একজন ‘মানুষ’ হিসেবে ছেলেকে তৈরি করুন

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

একটা এড দেখলাম। যেখানে মেয়েটা মার্শাল আর্টে ব্ল্যাকবেল্ট প্রাপ্ত। সেই মেয়েটা বিয়ের জন্য একটা ছেলের সাথে দেখা করতে রেস্টুরেন্টে যায়। সেখান থেকে তারা বাসায় ফেরার জন্য একসাথে বের হয় এবং রাস্তায় কিছু বখাটে দ্বারা আক্রান্ত হয়। বখাটেগুলো যখন ছুরির ভয় দেখিয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে মেয়েটাকে ধর্ষণ করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতে চায় সহজাত স্বভাববশত মেয়েটা আশা করে ছেলেটা তাকে রক্ষা করবে। অথচ মেয়েটা কিন্তু নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারদর্শী এবং রক্ষা করেও।

এই যে “সহজাত স্বভাব” ছেলেরা মেয়েকে রক্ষা করবে, এটা কিন্তু জন্মের পর থেকেই সন্তানের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। নারী এবং পুরুষ দুজনই ভিন্নভাবে বেড়ে উঠে আমাদের সমাজে। পুরুষরা হয় শক্তসমত্ত এবং শক্তিশালী, অন্যদিকে নারী প্রজাতি নরম এবং দুর্বল। নারীরা যতই “নারীবাদী আন্দোলন” করুক, তাদের যতই সম-অধিকার দেয়া হোক না কেন তারা কি সেই অধিকারের সঠিক ব্যবহার করতে পারবে? একটা অস্ত্রের সামনে নারী পুরুষ দুইজনই অসহায়। কিন্তু আমরা আশা করি শুধুমাত্র পুরুষরাই সেই অস্ত্রের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়বে, সঙ্গের নারী সাথীটিকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সে চালাবে, তবেই সে সুপুরুষ বা বীরপুরুষ। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, একজন নারী পুলিশকে রক্ষা করতে একজন পুরুষকে সহায়ক হিসেবে দেয়া হয়! তাহলে নারীকে প্রশাসনে দায়িত্ব দেয়ার মানেটা কী! সে যদি নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে না পারে তাহলে কীভাবে অন্যকে রক্ষা করবে? মেয়েদের জীবনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বার শোনা কথা হচ্ছে “বিয়ের পর স্বামীর সাথে যাবি”! কারণ একটাই। স্বামী রক্ষাকবচ। সেই স্বামী কি মানুষ না? রোবট/এলিয়েন/দেবতা? তার কি রক্ত বের হবে না, সে কি ব্যথা পাবে না?

জন্মের পর থেকেই ছেলেদের এটা বোঝানো হয় “তুমি স্ট্রং” শারীরিক এবং মানসিকভাবে। তোমার কষ্ট পাওয়া নিষেধ। কষ্ট পেলে কান্না করা নিষেধ। শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র বংশবৃদ্ধি করার জন্যই প্রায় মা-বাবাই একটা ছেলে সন্তানের আশা করে, যে সন্তান (ছেলে) বড় হয়ে টাকা উপার্জন করে মা-বাবা তথা পুরো সংসারের দায়িত্ব নিবে। অথচ সন্তান ছেলেমেয়ে যাই হোক না কেন, উভয়ের দায়িত্বই হলো মা-বাবার দায়িত্ব নেয়া। কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়েকে তৈরি করা হয় অন্যের মা-বাবাকে দেখাশোনা করার জন্য। আচ্ছা যেখানে তোমার মেয়ে তোমার দায়িত্ব নিতে পারছে না, সেখানে অন্যের মেয়ে কীভাবে তোমার দায়িত্ব নিবে? এটা কীভাবে “সমাজ” আশা করে, এটা আমার বুঝে আসে না! চিন্তা করে দেখেন এটা একটা ভাইস ভার্সা ব্যাপার। আর ছেলেদের তো আমার কাছে বেশি অসহায় মনে হয়। এরা না পারে কাউকে কষ্টের কথা বলতে, না পারে কাঁদতে। মনের ফ্রাস্ট্রেশনটা জমতে জমতে একসময় পাহাড় হয়ে যায়। শুরু হয়, “দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার”!

ঘটনাটা যদি এমন হতো ছেলে-মেয়ে দুইজনকেই আমরা সব ধরনের শিক্ষা দিতাম। ছেলেকে বলতাম, কান্না করো বাবা, “কান্না করলে মন হালকা হয় বা মামনি নিজের নিরাপত্তার চিন্তা নিজেকেই করতে হয়। এটা আশা করবে না কোন এক রাজপুত্র/হিরো/পুরুষ পঙখীরাজ ঘোড়ায় করে উড়ে এসে ঢিসুম ঢিসুম করে গুণ্ডাদের মেরে হাত পা গুড়িয়ে দিয়ে তোমাকে উদ্ধার করবে। বরং তুমিই সুযোগ পেলে বিপদগ্রস্ত কাউকে উদ্ধার করো”! তাহলে কিন্তু এড এর মেয়েটাকে এতোটা অবাক হতে হতো না, তাই না? এটা ঠিক সব মানুষের স্ট্যামিনা বা সহ্য করার ক্ষমতা একরকম হয় না। এটা কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাহলে কিন্তু শুধুমাত্র ছেলেকেই সংসার সামলানোর জন্য চাকরি খুঁজতে খুঁজতে ৩০/৩৫ বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। আর যখন মেয়েরা নিজের বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে শিখবে, তখন কিন্তু অটোমেটিকভাবে সবাই সবার মা-বাবার দায়িত্ব নিবে। দেখেন এটাও ভাইস ভার্সা। শুধুমাত্র বংশবৃদ্ধির জন্য ছেলে সন্তান আশা করবে, নাকি একটা সুস্থ সন্তান আশা করবে, এটা ভাবনারও সময় হয়েছে অনেক আগেই।

নিজের মেয়ে সন্তানকে মানুষ ভাবুন। তার দায়িত্ব তাকেই নিতে দিন। তাকে বোঝান তোমার নিরাপত্তা তুমিই দিবে। কেউ আসবে না সাহায্য করতে। ছেলে সন্তানকে কাঁদতে শেখান। মানে অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখান। মনের কষ্ট বলতে শেখান। ভালোবাসার কথা বলতে শেখান। শুধুমাত্র বংশবৃদ্ধির জন্য কিংবা সংসার চালানোর জন্য বা টাকা আয়ের মেশিন এর জন্য ছেলেসন্তানের আশা না করে, একজন মানুষ হিসেবে ছেলেকে তৈরি করুন।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.