বিশেষ শিশুরাও যখন যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ শিকার – ২

শামীম আরা নীপা:

খুব স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং প্রতিবন্ধী শিশুরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয় যেহেতু ধর্ষকের মনঃস্তত্ত্বে তারা সবচেয়ে দুর্বল এবং কাউকে কিছু বলতে ও বোঝাতে অক্ষম। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুগুলোকে নিয়ে প্রচুর কাজ হওয়ার আছে, তাদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু কে করবে, কীভাবে করবে আমি জানি না।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না বলে এদের অনেকের না বলা কথা থেকে যায়। এ শিশুদের সঙ্গে কোনো ধরনের অন্যায় হলেও তারা সেটা প্রকাশ করতে পারে না। এমনভাবে তারা সেটা বলার চেষ্টা করে, যা আশেপাশের মানুষের বোধগম্য হয় না। যেহেতু তাদের আচরণগত কিছু সমস্যা থাকে, তাদের মনের কথা বোঝানোর চেষ্টাকে আশেপাশের মানুষ তাদের আচরণগত ত্রুটি বলে মনে করে।

শিশুরা বরাবরই অসহায় তাই তাদের উপর মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের উপর নির্যাতন হওয়ায় আশঙ্কা আরও বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ শিশুদের চেয়ে বিশেষ শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়ার হার প্রায় চারগুণ বেশি। অটিজম স্পিকসের তথ্যমতে, বুদ্ধির স্বল্পতা রয়েছে এমন শিশুদের যে কোনো নির্যাতনে শিকার হওয়ার হার সাধারণ শিশুদের চেয়ে সাতগুণ বেশি। সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল যুক্তরাষ্ট্রের জরিপে দেখা যায়, সে দেশের ১৮ বছরের নিচে সব মেয়েশিশুর প্রতি চারজনের একজন আর ছেলে শিশুর মধ্যে প্রতি ছয়জনে একজন যৌন নিগ্রহের শিকার। এ হিসাবে অটিজমসহ অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা কয়েকগুণ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড অ্যাবিউজ প্রজেক্টের ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার আর প্রায় ৪১ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার। আমাদের দেশে এ-বিষয়ক কোনো গবেষণা না থাকলেও সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সহজেই অনুমান করা যায়।

অটিজমসহ অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সার্বিক সচেতনতা এবং তা পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ এবং রাষ্ট্র- সব স্তরেই প্রয়োজন। আমাদের অসচেতনতার কারণে অনেক সময় সামাজিক অনুষ্ঠান, শপিংমলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়, উত্ত্যক্ত করা হয়, বক্রোক্তি করা হয়। এমনকি স্কুল এবং পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ তাদের বিদ্রুপ করে মানসিক নির্যাতন করেন। এসব শিশুদের আচরণে অনেক সময় বিরক্ত হয় পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, শিক্ষকসহ অনেকেই। পরিচর্যাকারীরাও অনেক সময় এদের শারীরিকভাবে আঘাত করে। ফলে এসব শিশু কষ্ট পায়, শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়। এক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে শিশু উভয়েই সমানভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার আগে আমাদের। এসব শিশুর সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে স্পর্শকাতর অঙ্গগুলোর নাম শেখাতে হবে। বোঝাতে হবে স্পর্শ করার ব্যাপারে। ভালো এবং খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। শেখাতে হবে এসব সমস্যার সম্মুখীন হলে যেন তা মা-বাবাকে তারা জানায়। অভিভাবকদেরও এসব শিশুর ভাষা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। সদা সতর্ক থাকতে হবে তাদের বিষয়ে।

‘স্ট্রেইনজার ইজ ডেনজার’—এটি সব সময় মাথায় রেখে অপরিচিত বা নতুন কারও কাছে (তিনি পুরুষ হন বা নারী) শিশুকে নিরাপদ মনে করা চলবে না। শিশুকে মা-বাবা তার শরীরের বিভিন্ন অংশে স্পর্শ করে ‘ঠিক’ বা ‘ঠিক নয়’ বা ‘গুড টাচ’, ‘ব্যাড টাচ’ বিষয়গুলো শেখানোর চেষ্টা করতে হবে। শিশুর আচরণের পরিবর্তনগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন। শিশু হঠাৎ রেগে গেলে, কান্নাকাটি করলে, বিছানায় প্রস্রাব বন্ধ হওয়ার পর আবার শুরু হলে, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠলে, মা-বাবাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইলে, শিশুর হাঁটাচলার সমস্যা হলে, শরীরে আঁচড়, কামড়ের দাগ দেখা গেলে, বিশেষ কাউকে দেখে ভয় পেলে, মনমরা হয়ে থাকলে বা অন্য কোনো আচরণের হঠাৎ পরিবর্তন হলে সতর্ক হোন। নিপীড়নের বিষয়টি মাথায় রেখে অনুসন্ধান করুন। সামাজিক দক্ষতা শেখাতে হবে। ‘না’ বলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এ জন্য ‘বেসিক লাইফ স্কিল’ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।

অটিজম বা অন্যান্য বিশেষ শিশুর ব্যক্তিগত কাজগুলো শেখাতে হবে, যাতে গোসল করা, টয়লেটে যাওয়া বা নিজের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে অপরের সাহায্য না লাগে।
ভাষার ব্যবহার বা ইশারা ভাষা শেখানোর সময় মনে রাখতে হবে যে তারা যেন কোনো ধরনের নির্যাতনের বিষয়টি মৌখিক বা অমৌখিকভাবে বুঝাতে সক্ষম হয়।
তাদের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী যৌন বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান দিতে হবে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক, গর্ভধারণ, পিরিয়ড বা স্বপ্নদোষবিষয়ক ধারণা দিতে হবে। কোনো অবৈজ্ঞানিক বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের মধ্যে তাদের রাখা যাবে না।

যেসব শিশুর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই, তাদের জন্য বাবা-মা বিশেষ ব্যবস্থা নেবেন। তাদের কখনোই একা রাখবেন না। বিশেষ করে কোনো সেবা বা পরিচর্যা নিতে গেলেও সব সময় সন্তানের সঙ্গে থাকবেন। কারও কথায় প্রভাবিত হয়ে সন্তানকে একা ছাড়বেন না।
যদি অটিজম বা অন্যান্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে যায়, তবে বিষয়টি গোপন করবেন না। তাকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। তার জন্য শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সেবাও প্রয়োজন। আর অবশ্যই বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিত করবেন। নিপীড়ককে শাস্তির আওতায় আনতেই হবে।
(শেষ)

আগের পর্বটির লিংক:

https://womenchapter.com/views/36515

শেয়ার করুন:
  • 77
  •  
  •  
  •  
  •  
    77
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.