স্তন ক্যান্সার: স্টেজিং এবং ধরন

মনিকা বেগ:

 

স্তন ক্যান্সার: স্টেজিং (staging) কী এবং কেন?

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা স্তন ক্যান্সারকে কয়েকটি স্টেজে (stage) ভাগ করেছেন। কারণ স্টেজিং করার মাধ্যমে তারা অনুমান করতে পারেন যে একজন রোগীর স্তন ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু এবং তার জন্য কোন চিকিৎসা পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো হবে।

স্টেজিং করার জন্য ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের কী কী তথ্য প্রয়োজন হয়:

১) টিউমারটি বা টিউমার (tumor) গুলো কত বড়,

২) ক্যান্সার কোষ (cell) গুলো আসে পাশের লিম্ফ নোডে (lymph node) – যেমন বগলের নিচে, গলার হাড়ের (collarbone) উপরে বা নিচে  ছড়িয়েছে কি না,

৩) ক্যান্সার কোষগুলো শরীরের অন্য কোনো অংশে – যেমন হাড় (bone), ফুসফুস (lungs), ব্রেইন (brain), লিভার (liver) – ছড়িয়েছে কিনা,

৪) ক্যান্সার কোষগুলো কতখানি আক্রমণাত্মক (aggressive),

৫) ক্যান্সার কোষগুলো এস্ট্রোজেন (estrogen) এবং প্রোজেস্টেরন (progesterone) হরমোন সংবেদনশীল কিনা,

৬) ক্যান্সার কোষগুলো জিন মিউটেশন (gene mutation) হয়ে মাত্রাতিরিক্ত HER2 প্রোটিন/রিসেপ্টর তৈরি করছে কিনা, এবং

৭) জিন এক্সপ্রেশন প্রোফাইল (gene expression profile) পরীক্ষার ফলাফল।*

(*এর মধ্যে ৭ নম্বরটি একটি অত্যাধুনিক এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল পরীক্ষা, যেটি আমাদের দেশে হয় কি না আমার জানা নেই। এমনকি উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই, এই পরীক্ষা এখনও তেমন প্রচলিত নয়)

উপরে উল্লিখিত তথ্যাদির ভিত্তিতে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা স্তন ক্যান্সারকে মোট ৫ টি স্টেজ (০ থেকে ৪ পর্যন্ত) এ বিভক্ত করেছেন।

এর মধ্যে, ‘স্টেজ ০’ র মানে হচ্ছে, ক্যান্সার কোষগুলো স্তনের দুগ্ধ নালীর (duct) মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে, স্তনের অন্য টিস্যু (tissue) তে ছড়ায়নি।

আর ‘স্টেজ ৪’ র মানে হচ্ছে, ক্যান্সার কোষগুলো স্তনের টিউমার এবং আশেপাশের লিম্ফ নোডের গণ্ডি পেরিয়ে শরীরের দূরবর্তী লিম্ফ নোড এবং অংশে (যেমন হাড়, ফুসফুস, ব্রেইন, লিভার) ছড়িয়ে পড়েছে।

 

স্তন ক্যান্সার: কত ধরনের হয়?

স্তন ক্যান্সার বেশ কয়েক ধরনের হলেও তাদেরকে দুটি প্রধান ক্যাটাগরিতে (category) ভাগ করা যায়:

  • নন-ইনভেসিভ (non-invasive or in situ): স্তন ক্যানসার কোষ (cell) গুলো যখন স্তনের যেই টিস্যুতে (tissue) তাদের জন্ম হয়েছে, সেই টিস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকে, স্তনের অন্য কোনো টিস্যুতে ছড়ায় না, তখন তাকে নন-ইনভেসিভ স্তন ক্যান্সার বলে। (ক্যান্সার স্টেজ – ০)
  • ইনভেসিভ (invasive): স্তন ক্যানসার কোষগুলো যখন স্তনের যেই টিস্যুতে তাদের জন্ম হয়েছে, সেই টিস্যুতে সীমাবদ্ধ না থেকে স্তনের অন্য টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে ইনভেসিভ স্তন ক্যান্সার বলে। (ক্যান্সার স্টেজ – ১, ২, ৩ বা ৪ এর যে কোনোটিই হতে পারে)

এখন চলুন দেখা যাক, কত ধরনের স্তন ক্যান্সার আছে-

১) ডাকটাল কার্সিনোমা ইন সাইটু (Ductal carcinoma in situ – DCIS): এটি একটি নন-ইনভেসিভ ক্যান্সার। এই ধরনের ক্যান্সারে ক্যান্সার কোষগুলো স্তনের দুগ্ধনালীতে (Duct) জন্ম নেয়। এবং দুগ্ধনালীতেই সীমাবদ্ধ থাকে। স্তনের অন্য কোনো টিস্যুতে ছড়ায় না। একদম প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও DCIS এর চিকিৎসা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। (ক্যান্সার স্টেজ – ০)

২) লোবিউলার কার্সিনোমা ইন সাইটু (Lobular carcinoma in situ – LCIS): এটির নামে ক্যান্সার থাকলেও, এটি আসলে ক্যান্সার নয়। LCIS এ ক্যান্সার কোষের মতো দেখতে কিছু অস্বাভাবিক কোষ, স্তনের দুগ্ধ উৎপাদনকারী লোবিউলে (Lobule) জন্ম নেয়। এবং লোবিউলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কারো LCIS থাকলে ভবিষ্যতে তার ইনভেসিভ স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই কারণে LCIS এর রোগীদের মাসে একবার করে নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা এবং ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে ফলো-আপ (follow up) এ যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

