পুরুষ দিবস: চলুন পুরুষতন্ত্রকে ‘না’ বলি, বৈষম্য দূর করি

সুপ্রীতি ধর:

পাশাপাশি দুটো ছবি, এ নিয়ে আমি সবসময় ভাবি। আমাদের মতোন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একজন পুরুষের কাঁধে জগৎ সংসারের সমস্ত অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে কেউ কেউ নির্ভার থাকেন বটে, তবে এটাও সত্য যে একজন পুরুষের কাজকে আমরা যেভাবে অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়ে মাপতে পারি, কারণ তার বোঝাটা দৃশ্যমান থাকে, সেই তুলনায় নারীর যে কাজ, সেটার কোন অর্থনৈতিক মানদণ্ড নেই মাপার জন্য। নারীর কাজকে ‘কাজ’ই মনে করা হয় না, আর সেখানেই আমাদের নারীবাদী আন্দোলন। নারীবাদী আন্দোলন মানে কেবলই নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন না, সমাজে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের আন্দোলন। নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন।

একটি শিশু যখন জন্ম নেয় তখন সে মেয়ে বা ছেলে থাকে না, ক্রমেই তাকে নানারকম শিক্ষার মধ্য দিয়ে ছেলে বা মেয়ে বানানো হয়। আর এটা বানায় কে? আমাদের মা-বাবা বা অভিভাবক এবং সমাজ, রাষ্ট্র, সিস্টেম। আর এই সিস্টেমটা কী? উত্তর, পুরুষতন্ত্র। পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমই জন্মের পর থেকে নানাবিধ বৈষম্যের মধ্য দিয়ে বড় করে তোলে ছেলে এবং মেয়েশিশুকে। আমরা সবসময় বলছি যে মেয়েরা সংসারে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের অদৃশ্য কাজ বা দায়িত্ব পালনকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, এখন এর প্রতিবাদ হচ্ছে সারাবিশ্বে, আর এই বৈষম্য হচ্ছে বলেই আমরা বলছি, কিন্তু ছেলেশিশুদের বৈষম্যের কথা আমরা সেভাবে বলছি না। মূলত সামাজিক সিস্টেম থেকে ‘বৈষম্য’ শব্দটা তুলে দিতে পারলেই আজকে নারী-পুরুষের বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে হয় না। নারীর কাজ বা দায়িত্বকে যখন সমানভাবে গুরুত্ব দেবে সমাজ বা রাষ্ট্র, তখন আপনাতেই ভারসাম্য আসবে।

জন্মের অব্যবহিত পর থেকেই মেয়েশিশুকে ‘একজন মেয়ে’ হিসেবে বড় করে তোলার প্রতিযোগিতা চলে। বাইরের বিশ্বে প্রথমেই তাকে গোলাপী পোশাক পরিয়ে চিহ্নিত করে দেয়া হয় যে তুমি মেয়ে। আমাদের দেশেও সচ্ছল পরিবারগুলোতে এই চল চলে এসেছে অনেক বছর থেকেই। মেয়েদের রং গোলাপী, আর ছেলেদের নীল। মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই খেলনা হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে রান্নাবাটি খেলবে, পুতুল খেলবে, নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের শাড়ি পরে সাজবে, মা-খালা-বাবাদের সাজাবে, তাতে সবাই খুশিতে গদগদ হবে। বড় হতে হতে তার শরীরে অযাচিত স্পর্শ পেয়ে সে জানবে সে মেয়ে, তার শরীরে স্তন আছে, আছে যোনি, যা কিনা তাকে কুণ্ঠিত করে তুলবে। মায়েদের চিন্তার কারণ হবে মেয়ে। তারপর সে বড় হতে থাকবে ভালো স্বামীর আশায়, এমনকি উচ্চশিক্ষার ডিগ্রিও নেবে ‘যোগ্য’ স্বামীর আশায়। এসব আশা কে জাগায়? সমাজই তো! এখনও কয়টা মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মন্ত্র শেখানো হয়? কয়টা মেয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার শিক্ষা পায়? জীবনভর বাবার বাড়িতে, তারপর স্বামীর বাড়িতে থাকতে থাকতে মেয়েটার পায়ে বেড়ি লেগে যায়, সে আর সেই বেড়ি কাটিয়ে উঠতে পারে না। বয়সটা চলে যায় সেই বেড়ির ওজন বইতে বইতে।

কবে আমরা একজন নারীর কাজের অথনৈতিক মূল্যায়ন করতে শিখবো?

