরদৌসী ইসলামের নেতৃত্বে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সদস্য শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান আশরাফ উল হক কাজল বলেছিলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির প্রজনন অঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে।

চার বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি পূজা ধর্ষণ মামলা

মামলাটি বর্তমানে দিনাজপুর নারী ও শিশু ট্রাইবুনালে বিচারাধীন আছে। নারী ও পুলিশ ২০১৭ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটির চার্জশিট দেন। চার্জ গঠন হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষী পর্যায়ে আছে। মামলার মূল আসামী সাইফুল এখনও হাজতে আছে। কিন্তু সহযোগী আসামী আফজাল কবিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর হাইকোর্ট থেকে প্রায় ৩ বছর আগে জামিন নিয়ে মুক্ত আছে।

দিনাজপুরে নারী ও শিশু ট্রাইবুনাল মাত্র একটি এবং এই ট্রাইবুনাল প্রায়ই দীর্ঘদিন যাবৎ বিচারক থাকেন না। জেলা ও দায়রা জজ তাঁর কাজের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালটির দায়িত্ব পালন করেন। ফলে পূজার মামলার বিচার কার্যক্রম গতি হারিয়েছে। দীর্ঘদিন বিচারক না থাকার পর ২০১৯ সালে দিনাজপুরে নারী ও শিশু ট্রাইবুনাল বিচারক নিয়োগ হওয়ায় মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া কিছুটা গতি ফিরে পেয়েছে।
পূজার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরাই পারি জোট উদ্যোগ নেয়। গত ২৩ অক্টোবর ২০১৯ এবং ১৯ জানুয়ারি ২০২০ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি জানায় এবং পূজার মামলার দ্রুত বিচারের অনুরোধ জানায়। সর্বশেষ আমরাই পারি জোটের পক্ষ থেকে জানা যায়, এ মাসের ২ নভেম্বর মামলার তারিখ ছিল, কিন্তু সময়মতো না জানার কারণে পূজার বাবা উপস্থিত থাকতে পারেনি। আগামী ২ ডিসেম্বর ভিকটিম সাক্ষীর তারিখ পড়েছে।

এই মুহূর্তে এই মামলাটির যেমন দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন, ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মেয়েটির দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

শেয়ার করুন:
  • 195
  •  
  •  
  •  
  •  
    195
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.