৩) ইনভেসিভ ডাকটাল কার্সিনোমা (Invasive ductal carcinoma – IDC): এটি একটি ইনভেসিভ ক্যান্সার। নারীদের মাঝে এটির প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এই ধরনের ক্যান্সারে ক্যান্সার কোষগুলো স্তনের দুগ্ধনালীতে জন্ম নিলেও ধীরে ধীরে স্তনের অন্য টিস্যুতে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে যায়। IDC এর চিকিৎসা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। (ক্যান্সার স্টেজ – ১, ২, ৩ বা ৪ এর যে কোনোটিই হতে পারে)

৪) ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা (Invasive lobular carcinoma – ILC): এটি একটি ইনভেসিভ ক্যান্সার। এই ধরনের ক্যান্সারে ক্যান্সার কোষগুলো স্তনের দুগ্ধ উৎপাদনকারী লোবিউলে জন্ম নেয়। কিন্তু লোবিউলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ধীরে ধীরে স্তনের অন্য টিস্যুতে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে যায়। ILC এর চিকিৎসা নেয়াও অত্যন্ত জরুরি। (ক্যান্সার স্টেজ – ১, ২, ৩ বা ৪ এর যে কোনোটিই হতে পারে)

উপরে উল্লেখিত চার ধরণের স্তন ক্যান্সার ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের স্তন ক্যান্সার আছে, যেগুলোর প্রাদুর্ভাব অপেক্ষাকৃতভাবে কম, যেমন:

৫) প্যাজেট ডিসিস অফ দা নিপল (Paget disease of the nipple): এই ক্যান্সার স্তনের বোঁটার ভিতরে অবস্থিত দুগ্ধনালীতে শুরু হয়, এবং ধীরে ধীরে স্তনের চামড়াতে (বোঁটার চার পাশের চামড়া সহ) ছড়িয়ে পড়ে।

৬) ফাইলোডেস টিউমার (Phyllodes tumor): এই টিউমার স্তনের কানেক্টিভ টিস্যুতে (connective tissue) হয়। এই ধরনের টিউমারের অধিকাংশই নির্দোষ হলেও কিছু কিছু টিউমার ক্যান্সারে রূপ নেয়।

৭) এনজিওসার্কোমা (Angiosarcoma): এই ধরনের ক্যান্সার স্তনের রক্তনালী (blood vessels) অথবা লিম্ফনালীতে (lymph vessels) হয়ে থাকে।

৮) ইনফ্লামেটরি স্তন ক্যান্সার (Inflammatory breast cancer): এই ধরনের স্তন ক্যান্সারে ক্যান্সার কোষগুলো স্তনের চামড়ায় অবস্থিত লিম্ফ নালীগুলোতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, ওগুলোকে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে স্তন লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে। এই ধরনের ক্যান্সারে, সাধারণত কোনো গোটা বা চাকা হয় না।

এছাড়াও একটি জীন এবং দুটি হরমোন আছে, যেগুলো স্তন ক্যান্সারের বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, যেমন:

  • HER2 জীন: এই জীনটি মিউটেশন হয়ে স্তন ক্যান্সারকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে। বায়োপসি করে যদি দেখা যায়, ক্যান্সারটি HER2 রিসেপ্টর সংবেদনশীল (HER2 positive), তার মানে মাত্রাতিরিক্ত HER2 রিসেপ্টর স্তন ক্যান্সারকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, ওষুধ (হারসেপটিন থেরাপি) দিয়ে এই জীনকে থামিয়ে দেয়া যায়।
  • এস্ট্রোজেন হরমোন: বায়োপসি করে যদি দেখা যায়, ক্যান্সারটি এস্ট্রোজেন হরমোন রিসেপ্টর সংবেদনশীল (Estrogen receptor positive – ER positive), তার মানে এস্ট্রোজেন হরমোন ঐ ক্যান্সারের বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। ওষুধ (হরমোন থেরাপি) দিয়ে এস্ট্রোজেন হরমোনকে থামিয়ে দেয়া যায়।
  • প্রোজেস্টেরন হরমোন: বায়োপসি করে যদি দেখা যায়, ক্যান্সারটি প্রোজেস্টেরন হরমোন রিসেপ্টর সংবেদনশীল (Progesterone receptor positive – PR positive), তার মানে প্রোজেস্টেরন হরমোন ঐ ক্যান্সারের বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। ওষুধ (হরমোন থেরাপি) দিয়ে প্রোজেস্টেরন হরমোনকেও থামিয়ে দেয়া যায়।
  • ট্রিপল নেগেটিভ (Triple negative): কিন্তু বায়োপসি করে যদি দেখা যায়, কোন স্তন ক্যান্সারে এই তিনটি রিসেপ্টরের (HER2 রিসেপ্টর, এস্ট্রোজেন হরমোন রিসেপ্টর এবং প্রোজেস্টেরন হরমোন রিসেপ্টর) একটিও নেই, তখন সেই ক্যান্সারকে ট্রিপল নেগেটিভ (Triple negative) বলা হয়। হারসেপটিন থেরাপি বা হরমোন থেরাপি এখানে কাজ করে না।

(চলবে)

ডাক্তার মনিকা বেগ,
প্রধান এবং বৈশ্বিক সমন্বয়ক (অবসরপ্রাপ্ত),
এইচআইভি/এইডস সেকশন,
জাতিসংঘ সদর দপ্তর,
ভিয়েনাঅস্ট্রিয়া।

 

 

শেয়ার করুন:
  • 402
  •  
  •  
  •  
  •  
    402
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.