বিশেষ শিশুরাও যখন যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ শিকার-১

শামীম আরা নীপা:

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যৌন হয়রানি নিয়ে বলার আগে বলতে চাই যে শিশু নির্যাতনের প্রধান কারণগুলো কী কী? কীভাবে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়? শিশুরা সব থেকে বেশি অসহায় এবং দুর্বল, তাদেরকে নির্যাতন করলে তারা কাউকে বলতে পারে না, ভয় পায়। আর আমাদের দেশের বাবা-মা খুব বেশি মনোযোগ দিয়ে বাচ্চাদের কথাও শোনে না। যার ফলে নির্যাতন নিপীড়নের কথা শিশুরা সাহস করে মা বাবাকে বলতেও পারে না। শিশুদের অসহায় অবলা দুর্বল ভেবেই একজন ধর্ষক কিংবা নিপীড়ক শিশুদেরকে টার্গেট করে।

বাচ্চাদেরকে যেহেতু সেক্স এডুকেশন দেয়া হয় না তাই বাচ্চারাও নিজেদের শরীরকে বোঝে না, খারাপ স্পর্শ, ভালো স্পর্শ সম্পর্কে জানে না এবং শরীরের সংবেদনশীল স্পর্শকাতর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সম্পর্কেও তাদের ধারণা থাকে না, যার জন্য শিশুরা প্রতিরোধ প্রতিবাদও করতে পারে না। তাদের সাথে যৌন বিকার ও লালসা চরিতার্থ করা সহজ হয় বেশি।
যেহেতু বেশিরভাগ নির্যাতন ঘটায় কাছের মানুষ, দেখা যায় দীর্ঘদিন ধরে শিশুটি ও তার পরিবারকে পর্যবেক্ষণ করে সুযোগ খুঁজতে থাকে তারা এবং সুযোগ পেলেই যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ ঘটায়।
শিশু নির্যাতনের অন্যতম কারণ হলো অসুস্থ সংস্কৃতি, যা মানুষের মনকে প্রভাবিত করে শিশুকে সম্পদ এবং যৌন উদ্দীপক বস্তু হিসেবে দেখতে যার ফলে শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের হিংসাত্মক আচরণ এবং লালসার শিকার হচ্ছে।

অনেক সময় মা বাবার সাথে শত্রুতার কারণে শিশুর উপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ ঘটে।
ক্ষমতার দাপটেও শিশুদের উপর ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন চলে। ধর্ষক নিপীড়ক ভাবে যে তার ক্ষমতার কারণে তার কোন শাস্তি হবে না এবং ক্ষমতাই তাকে যেকোনো বয়সের শিশু ও নারীকে ধর্ষণের অধিকার দিয়েছে। দেশের রাজনীতি ও সমাজনীতি এসব ধর্ষককে প্রশ্রয় দিয়ে যৌন সন্ত্রাসকে উস্কে দিচ্ছে বারবার।

সমাজ পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত প্রযুক্তি ও বৈষয়িক উন্নয়নের সাথে সাথে। সমাজ পরিবর্তনের সময় প্রযুক্তি বা বৈষয়িক সাংস্কৃতিক উপাদান যত সহজে আমরা গ্রহণ করি,তার সাথে অবৈষয়িক বা ভাবগত সংস্কৃতি- তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অপব্যবহারের ফলে যৌনতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। এখন তথাকথিত সামাজিক রূপান্তর এবং উন্নয়ন আধুনিকতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এই বন্ধনগুলো ভেঙে গেছে বা যাচ্ছে। যেমন পরিবার, প্রতিবেশী, এলাকাভিত্তিক সংগঠন এগুলো নানাভাবে আমাদের সংযত হতে শিখিয়েছে, মানবিক হতে শিখিয়েছে।আদর্শ, মূল্যবোধ, নিয়ম, নীতি-নৈতিকতা তেমনভাবে গ্রহণ করি না। ফলে প্রযুক্তি বা বৈষয়িক সংস্কৃতি কতটুকু কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেটা আমরা জানি না। ফলে আমরা বেপরোয়া, উন্মত্ত হয়ে উঠি। অপরাধ বাড়তে থাকে। আর অবাধ প্রযুক্তি, মাদক, পর্নোগ্রাফির কারণে একজন পুরুষ তার যৌন প্রবৃত্তিটাকে বেপারোয়াভাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে বলেই ধর্ষণসহ অপরাপর অপরাধ বাড়ছে। এবং যার হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছে না শিশুরা।

