বাবা-মায়েরা, শিশুর শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করবেন না

সালমা লুনা:

গতকাল ছিল বিশ্ব শিশু দিবস। দিবসটি নিয়ে অনলাইনে তেমন কোন প্রচার প্রচারণা দেখিনি।
বিশ্বের সকল শিশুরা কেমন আছে?
বিশ্ব বাদই দেই, কেমন আছে আমাদের দেশের শিশুরা?
প্যানডেমিক পরিস্থিতির বিচারে তারা যে ভালো নেই এটা বুঝতে তেমন কোন অসুবিধা হয় না। আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিশু আরও খারাপ অবস্থায় আছে। স্কুল বন্ধ, খেলাধুলা বন্ধ। খেলাধুলা এমনিতেও স্থানাভাবে হয়ে উঠেই না তাদের।
যদিও অনলাইনে ক্লাস চলছে। তবে সেটাও একটা নির্দ্দিষ্টসংখ্যক শিশুদের জন্য এভেইলেবল। সিংহভাগ হয়তো তাও পাচ্ছে না। তাদের স্কুলের কাজ স্কুলে গিয়ে নিয়ে আসতে হচ্ছে, আবার গিয়ে জমা দিতে হচ্ছে।

এদিক দিয়ে দেখতে গেলে নিম্নবিত্ত আর উচ্চবিত্তদের সন্তানদের ঝামেলা কম। বেকায়দায় পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকদের শিশুসন্তানরা।
তাদের এই পরিস্থিতিতে না ঘরকা না ঘাটকা দশা। কেউ অনলাইনে ক্লাস করার ডিভাইস পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না। কাউকে কাউকে কোনপ্রকারে ম্যানেজ করতে হচ্ছে একটা ভালো স্মার্টফোন নয়ত ল্যাপটপ। এই করতে গিয়ে হয়ত অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।
এই কিছুদিন আগেও শিশুদের ক্ষেত্রে শোনা যেত তারা বইয়ের চাপে, হোমওয়ার্কের চাপে, ভালো রেজাল্টের চাপে দিশেহারা। তাদের খেলার মাঠ নেই। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সঠিক সৃষ্টিশীলতার চর্চা নেই।
এসব নিয়েই তবু কোনমতে চলছিলো আমাদের শিশুরা।

এবার মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে সেলিব্রেটি হবার প্রতিযোগিতা। এবং এই প্রতিযোগিতায় অনেক অভিভাবকও সামিল হয়েছেন ইদানিং। শুধু তাই না অভিভাবকরা এখন অনলাইনে শিশুদের চাহিদা আছে জেনে নিজ শিশুসন্তান কে ব্যবসায়িক কাজেও লাগাচ্ছেন।

এই লেখাটি লিখবো বলে আমি গত দুদিন ধরে বেশ কিছু ভিডিও দেখলাম।
একটিতে দেখলাম ১২ বছর বয়সী সিক্সে পড়ুয়া এক মেয়ে কসমেটিকস বিক্রি করছে, চোখের লেন্সের বিজ্ঞাপন করছে, জুয়েলারি বিক্রি করছে। অত্যন্ত পেশাদার ভাবভঙ্গিতে সে ওগুলোর দাম বলছে। কীভাবে পাওয়া যাবে, পেমেন্ট কীভাবে হবে সেসব বলে দিচ্ছে। এবং ভিডিওতে তার চারপাশের যে পরিবেশের যে আভাস পাওয়া যায় তাতে দেখা যাচ্ছে তার একটি পোষা বেড়াল আছে, ঘরবাড়ি আপাত দৃষ্টিতে যা দেখা যাচ্ছে তাতে সে মোটেও দরিদ্র পরিবারের বলে বোঝা যাচ্ছে না। এবং আশেপাশেই তার মা বড় বোন এমনকি তার বাবাও আছেন।

মেয়েটির মাত্র ১২ বছর বয়স!
এবং ক্লাস সিক্সের ছাত্রী। প্রশ্নের উত্তরে সে নিজেই বলেছে এসব।
আরেকটি ভিডিও দেখলাম, সেখানে দুটি বাচ্চা ছেলে খাচ্ছে। খাচ্ছে না বলে গোগ্রাসে গিলছে বলা ভালো। এমন সব খাবার যা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর তো বটেই যেভাবে খাচ্ছে সেটিও তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হানিকর হতে পারে। দেখতে অরুচিকর লাগছে, সেটা বাদই দিলাম। তাদেরও বয়স দশ বারোর মধ্যেই। এমন আরো অনেক আছে। সেসব বললে শুধু শব্দই খরচ হবে।
তারা কী করছে আমি নিজেও বুঝিনি। এসব গোগ্রাসে খাওয়ার শো গুলো করার এবং দেখার লোক অবশ্যই আছে কিন্তু তাই বলে বাচ্চাদেরও করতে হবে!

এতোদিন দেখেছি বাচ্চাদের দিয়ে মা বাবারা কঠিন কঠিন কবিতা আবৃত্তি করাচ্ছে। গান গাওয়াচ্ছে। গিটার বাজাচ্ছে। রান্না করাচ্ছে। এসব কি কম ছিল যে এখন বেচাবিক্রিও করাতে হবে সন্তানকে দিয়ে? আর নিজেরা পাশে বসে গাইড করবে সেসব!

