কন্যাসন্তানকে রাজকন্যা বানানোর আগে স্ত্রীকে রানী বানান!

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে একটা কথা আজকাল বেশ প্রচলিত, ‘সব স্ত্রী তার স্বামীর কাছে রানী না-ও হতে পারে, কিন্তু সব মেয়ে তার বাবার কাছে ঠিকই রাজকন্যা।’

অনেককেই দেখি, আহ্লাদে গদগদ হয়ে এই জাতীয় বিভিন্ন উক্তি ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে থাকেন। কারণ আপাতদৃষ্টিতে এই জাতীয় উক্তি তো খুবই ইতিবাচক। এগুলোতে কন্যাসন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা ঠিক কতটা, তা ফুটে উঠছে। তাই নারীরা যেমন তাদের বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ জাতীয় উক্তি পছন্দ করেন, তেমনই পুরুষরাও তাদের আগত কিংবা অনাগত কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ এই জাতীয় উক্তি পছন্দ করেন।

কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে, এই জাতীয় উক্তি কেবল অন্তঃসারশূন্যই নয়, প্রচণ্ড রকমের সমস্যাজনকও। কী সহজেই না একটা বিষয়কে এই ধরনের কথার মাধ্যমে নরমালাইজ করে ফেলা হচ্ছে যে, পুরুষরা স্বামী হিসেবে স্ত্রীর প্রতি সদয় না-ও হতে পারেন, কিন্তু বাবা হিসেবে কন্যাসন্তানের প্রতি তাদের মায়া-মমতার কোনো কমতি থাকবে না। আর যেহেতু বাবা হিসেবে তারা সবাই অসাধারণ, সেজন্যই তাদেরকে যত ইচ্ছা গ্লোরিফাই করা যাবে। স্বামী হিসেবে তাদের অপরাধ কিংবা ব্যর্থতা মাফ পেয়ে যাবে!

কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, এই লেখার মাধ্যমে তিলকে তাল করার চেষ্টা করছি। একদমই না। ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ধরনের কথাবার্তা খুব সহজেই সম্মতি উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও বড় রকমের প্রভাব ফেলে। একজন পুরুষ যখন দেখবেন এই ধরনের পোস্টে হাজার হাজার লাভ রিয়েক্ট পড়ছে আর শতকরা নব্বই জনই এই কথায় সায় দিচ্ছে, তখন কিন্তু তার মনে হতেই পারে, ভালো বাবা হওয়াটাই বোধহয় যথেষ্ট, স্বামী হিসেবে ভালো হতে না পারায় তেমন একটা কিছু যায় আসে না!

তবে পুরুষদের উপর এই ধরনের কথা যতটা না প্রভাব ফেলে, তারচেয়ে ঢের বেশি প্রভাব ফেলে বোধহয় নারীদের উপর। ছোটবেলা থেকেই তারা এক ধরনের ইলিউশন বা বিভ্রমের মধ্যে বড় হয়। তারা ভাবে, আসলেই তারা কী সৌভাগ্যবতী, এক একজন পাপা’স প্রিন্সেস!

কিন্তু সত্যিকারের পাপা’স প্রিন্সেস হওয়া কি এতই সহজ? একটা কন্যাশিশুকে তার বাবা অনেক ভালোবাসলেই, তার সব আবদার-অনুরোধ রাখলেই কি সে বাবার রাজকন্যা হয়ে যায়? কখনোই না। ওই বাবা যদি স্বামী হিসেবে তার স্ত্রীর প্রতিও একই ধরনের সদয় না হন, স্ত্রীকে তার প্রাপ্য সম্মান না দেন, তাহলে কখনোই তিনি তার কন্যাসন্তানের সামনে ভালো কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না। মেয়েকে আদর-ভালোবাসা দিয়ে তিনি স্রেফ এই সত্যটাকে আড়াল করছেন যে, আদতে মানুষ হিসেবে তিনি যথেষ্ট ভালো নন। রাজার সমতুল্য মহান তো ননই!