ঘরে, বাইরে, রাস্তায়, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় শিশুরা যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয়।

আত্মীয়স্বজন বাচ্চাকে আদর করার বাহানায় যৌন নিপীড়ন করে। খেলনা কিংবা খাবারের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করে একলা ঘরে নিয়ে গিয়ে। শিশুদেরকে মেরে ফেলার কিংবা মারধরের ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়, যৌন নিপীড়ন করা হয়। জোড় করে ধরে নির্জন স্থানে নিয়েও শিশুদেরকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করা হয়। ধর্ষক নিপীড়করা সুযোগ পেলে বাচ্চাদের স্পর্শকাতর অঙ্গ প্রত্যঙ্গে স্পর্শ করে খেলার ছলে কিংবা আদরের বাহানায়। পথশিশুদের সাথে এসব বেশি ঘটে। প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বাচ্চাদের সাথেও বেশী ঘটে এবং এই মাত্রা বেশী হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। আবাসিক স্কুল কলেজ মাদ্রাসায় বাবা মা ছাড়া বাচ্চারা একা থাকে, সেইখানে বাচ্চারা ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয় শিক্ষক কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে। ধর্ষক নিপীড়ক সবসময়ই সুযোগের খোঁজে থাকে এবং সুযোগ পেয়েও যায় যেহেতু তারা দুরের কেউ না বরং পরিচিত গণ্ডির ভেতরই তাদের বাস।

সকল শিশু নিয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, শিশুকে সাবধানে রাখতে যেয়ে অন্যদের সঙ্গে খেলাধুলা, শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করলে অনেক সময় তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমন নিয়ন্ত্রণের কারণে শিশুর সামাজিক দক্ষতা কমে যায়। আর সামাজিক দক্ষতা কমে গেলে সে নিপীড়নের পরিবেশ পরিস্থিতিকে সামাল দিতে পারবে না। কেবল নির্দিষ্ট মানুষের কোলে কোলে সে বড় হলে সামাজিক দক্ষতার জায়গাগুলো সংকুচিত হয়। সে প্রতিরোধ করতে না পেরে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে উল্টো ভয় পাবে। শিশুদের প্রতি সবসময় অনুসন্ধানীমূলক নজরদারি করতে হবে এবং বাচ্চাদের বন্ধু হতে হবে যেন বাচ্চারা মা বাবার সাথে সবকিছু শেয়ার করতে পারে। শিশুরা যেন মা বাবার উপর আস্থা রাখতে পারে। শিশুকে বুঝতে দেন যে, আপনি আপনারা তার সাথে তার পাশেই আছেন। শিশুদেরকে যথাযথ সেক্স এডুকেশন দিতে হবে। তাদেরকে নিজেদের শরীর চেনাতে হবে, স্পর্শকাতর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ চেনাতে হবে এবং খারাপ ও ভালো স্পর্শ সম্পর্কে জানাতে ও শেখাতে হবে।

