মৃতদেহ ধর্ষণ বা নেক্রোফিলিয়া

শাহরিয়া দিনা:

এই করোনাকালের শুরুতে এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম ডিপ্রেশন নিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে সুইসাইড বা সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি নিয়েও কথা হলো। এক পর্যায়ে সে বললো, কারোরই আত্মহত্যার চিন্তা করাই ঠিক না। মৃতদেহ ছিড়েখুঁড়ে ফেলা তথা পোস্টমর্টেম খুবই অসুস্থ একটা জিনিস। আর মেয়েদের সাথে তো আত্মহত্যার পরও জঘন্যরকম কিছু ব্যাপার ঘটে। পোস্টমর্টেমকালে তাদের মৃতদেহকেও ধর্ষণে শিকার হতে হয় অনেক সময়। সেই কথারই প্রতিফলন দেখলাম যেন খবরে।

মর্গে রাখা মৃত নারীদের ধর্ষণের অভিযোগে মুন্না ভগত (২০) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার মুন্না রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে ডোম জতন কুমার লালের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। দুই-তিন বছর ধরে সে মর্গে থাকা মৃত নারীদের ধর্ষণ করে আসছিল।

মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ এবং অসুস্থ সেই আকাঙ্খা থেকে বাস্তবে শবের সঙ্গে সহবাস করাটা এক ধরনের রোগ। এর নাম নেক্রোফিলিয়া। নেক্রোফিলিয়া একটি অন্যতম প্রচলিত প্যারাফিলিয়া (Paraphilia) বা বিকৃত যৌনাচার।
এই শব্দের শুরুটা এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে। নেক্রোস অর্থাৎ মৃত (nekros; dead) এবং (philia; love) ফিলিয়া অর্থাৎভালোবাসা বা আসক্তি। পেশাগত কারণে মৃতদেহের সঙ্গে থাকতে হয়, এমন মানুষদের মধ্যেই নেক্রোফিলিয়ার প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে। এই বিকৃত যৌনাচারের দুনিয়া জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা কাহিনিও আছে।

ইতিহাসবেত্তা হেরোডোটাসের মতে, মিশরের মমির সঙ্গেও জুড়ে আছে শবকামের কাহিনী। নেক্রোফিলিয়ার ভয়েই মমি তৈরির আগে সুন্দরী মহিলাদের দেহ মৃত্যুর পর দিন চারেক ফেলে রাখা হত। দেহে খানিকটা পচন ধরলে তবেই তা মমি প্রস্তুতকারকদের হাতে তুলে দেওয়া হত। এতে করে লাশটি বিকৃত হয়ে যেত এবং সৎকারকারীদের মধ্যে যদি কোনো নেক্রোফিলিক থেকে থাকে, সে আর তার যৌনলিপ্সা পূরণ করতে লাশের উপর চড়াও হতে পারত না। প্রচলিত মিথ অনুসারে, রাজা হেরোড তার স্ত্রী ম্যারিয়ানির মৃত্যুর সাত বছর পর্যন্ত মৃতদেহের সাথে যৌনকার্য করেছেন। একই কাহিনি প্রচলিত আছে রাজা ওয়াল্ডিমার এবং রাজা চার্ল ম্যাগনের নামেও। গ্রিসের অত্যাচারী রাজা পেরিঅ্যান্ডারের শব-কামের কথা উঠে এসেছে ইতিহাসের জনক হেরোডোটাসের লেখায়।

রাজ দরবার ছেড়ে বাইরের পৃথিবীতে আজও চলছে এই বিকৃত যৌনাচার। ২০১০ সালে ফিলিপাইনের জামবোয়াগনা শহরের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে একে একে বেশ কিছু লাশ চুরি হতে থাকে। লাশগুলোর বেশিরভাগই ছিল তরুণীদের। পরে পুলিশ সেসব মৃতদেহ কবরস্থানের পাশের কিছু খুঁটিতে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় ঝুলানো দেখতে পায়। মৃতদেহগুলোর সঙ্গে যৌনক্রিয়া ঘটার চিহ্ন পায় পুলিশ। কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে একদল নেক্রোফিলিয়ার কাজ বলে মনে করেন। পরবর্তীকালে এই ঘটনার দায়ে আটক করা হয় সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তিকে। তারা ঘটনার দায় স্বীকার করে। এদের বেশিরভাগই ছিল মাদকাসক্ত এবং মস্তিষ্ক বিকারগ্রস্ত।

নেক্রোফিলিয়াকদের তালিকার ওপর দিকে থাকা মানুষদের বেশিরভাগই সিরিয়াল কিলার। যেমন, আমেরিকার এড গেইন। দুই নারীকে খুনের পর তাদের দেহ কবর থেকে বার করে এনেছিল। ভারতের পূর্ব বর্ধমানের কালনার বাসিন্দা কামরুজ্জামান সরকারও এমন ভয়ংকর কাজ করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ছিল তার পরিবার। তার টার্গেট ছিল নারীরা। ২০১৩ সাল থেকে ১১ জন নারীর উপর হামলা চালিয়ে সাতজনকে খুন করেন শুধুমাত্র তাদের শবদেহের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে।

তবে এই তালিকার শীর্ষে থাকবে টেড বাডির নাম। শবের সঙ্গে যৌনক্রিয়া করতে নারীদের খুন করতেন টেডি। পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার বোধ হয় তিনিই। তার নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি খুন করেছেন ৩০ জনকে। আসল সংখ্যা হয়ত আরো অনেক বেশি। এদের অনেকের সঙ্গেই খুন করে যৌনকর্ম করেছেন তিনি। তার প্রথম শিকার লিনেট কালভার নামের বছর বারোর একটি মেয়ে। যাকে সে পানিতে ডুবিয়ে মারে। তারপর মৃতদেহের সঙ্গে যৌনমিলন করেন। বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ১৯৮৯ সালে।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থারও নেক্রোফিলিয়াকে মানসিক বিকৃতিজনিত রোগ বলে আখ্যা দিয়েছে। সাধারণত লাশকাটা ঘর বা মর্গে কাজ করে এমন ব্যক্তি, ডোম, মৃতদেহ সৎকার করে, গোরস্তান বা সমাধিতে কাজ করে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে নেক্রোফিলিকদের দেখা পাওয়া যায়। এর বাইরেও নেক্রোফিলিকদের অস্তিত্ব আছে, যারা প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থান থেকে লাশ চুরি করে তাদের বিকৃত চাহিদা মেটায়।

নেক্রোফিলিকদের এই মানসিক বিকৃতির সুনির্দিষ্ট কোন কারণ জানা যায় না। তবে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, কোন অভিজ্ঞতা বা কোন ফ্যান্টাসি থেকেই তারা এমন পৈচাশিক যৌনতায় আকৃষ্ট হয় বলে ধারণা করেন গবেষকগণ।

শেয়ার করুন:
  • 418
  •  
  •  
  •  
  •  
    418
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.