যখন বাবার যাবতীয় ভালোবাসায় সিক্ত একটা কন্যাশিশু দেখতে পায় তার বাবা তার মায়ের সাথে প্রচণ্ড রকমের বাজে ব্যবহার করছেন, মাকে উঠতে-বসতে গালিগালাজ করছেন, এমনকি মায়ের গায়ে হাতও তুলছেন, তখন ওই কন্যাশিশু বিষয়টাকে কীভাবে গ্রহণ করে? আদর্শ বাবাকেই যখন সে এমন সব কাজ করতে দেখে, তখন কি সে ধরে নেয় না যে পুরুষরা এমনই? তারচেয়েও বড় ব্যাপার, নারীদের নিয়তি এমনই? তার কি মনে হয় না যে, কন্যাসন্তান হিসেবে বাবার কাছে সে যতই আদর-সোহাগ-ভালোবাসায় প্রতিপালিত হোক না কেন, বড় হয়ে স্বামীসহ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল পুরুষের কাছে তাকে এভাবেই অপমানিত হতে হবে, বৈষম্যের শিকার হতে হবে? এবং এই অপমানিত হওয়া, বৈষম্যের শিকার হওয়া খুব বড় কোনো ইস্যু নয়, কেননা তার আদর্শ বাবাও তো এগুলো করতেন!

সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে বসানো বাবাই হয়ে থাকেন কন্যাসন্তানের জীবনের প্রথম পুরুষ, আদর্শ পুরুষ। সেই প্রথম ও আদর্শ পুরুষই যখন সন্তানের সামনে স্ত্রীর প্রতি দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের চরিত্রের প্রকৃত স্বরূপটা তুলে ধরেন এবং নারীদের অবস্থান পুরুষদের চেয়ে কতটা নিচে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেন, তখন কি ওই কন্যাসন্তানের আত্মবিশ্বাস তলিয়ে যেতে শুরু করে না? বড় হতে হতে চোখের সামনে মায়ের পরিণতি দেখে তার কি মনে হয় না যে, একদিন তাকেও এই সবকিছুর সম্মুখীন হতে হবে, কেননা নারী হিসেবে তার অবস্থান সবসময় পুরুষের পায়ের নিচে?

এভাবে আদর্শ বাবাদের মাধ্যমেই কত শত-সহস্র কন্যাসন্তানের আত্মবিশ্বাস যে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, তারা মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মনে করে আত্মমর্যাদা খুইয়ে বসছে, সে হিসাব কি আমরা কেউ রাখি? নাকি আমরা শুধু ‘পুরুষরা স্বামী হিসেবে ভালো না হলেও বাবা হিসেবে অবশ্যই ভালো’ জাতীয় ছেলেভুলানো কথায় ভুলে থাকছি?

আসুন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই ধরনের ছেলেভুলানো কথায় না ভুলে প্রকৃত সত্যটাকে আমরা মেনে নিই। সেই সত্যটা হলো এই যে, একজন কন্যাসন্তানের বাবা তখনই সত্যিকারের ভালো বাবা হবেন, যখন তিনি শুধু তার কন্যাসন্তানকেই সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে দেবেন না, বরং নিজের স্ত্রীকেও তার প্রাপ্য শ্রদ্ধা-মর্যাদা দিতে কখনো কার্পণ্য করবেন না।

আর সবশেষে আবারো বলছি, একজন পুরুষের কেবল তার কন্যাসন্তানকে রাজকন্যার আসনে বসানোই যথেষ্ট নয়, স্ত্রীকে রানীর আসনে বসানোও তার অবশ্যকর্তব্য। দ্বিতীয় কাজটা সঠিকভাবে করতে পারার উপরই, প্রথম কাজটার যথাযথতা নির্ভরশীল।

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.