এসবকিছুর পেছনে যেমন আছেন অভিভাবকরা, তেমন আছে কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। যারা নিজেদের পণ্য বিক্রির জন্য এই ছোট ছোট বাচ্চাদের বেছে নিয়েছেন।
তাহলে টিকটক অপু মামুন এদের দোষ কোথায়? এরা নাকি নেচেগেয়ে সমাজকে উচ্ছন্নে নিচ্ছিলো? এরা রাস্তায় নেমে নাচগান করলে অনেকের খুব অসুবিধে হচ্ছিলো।

মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের সন্তানরা এসব করলে দোষঘাট হয় না, তাই কি?
তাদের এইসব ভিডিও যারা দেখে তারা কি সবাই প্রাপ্তবয়স্ক?
যারা নিজেরাই অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাদের বেশিরভাগ দর্শকও একই বয়সের হওয়ার কথা।
যদি তাই হয় তবে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত কী?
হয়তো খুব বেশিদিন আর নাই আমরা যখন দেখবো যে অনলাইনে শাড়ি-জামা, জুতা,গয়না থেকে শুরু করে সমস্ত জিনিসপত্র ফেরি করতে আসছে আমাদেরই শিশুরা।
কেন?
কারণ শিশুদের চাহিদা বেশি।
কী, শুনতে খুব খারাপ শোনাচ্ছে? চাহিদা শব্দটাকে মনে হচ্ছে না সৌদি আরবে উটের পিঠে বসানোর জন্য শিশুদের চাহিদার কথা কিংবা আরো খারাপ কিছুর মতো?
সত্যি বলতে লিখতে আমারই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি এই চাহিদার ব্যাপারটা সত্যি।
শিশুদের ইউটিউব ভিডিও, কেনা-বেচার ভিডিওতে লাইক ভিউ বেশি। মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে তাড়াতাড়ি, পেইজগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে দ্রুততম সময়ে। তাছাড়া ছেলেমেয়েরা সেলিব্রেটি হয়ে যাচ্ছে।
যে পিতামাতা হয়তো জীবনে সেলিব্রেটি হওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য ছিল, অথচ জীবনে তেমন কিছুই করতে পারেননি, সেসব বাবা-মায়ের পাশাপাশি রাতারাতি খ্যাতি পাওয়ার উন্মাদ বাসনায় তাদের শিশুদের এসবে উৎসাহী করে তুলছেন।

এতে করে কী হচ্ছে?
শিশুরা অল্প বয়সেই ইঁচড়েপাকা হয়ে যাচ্ছে বিষয়টা কিন্তু এতো সিম্পলও না। এর একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে তাদের জীবনে।
বাবা-মায়ের লোভ কিংবা ইচ্ছার বলি হতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলছে তাদের সোনালী শৈশব। অল্প পরিশ্রমে খ্যাতি পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠছে। খ্যাতি থেকে তাদের মনোজগতে আসছে বিরাট পরিবর্তন। তারা মেজাজি, দুর্বিনীত ও হিংস্র হয়ে উঠছে। দীর্ঘসময় অনলাইনে থাকা, অপরিচিত মানুষের সাথে যোগাযোগ এসবে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে যাচ্ছে। হয়ত অপরাধ চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়া, নেশায় আসক্ত হওয়া এসবের সম্ভাবনাও বেড়ে যাচ্ছে।
অভিভাবকদের বলছি, আপনি তো সেলিব্রেটি বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন পৃথিবী বিখ্যাত সেলেবদের সন্তানদের তারা নিজেরাই এসব জগত থেকে দূরে রাখেন?
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা তার মেয়েকে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরেই কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢোকার অনুমতি দিয়েছিলেন!

সন্তানকে অনলাইন বিক্রয়কর্মী বানিয়ে, ইউটিউবার না বানিয়ে তার হাতে সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, মার্ক টোয়েন তুলে দিন। বিশ্বসাহিত্যের বিশাল জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। খেলাধুলা শরীরচর্চায় মনোযোগী করুন। আবৃত্তি নাচ, গান করাচ্ছেন ভালো কথা। পাশাপাশি তাকে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলে সেখানে পারফর্ম করিয়ে ইউটিউবার বানানোর এবং তার সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর কাজটি করবেন না। তাকে ইউটিউবার বানানোর স্বপ্ন না দেখিয়ে একজন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখান। তাকে তার রঙিন শৈশবে হেসেখেলে বড় হতে দিন। কী হবে আপনার এতো লাইক কমেন্ট, এতো ভিউয়ার, এতো সাবস্ক্রাইবার দিয়ে, যদি সন্তানটি মানুষের মতো মানুষই না হলো!

আপনি আপনার সন্তানকে সেলিব্রেটি বানাতে চাইতেই পারেন। কিন্তু ভেবে দেখুন আপনার এই ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে আপনি আপনার কোমলপ্রাণ শিশুটির শৈশবকেই নিজ হাতে গলা টিপে হত্যা করছেন না তো?

শেয়ার করুন:
  • 829
  •  
  •  
  •  
  •  
    829
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.