স্তন ক্যান্সার: সচেতন হবার সময় এখনই

সাদিয়া সুলতানা:

যখন কলেজে পড়ি তখন প্রথম জানলাম মেয়েদের কিছু অসুখ হয় যা কেবল মেয়েদের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গেই মানানসই, যেমন-স্তন ক্যান্সার (পুরুষদেরও হয়, সম্প্রতি জেনেছি), জরায়ু ক্যান্সার, ওভারি-ইউটেরাসে জটিল ধরনের সিস্ট বা টিউমার বা ক্যান্সার ইত্যাদি। আরও জানলাম, স্পর্শকাতর অঙ্গের জটিল অসুখগুলো একেবারে শেষ পর্যায়ে টের পায় রোগী বা উপসর্গ দেখা দিলেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি হয়ে যায়। ঐ বয়সে শরীরের আট কুঠুরি নয় দরজার জটিলতা মাথায় রাখার মতো স্থির ছিলাম না আমি। তবু কৌতূহল থেকেই স্তন ক্যান্সার নিয়ে সতর্কতা আর নিজের স্তন পরীক্ষা করার পদ্ধতি বিষয়ে একদিন পত্রিকায় আর্টিকেল পড়েছিলাম।

সেই সময়ে ভেবে অবাক হয়েছি, কেন আমার পরিবারের কোনো মেয়ে সদস্য কোনোদিনও আমাকে এই বিষয়ে সতর্ক করেনি? যেই মেয়ের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় মা অহর্নিশি দরজায় চোখ রাখে, যেই মেয়েকে নিজ হাতে চুল বাঁধা থেকে ঘরকন্না, পড়াশুনা শেখায় সেই মেয়েকে কোনোদিনও কেন মা এই বিষয় শেখায়নি! মায়ের ওপর রাগ করা যায় কিনা বুঝতাম না। নাকি মায়ের অজ্ঞতায় তাকে করুণা করা যায়, বুঝতাম না। তবে কালে কালে জগতের ফিসফাসে কান পাততে পাততে বুঝলাম শুধু আমার মা-ই নয় এসব বিষয় শরীরের নাজুক অংশের মতো ঢেকে ঢুকে দিনকাল পার করেছে আমাদের প্রায় সকলের মায়েরা।

আমরা যারা এগিয়ে চলেছি তাদের ভেতর ঠিক কত সংখ্যক মা বাবা আছেন যারা এখন নিজের সন্তানকে নিজের স্তন পরীক্ষা করতে শেখান, সচেতন করেন, আমি জানি না। তবে আমি করতে চাই। স্তন ক্যান্সার, স্তন টিবি, সন্তান জন্মদানের পর দীর্ঘ বছর ধরে বুকে দুধ জমে থাকার পরে সৃষ্ট হওয়া পিন্ড, এসব অসুখ ঘুণপোকার মতো আমার মেয়ের, মায়ের, বোনের, পরিচিতের শরীরটা যেন গোপনে ঝাঝরা না করে ফেলে সেজন্য মুখের দুয়ারটা আলগা করতে চাই।

জ্বর হয়েছে বা জ্বর হলে কী করতে হয় তা প্রকাশে তো কোনো সংকোচ নেই আমাদের। তাহলে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা প্রকাশে সংকোচ কেন থাকবে? সত্যি আমরা নিজেরা স্তনের অসুখের জন্য সতর্ক হলে, অন্যকে সতর্ক করতেও আমাদের সংকোচ থাকবে না।

তাকিয়ে দেখুন আমাদের চারপাশে অনেক ব্রেস্ট ক্যান্সার সারভাইভর আছেন। নাহ্, বিশেষভাবে তাকানোর দরকার নেই। তিনি বা তারা জগতের সামনে নিজেকে বিশেষ করে দেখানো পছন্দ করেন না। যতোটা আমরা করি। যে মানুষ আর তার পরিবার মরণব্যাধির বিরুদ্ধে শারীরিক, মানসিক, আর্থিকভাবে সংগ্রাম করে চলে তাদের দিকে আমরা শুধু বিশেষভাবে তাকাই-ই না, এই যোদ্ধাদের মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে ফেলি। এমনকি সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে বিচার করতে গিয়ে তাদের আমরা উপহাসের পাত্রও বানাই। এই প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি।

