দেশটারে কোন অন্ধকারে নিয়ে এলাম প্রিয় বঙ্গবন্ধু…

ফারদিন ফেরদৌস:

গেল শুক্রবার একই দিনে প্রতিক্রিয়াশীল দু’টি ইসলামী গ্রুপ তাদের হাজারো অনুসারীদের সোহবতে ঘোষণা দিয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্থাপিত ভাস্কর্য অপসারণ করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন জানাচ্ছে…
‘রাজধানীর ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধুর নামে স্থাপিত ভাস্কর্যকে মূর্তি হিসেবে উল্লেখ করে তা অপসারণের দাবি জানিয়েছে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর ধূপখোলা মাঠে এক সমাবেশ থেকে বক্তারা এই দাবি জানান। বক্তারা বলেন, মূর্তির বদলে আল্লাহ, কোরআন ও হাদিসের বাণী সংম্বলিত মিনার স্থাপন করতে হবে। তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ মুসলমানদের দেশ, মসজিদের দেশ, মাদ্রাসার দেশ এখানে কোন মূর্তি থাকতে পারবে না।

অপরদিকে বাংলা ট্রিবিউনের খবর বলছে,
‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক। শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) রাজধানীর বিএমএ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে শানে রিসালাত কনফারেন্সে তিনি এ দাবি জানান।

মামুনুল হক বলেন, ‘ধোলাইখালে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি স্থাপন বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে গাদ্দারি করার শামিল। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করে তারা বঙ্গবন্ধুর সু-সন্তান হতে পারে না। এর মাধ্যমে মসজিদের শহরকে মূর্তির শহরে পরিণত করার অপচেষ্টা চলছে। এ মূর্তি স্থাপন বন্ধ করুন। যদি আমাদের আবেদন মানা না হয়, আবারও তওহিদি জনতা নিয়ে শাপলা চত্বর কায়েম হবে।’

এক্সট্রিমিস্ট মৌলভীদের এই আস্ফালন বাংলাদেশের ভবিতব্যই ছিল। যেখানে রাজনৈতিক খুঁটি নড়বড়ে সেখানে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণাবাদ মাথাচারা দেবে এটা নতুন কিছু না। তাদের দাবির মুখে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই পরিবর্তন করবার বেলাতেই তা টের পাওয়া গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে স্থাপিত ভাস্কর্য জাস্টিসিয়া সরিয়ে চোখের আড়ালে নেয়ার সময়েই ব্যাপারটা বোঝা গিয়েছিল।

আসল ধর্ম নয়, ধর্মের ঔদার্য বা সৌন্দর্য নয়, স্রেফ ব্যক্তিস্বার্থে ধর্ম নিয়ে কট্টরপন্থী ওয়াহাবি-সালাফিদের যে বহুবিধ বাণিজ্যিক সেন্টিমেন্ট ইতোমধ্যে তা শহর ছাড়িয়ে গ্রামবাংলার শিকড়েও প্রোথিত হয়ে গেছে। এর একক দায় ইউটার্ন করা ও ব্যাপকভাবে ডানপন্থায় বদলে যাওয়া আওয়ামী লীগের। দেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও চেতনাপ্রসূত অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের জন্য গণতন্ত্র খোদ লীগাররাও এখন আর বিলিভ করে না। বকধর্ম এখন তাদের সবার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এরা ধর্মেও আছে, সমান্তরালে আছে জিরাফেও।

মাদ্রাসায় ছেলে শিশু ধর্ষণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে দখলবাজি, চাঁদাবাদি, ঘুষ খাওয়া, লুটপাট করা, ঘৃণা বা হিংসা ছড়ানো এদের কাছে দোষের কিছু না। যত দোষ এখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে।

এরা জানে, এরা যা বলবে এই রাষ্ট্রযন্ত্র তাই তাই করবে। রাজনীতির আপোসকামীতার ফল তাদের ঘরেই যাবে। এইসময় আর সৈয়দ আশরাফুল হকের মতো তেজোদীপ্ত, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক আর অবশিষ্ট নাই তাই এখনই এই ব্যাকডেটেড গোঁয়াররা শাপলা চত্বরের কানধরা অপমান ভুলে মরণপন দাবি তুলতে পারে…

¶ এই দেশে নারী নেতৃত্ব হারাম। নারীর অধীনতা বা বশ্যতা তারা স্বীকার করবে না।

¶ আফগানিস্তানের বানিয়ান প্রদেশের মতো করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার গুড়িয়ে দিতে হবে।