এতো গেলো অন্যসব স্বাভাবিক শিশুদের বেলায় কী করতে হবে বা কী করা উচিত, তা। কিন্তু শিশুটি যখন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হয়, যখন সে নানান প্রতিবন্ধকতায় ভুগে, তখন সচেতনতা সৃষ্টির জায়গাটিও হতে হয় বিশেষ ধরনের। এক্ষেত্রে শিশুটিকে প্রশিক্ষণ দেয়ার চাইতেও বেশি জরুরি হয়ে উঠে তাদের কেয়ারগিভারদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি। তাদেরকেই তখন বিশেষভাবে সজাগ, সতর্ক থাকা জরুরি।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটি যখন হঠাৎ করেই আগের চেয়ে বেশি রাগ করে কিংবা নিজেকেসহ আশেপাশের সকলকে আঘাত করে কিংবা অস্থির হয় কিংবা খিটখিটে হয়ে যায় তবে তৎক্ষণাৎ বাচ্চাটার সমস্ত শরীর চেক করে নেন যে কোথাও কোন আঘাতের কিংবা নিপীড়নের চিহ্ন পান কিনা। পেলেন কিংবা না পেলেন শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। নিশচয়ই শিশুটি কোন না কোনভাবে আঘাত কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলেই তার আচরণে এতো পার্থক্য এসেছে হঠাৎ করে।

বাচ্চাটি যখন হঠাৎ করেই সবকিছুতে ভয় পাচ্ছে, রাতে ঘুমাচ্ছে না, ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার করে উঠছে, সারাক্ষণ মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকছে, খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে, রাতে বিছানা ভিজাচ্ছে যা আগে ছিলোনা তখন সাথে সাথে আবারও বাচ্চার শরীর চেক করেন এবং চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং অবশ্যই বাচ্চাটির সাথে সারাক্ষণ থাকেন, দেখেন যে কোথায় সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে। নিশ্চয়ই শিশুটি কোন না কোনভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলেই এমনটা করছে।
এ জাতীয় শিশুরা কিছু বলতে কিংবা বুঝাতে পারে না, কিন্তু তারা ব্যথা পায়। তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে অনিরাপদ বোধ করে, নিষ্পেষিত হয় কিন্তু কাউকে বলতে বা বুঝাতে পারে না – এরচেয়ে ভয়ংকর কষ্ট আর কিছু নাই।

আমাদের দেশে অটিজম নিয়ে বিশেষ কোন আলোচনা নাই। প্রতিবছর এপ্রিলের ২ তারিখ আসলে বিশ্ব অটিজম দিবস উপলক্ষে কিছু আলোচনা হয় ছাড়া আর কোন হেলদোল চোখে পড়ে না। অটিজম কোন নতুন নিউরোলজিক্যাল সমস্যা নয়, দীর্ঘকাল থেকে এই সমস্যা শিশুদের হয়, কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ বুঝতেই পারতো না যে শিশুটি স্নায়ুর অসুখে ভুগছে, চিকিৎসাও উন্নত ছিলো না এই বিষয়ে, সেই সুযোগ-সুবিধা এখনও বাংলাদেশে নাই, আর যেটুকু আছে তা খুবই ব্যয়বহুল।

অতীতে এসব শিশুদের দেখে বলা হতো জ্বীনে ধরা বাচ্চা কিংবা পাগল। এখনও গ্রামাঞ্চলে এসব কথা প্রচলিত। অটিজম ও তার প্রতিকার ও করণীয় সম্পর্কে খুব বেশি কিছু এখনও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ জানে না। আরো জানেনা এই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের উপর হওয়া ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা। কোন পরিসংখ্যান নাই, কোন আলোচনা নাই কোথাও। হয়তো তিন-চারটে এনজিও কিংবা বেসরকারি সংস্থা এসবের খোঁজে ও কাজে আছে কিন্তু সেসব সারাদেশের সাধারণ মানুষের কান অব্দি পৌঁছে না। সরকারও কাজ শুরু করেছে কিন্তু খুব বেশি এগিয়েছে বলে কোন প্রমাণ মেলেনি এখনও। এইসব শিশুদের নিয়ে প্রচুর কাজ করার আছে, সচেতনতা ছড়ানোর আছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার প্রয়োজন আছে, তাদের সুবিধাবান্ধব স্কুল কলেজ, সামাজিক পরিবেশ গড়ার প্রয়োজন আছে। তাদের সবরকম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন আছে।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 313
  •  
  •  
  •  
  •  
    313
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.