আবার একজন পুরুষও যে ছোটবেলা থেকেই ভয়াবহ এক বৈষম্যের মধ্য দিয়ে বড় হয়, সেই ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয় যে, তুমি পুরুষ, তোমাকে কান্না করা চলবে না, মানায় না, তোমাকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে, তখন সেই ছোট মনটাতে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলে, আমরা কেউই তা ভাবি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে ভয় পায়। অধিকাংশই তখন আর এগোতে পারে না সেই ভয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে, তখন আমরা তাকে ‘ব্যর্থ’ ‘অক্ষম’ ‘অসফল’ পুরুষ বলি। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুখ থুবড়ে পড়ে ‘বড়দের’ চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে। তার হয়তো জীবনে কিছুই হতে ইচ্ছা করেনি, কিন্তু হতে হয় শুষ্ক, রুক্ষ কোনো এক কর্মকর্তা, যার জীবনে সকাল-সন্ধ্যা বলে কিছুই থাকে না। কয়টা পুরুষ তাদের আরাধ্য জীবন পায়, বলুন তো? ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হয় পুরুষরাও, কিন্তু সেই কথাগুলোও তারা বলতে পারে না ‘পুরুষালি ইগো’র কারণে, আর ইগোটাও তো তৈরি করে দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। পুরুষরা ওটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়, ওরাও একপর্যায়ে আগ্রাসী হয়ে উঠে। ছেলেশিশুরা যে ভয়াবহ যৌন সন্ত্রাস, ধর্ষণের শিকার হয়, সেই কথা কয়টা পুরুষ বলতে পারে? তারা অনেকেই এটাকেই  স্বাভাবিক যৌনতা মনে করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। ফলে তাদের যৌন জীবন যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি তারা নারীসহ অন্য আরও অনেকের জীবন তছনছ করে দেয়।

এই যে পুরুষদের এই বঞ্চনা, এই বৈষম্য, এটা কি পুরুষরা নিজেরা অনুভব করেন? কখনও ভাবেন যে তার ওপরে বিশাল বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে কোন এক অদৃশ্য সিস্টেম? যে সিস্টেমের কারণে তিনি একজন মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন ‘সত্যিকার মানুষ’ না হয়ে কেবলই পুরুষ হতে হতে নি:শেষ হয়ে যান! আর এইসব বঞ্চনা, ক্ষোভ থেকেই মূলত সব নির্যাতনেরও সূত্রপাত হয়! আমরা কোন ঘটনা ঘটলে খুব সাদাচোখে সবকিছু দেখে একটা রায় দিয়ে দিতে পছন্দ করি। কিন্তু মূলের কথাটা ভাবি না, সমস্যা আমাদের এখানেই।

আমার ছেলের বয়স যখন আট বছর, একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মা, বড় হয়ে কি আমাকে তোমাদের সবার দায়িত্ব নিতে হবে? চাকরি করে তোমাদেরকে খাওয়াতে হবে? আমিও চিরাচরিত মায়ের মতোনই তখন বলেছিলাম, হ্যাঁ বাবা, তাতো একটু নিতেই হবে। সে বললো, ‘মা, আমার ভয় করে। এই যে তুমি অনেক কষ্ট করছো, আমাকেও কি তখন এই কষ্টগুলো করতে হবে? আমি কি পারবো?’ আমি ওর সেই ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম সেদিন। আমি ওকে কোনদিন দায়িত্বের দিকে ঠেলে দিইনি। এজন্য আমার একা থাকার সংগ্রামে কষ্ট হয়েছে, তারপরও বিশ্বাস করি প্রতিটা মানুষ ইন্ডিভিজ্যুয়াল। অনেকেই বলে যে দায়িত্বের দিকে ঠেলে দিইনি বলেই হয়তো সে কিছুই হয়ে উঠতে পারেনি। হবে হয়তো। আমার মনে হয়, যার যার জীবন, সে নিজেই ঠিক করুক কীভাবে তা যাপন করবে! আমরা বরং পথটা দেখাতে পারি। তারা সেই পথটাকে চিনলে তো ভালোই, না চিনলেও আমার কোন অসুবিধা নেই।

এই ফেসবুকেই আমি কতজনের ছবি দেখি। হাসি হাসি মুখের সব সুখের ছবি একেকজনের। কিন্তু এসব ছবির ভিতরেও আমি ছেলেদের মুখটা বিশেষভাবে দেখি। বুঝতে চেষ্টা করি যে সেই চেহারায় কোনো অব্যক্ত কষ্ট, বোঝা বইবার সীমাহীন কষ্ট লুকিয়ে আছে কিনা! যেসব মা তাদের মেয়েদের টাকা আয় করা ‘যোগ্য’ ছেলের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে নি:শ্বাস ফেলেন, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তখন অজানা আশংকা অনুভব করে এই ভেবে যে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সব ওলটপালট হয়ে যেতে পারে এমন ‘নিশ্চিন্ত’ জীবনের। আজ যদি ওই ‘যোগ্য’ ছেলেটি কোন কারণে ‘নাই’ হয়ে যায়, সেই মেয়েটি বা মেয়েরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সেই শিক্ষা কি আমরা মেয়েদেরকে দিচ্ছি?