¶ স্বাধীনতার সূর্যসন্তানদের স্মরণে নির্মিত সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ বোম্ব মেরে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

¶ হিন্দুয়ানি বাংলা নয় আরবী প্যাটার্নের উর্দুকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।

¶ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা নৈধার্মিক নির্বিশেষে একদিনের শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ নারীকে বোরখা পরানো ছাড়া বাইরে বের হতে দেয়া যাবে না।

¶ তাদের মতাদর্শী ছাড়া বাকি মানুষকে রোহিঙ্গা রিফিউজিদের মতো দেশ ছেড়ে গিয়ে অন্যত্র মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হবে। বিশেষকরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেহেতু মূর্তিপূজা করেন, তাদের জন্য এই দেশ কিছুতেই নয়।

¶ বিজ্ঞানমনস্ক, মুক্তচিন্তক, লেখক ও সাহিত্যিকদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।

¶ সকল ইশকুল, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র হাটহাজারী স্টাইলের কওমি মাদ্রাসা চালু রাখতে হবে।

¶ নারী শিক্ষা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। পতিসেবা ও বাচ্চা উৎপাদন ছাড়া নারীদের আর কাজ নাই।

¶ যেহেতু আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন বা পুলিশের নারী সদস্যরা বোরখা পরতে পারে না, তাদেরকে চাকুরিচ্যুত করতে হবে।
¶ যেহেতু নারীরা মাহরাম ছাড়া বাইরে যেতে পারে না, তাই কোনো নারীকে চাকরি করতে দেয়া হবে না।

¶ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি নারী শ্রমিক ছাড়া চলবে না। যেহেতু তাদের ভাষায় গার্মেন্টস মানেই জেনা বা ব্যভিচারের কারখানা তাই সমস্ত পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করতে হবে।

¶ ধর্মীয়ভাবে গানবাজনা, নাটক ও চলচ্চিত্র যেহেতু হারাম অবিলম্বে এসব বন্ধ করে দিতে হবে। শুধুমাত্র ধর্মীয় জলসা ও মাহফিল চলবে।

¶ জাতীয় সঙ্গীত যেহেতু নিখাদ রবীন্দ্রসঙ্গীত, এটা দেশের নামের সাথে মিশে থাকতে পারবে না। অতএব এটা বাতিল করতেই হবে।

¶ এইদেশে পহেলা বৈশাখ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শোক দিবস ও বিজয় দিবস পালন করা যাবে না। তাদের ভাষায় ইসলামী কালচার এইসব বেদাত পারমিট করে না।

এইসব দাবি নিয়ে সবাই এখন বাংলাদেশে আফগানটাইপ খেলাফতের স্বপ্নে বিভোর। তাহলে এইদেশে চলবেটা কি? শুধুমাত্র সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার দালালিটা ঠিকঠাক চলবে। কিভাবে? মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট, গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, এন্ড্রয়েড, অ্যাপেল কিছুতেই বাদ দেয়া যাবে না। এমন কি আমাদের ধর্মের পবিত্রপুরুষ মহানবী (সা.) কার্টুনও যদি এসব মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করে তারপরও গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব বাদ দেয়া যাবে না। কারণ মোল্লাতন্ত্রের প্রমোশনাল হিসেবে ইহুদি-নাসারাদের এসব মিডিয়া ইউজ করবার চেয়ে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল আর কিছুতেই নাই।

আর আমরা বলব, এরচে’ বড় হিপোক্রিসিও আর কোথাও নাই।

ফুটনোট:
সরকারি আশ্রয় প্রশ্রয়ে মোল্লাতন্ত্রের প্রতিভূ মামুনুল হকরা পৃথিবীর তাবৎ শুভবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশটারে যে অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে আর ফেরার পথ থাকবে না। তারপর আর আসলে যাওয়ার জায়গাও থাকবে না। আমার দুইকন্যাকে বলবো তোরা এইদেশ থেকে ভেগে যাস মা। মিসোজিনিস্ট ও দেশজ কালচারবিরোধী এসব হিংসুক রাক্ষসদের ভিড়ে তোরা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবি না। কোনো আদর্শবান ও উদারনৈতিক মানুষই আর এই সোনার দেশে টিকতে পারবে না। স্রোতে গা ভাসানো সরকার এসব দেখেও না দেখার ভাণ করে থাকবে। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরেই আমরা দেশটারে কোন অতল অন্ধকার নরকে নিয়ে এলাম প্রিয় বঙ্গবন্ধু?

লেখক: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 152
  •  
  •  
  •  
  •  
    152
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.