সেদিন একজন স্কুল শিক্ষিকা আপার সঙ্গে জুতার দোকানে দেখা। বললেন, ভালো আছি আপা। আপার শরীরের কমতিটুকু তার স্নিগ্ধ হাসি পূরণ করে দিলো। হঠাৎ খেয়াল করলাম আপার পাশ দিয়ে যাবার সময় কিছু মানুষ কানাঘুঁষা করছে, তির্যক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। বুঝলাম, আপার স্তনহীন শরীর তাকে দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত করেছে। তবে আপার জীবনসঙ্গী আর মেয়ের প্রাণোচ্ছল খুশিতে বুঝলাম ক্যান্সারের মতো অনেক জীবাণুকে তারা ঝেঁটিয়ে তাড়ান।

‘অ্যাই চুপ, এসব বিষয় থাক, থাক’ এসব বলার দিন কি আসলেই ফুরিয়েছে? বুকে হাত রেখে বলুন তো! ফুরায়নি। আমরা বলি এখনো। এখনো এসব রোগের কথা উঠলে গলার স্বর নিচু করি। গোপনে গোপনে চিকিৎসা করাই। চিকিৎসা না করেও দিন পার করি। এমনকি শহর-গ্রামের অনেক নারীই আছেন যারা এখনো পুরুষ ডাক্তারের কাছে যেতে চান না।

আমি যাই। এক্ষেত্রে আমার প্রয়োজনকেই আমি প্রাধান্য দিই। গত তেরো বছরের মধ্যে আমার শরীরে চারবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই জানতে চেয়েছেন সবাই নারী ডাক্তার কিনা। আমি বলেছি, ‘না ভাই, আমার ডাক্তারদের মধ্যে পুরুষ ডাক্তারও আছেন।’

যারা এসব পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেননি তারা নিজের অবস্থানে থেকে ঠিক বুঝবেন না কী করে এখনো অনেক মেয়ে সংকোচে নিজের অসুখের কথা গোপন রাখে। আমি আশেপাশের অনেককেই এমন দেখছি। আমার দূরের এক আত্মীয় এক অসুখে ভুগছেন কিন্তু আমার মতো ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে অপারেশন করছেন না। কারণ, পুরুষ ডাক্তারকে কীভাবে তিনি শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গ দেখাবেন সেই সংকোচ তাকে বাঁধা দিচ্ছে। জানতে পারলাম, তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলেন, ‘ডাক্তারসাব যদি পুরুষ হয়, তার কাছে কাপড় তুলবো কিবা?’ একইভাবে অনেক বন্ধু আছেন তারা কীভাবে পাইলস, জরায়ুমুখ, স্তন ইত্যাদির রোগনির্ণয় করতে ডাক্তারের কাছে যাবে তা ভেবেও অস্বস্তিতে ভোগে। তারা ভাবেন, এসব অসুখের কথা প্রকাশ হলে আত্মীয়-স্বজনেরা কটাক্ষ করবেন, হাসবেন। বাস্তবে অনেকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখিও হচ্ছেন।

জরায়ু ক্যান্সার, ওভারি-ইউটেরাসে জটিল ধরনের সিস্ট বা টিউমার বা ক্যান্সার ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার মতো জ্ঞানের বিস্তৃতি আমার নেই। তবু আমি এখন জানতে চাই। জানাতে চাই আরো পড়তে চাই। বুঝতে চাই। সংকোচ ঝেড়ে ফেলে সবার সঙ্গে বিষয়গুলো ভাগাভাগি করতে চাই। কারণ এই ধরনের ঘাতক ব্যাধির উপসর্গ দ্রুত সনাক্ত করতে পারলেই আমরা দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা নিতে পারবো, নিজেকে ও নিজের পরিবারকেও সংকটমুক্ত করতে পারবো।

আর কী করতে পারি? আপনি বা আমি কি শরীরের অঙ্গ হারানো মানুষের বেদনা নিজের শরীর দিয়ে বুঝতে পারবো? পারবো না। শব্দের রিফুতে মানুষের মনের ক্ষতে প্রলেপ দেয়া যায় কিন্তু ক্ষতের কষ্টটা বোঝা যায় না। তাই আসুন, ক্ষত বেশি গভীর হবার আগেই আমাদের আপন আলোয় থাকা আপন মানুষগুলোকে সচেতন করি, নিজেরা সচেতন হই।

শেয়ার করুন:
  • 201
  •  
  •  
  •  
  •  
    201
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.