একটা ছেলেকে টাকা ইনকামের মেশিন বানানোর চাইতে তাকে মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে দেয়াই কি শ্রেয় নয়? সেইসাথে মেয়েকেও একই শিক্ষায় শিক্ষিত করা? যেন কাউকেই কারও দায়িত্ব বিশেষভাবে নিতে না হয়, আবার সবাই সবার দায়িত্ব নিতে সক্ষম হয়, ঘরের কাজ, বাইরের কাজ সবাই মিলেমিশে ভাগ করে নিতে শেখা, এমনভাবেই কি গড়ে তোলা যায় না? এক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরিসীম। সেই দাবি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কাছে করতে হয় না, এমনিতেই আসে। কিন্তু আপাদমস্তক সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত, চরম পুরুষতান্ত্রিক একটা রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের কাছে আমরা আসলে কীভাবে কী দাবি জানাতে পারি?

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয় সারাবিশ্বে। মেয়েরা এই শতাব্দিতে দাঁড়িয়েও যে সীমাহীন নির্যাতন সইছে, যে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে,  আমরা তার প্রতিবাদ করি সারা বছর জুড়েই, ওই বিশেষ দিবসটিতে আমরা নানারকম অঙ্গীকারও করি নারী-পুরুষ মিলিয়েই। নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানাই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বৈষম্য শব্দটির গূঢ় তাৎপর্যই আমরা বুঝতে পারি না। ফলে নারীর কাজের স্বীকৃতি আদায়ের কথা যখন বলি, একই সময়ে পুরুষের ওপর নির্যাতন, বঞ্চনার কথা আমাদের প্রতিবাদগুলোতে উঠে আসে না।

আজ ১৯ নভেম্বর, ইন্টারন্যাশনাল মেন’স ডে বা পুরুষ দিবস। আসুন আমরা ছবিতে যেরকমটি দেখানো হয়েছে একজন পুরুষের কাঁধে মাত্রাতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়ার যে চিত্র, সেটি পাল্টানোর চেষ্টা করি। বোঝাটা লাঘব করি অন্তত। সবাই পুরুষের ঘাড়ে না চেপে তার পাশে থাকি দায়িত্ব নিয়ে। আর একজন নারীর সন্তান জন্মদান, লালন-পালন থেকে শুরু করে তার গৃহস্থালী সব দায়-দায়িত্বকেও একইভাবে অথনৈতিক মানদণ্ডে ফেলে স্বীকৃতি দেয়া হোক। তবেই না বৈষম্যহ্রাসের দাবি সত্যিকার রূপ পাবে।

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, জন্মের পর থেকেই কাউকে ছেলে বা মেয়েতে বিভাজন না করে যদি মানুষ হিসেবে সবরকম সুযোগ-সুবিধা, একই শিক্ষা, একই বোধ দিয়ে বড় করি, তাহলে যুগের পর যুগ চলে আসা নারী নির্যাতনও অনেকখানিই কমে আসবে। এমনকি পুরুষ নির্যাতনও। পুরুষতন্ত্র আর পুরুষ এক জিনিস নয়, এটা বুঝতে শিখতে হবে সবার আগে পুরুষদেরকেই।

চলুন আমরা পুরুষতন্ত্রকে ‘না’ বলি,  সকল ধরনের বৈষম্য দূর করি। পুরুষরাও বলুক, বুঝুক যে তারা ভয়াবহ এক সিস্টেমের ষড়যন্ত্রের শিকার। আমরা সমতা চাই নারী-পুরুষে। একমাত্র সাম্যই পারে এই ভয়াবহ বৈষম্য থেকে উত্তরণ ঘটাতে। আরেকটা কথা, প্রথম ছবিটির বক্তব্য অনুযায়ী চলুন, আজ আমরা আমাদের পুরুষদের কাজের জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। সেইসাথে তারাও যেন জানে যে একটি সংসারে টাকা আয় করাই সব দায়িত্ব পালন না, নারীর কাজের পরিমাপ করা হলে এবং এর অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হলে তা কোনভাবেই ওই ছবির তুলনায় বড় বৈ কম হবে না।

সব পুরুষকে আজকের দিবসের ভালবাসা।

শেয়ার করুন:
  • 528
  •  
  •  
  •  
  •  
    528
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.