বিবাহ চুক্তি, উত্তরাধিকার আইন এবং বৈবাহিক ধর্ষণ

ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রা:

সমস্যা হলো, বিবাহিত জীবনে যৌন সম্পর্কের বেলায় নতুন করে সম্মতির প্রয়োজন আছে কিনা?
বিয়ে বিশেষ করে মুসলিমদের বিয়ে একটা চুক্তি; যার একসাইডের কনসিডারেশন হলো দেনমোহর এবং অপর সাইডের কনসিডারেশন হলো আনুগত্য, সন্তান উৎপাদন ও সেবা। এই চুক্তিতে কনসেন্ট দিয়েই মুসলিম নর-নারীর বিয়ে হয়।

আমাদের সমস্যা হলো, আমরা খোদ বিয়ের চুক্তি নিয়ে কোনো কথা না বলেই ম্যারিটাল রেপকে এড্রেস করতে চাচ্ছি। বেশিরভাগ মুসলিম আবার এটাও জানে না যে বিয়ে একটা প্লেইন এন্ড সিম্পল চুক্তি, ফলে তারা ধর্মীয় আবেগ দিয়েও তাড়িত হয়। যেন বিয়ে জিনিসটাই প্রশ্নাতীত! উত্তরাধিকার ও ব্যক্তি মালিকানা আরও প্রশ্নাতীত!
অবশ্য বিয়ে, উত্তরাধিকার ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করা রিস্কি বটে! কেউ কেউ এখানে উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিকও মনে করতে পারে।
কিন্তু বিয়ের কনসেপ্ট চেঞ্জ না করেই, উত্তরাধিকারের কনসেপ্ট চেঞ্জ না করেই যদি ম্যারিটাল রেপকে এড্রেস করাও হয়, অনেক বাস্তব কারণেই তার প্রয়োগ হবে না এবং হলেও অপপ্রয়োগ হবে।
বাস্তবতা হলো, বিয়ে আইনত একটা চিরস্থায়ী সম্মতি এনে দিচ্ছে যৌনতার বেলায় (যতক্ষণ বিয়ে টিকে আছে)। তো, প্রথমত, স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের এমন চরিত্রকে বহাল রেখেই ম্যারিটাল রেপ কার্যকর উপায়ে ডিফাইন করা সম্ভব নয়।

সম্মতি উৎপাদন করতে গেলে প্রথমেই আগে নারীকে আলাদা স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। যার শরীর, তার সিদ্ধান্ত নীতিকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
কিন্তু এই অঞ্চলে বিয়ের যে ধারণা, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র অধিকার কেবল পুরুষের। আর তাই উত্তরাধিকারের নীতিও পুরুষতান্ত্রিক। আর এই পুরো বিষয়টিকে আবার নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তিগত মালিকানা। বিয়ের চুক্তিটা তাই চূড়ান্ত বিচারে আসলে একপাক্ষিক। এখানে নারী তালাক পেতে পারে, দিতে পারে না। নারী তালাক পেতে চাইলে সে পুরুষকে অনুরোধ করতে পারে বড়জোড়। একে বলে খুলা তালাক। যেখানে তালাকের মতো একটা ফান্ডামেন্টাল অধিকারই পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত নয়, সেখানে, যৌনতায় সম্মতি তো দূর অস্ত।

অথচ একটা ভালো চুক্তিতে যেকোন পক্ষের চুক্তি বাতিলের সমান সমান অধিকার থাকা চাই। বিয়ের বেলায় তেমন নয়। বিয়ের চুক্তির একটা বৃহত্তর মিশন আছে – তা হল, সভ্যতা টিকিয়ে রাখা। কেমন সভ্যতা? উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যক্তিমালিকানার সভ্যতা। এই সভ্যতার স্বার্থে এডমিনিস্ট্রেটিভ সমস্ত সিদ্ধান্ত পুরুষ নিবে। কারণ, সভ্যতার স্বার্থে আমাদের জানতে হবে এবং নিশ্চিত হতে হবে কে কার সন্তান। সেটি জানা সম্ভব শুধুমাত্র নারীজাতিকে ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে। তাই, নারী শুধু একবারই সিদ্ধান্ত নিবে – সেটা হলো বিয়ে কবুলের সিদ্ধান্ত। এটা অনেকটা জমিদারী প্রথার মতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত , কিংবা ভোট ও নাগরিকের মতো – পাঁচ বছর পরপর কনসেন্ট দিবেন। তবে, বিয়েতে একবারই দিবেন, জীবনের তরে। আই হোপ ইউ ক্যান রিলেট। এরপর যৌনতার সম্পর্ক নির্ধারিত হবে ধর্মীয় বিধিনিষেধ (যেমন পিরিয়ডদের সময় যৌনসঙ্গম নিষিদ্ধ) ও স্বামীর বিবেচনাবোধের উপর (যে স্বামী ভালো, তিনি স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণ করেন। আর স্বামী খারাপ হলে কপালও খারাপ)।

মজার কথা হলো, বিয়ের এই কনসেপ্টের ব্যাপারে আমরা কিন্তু একমত। যেমন ভোটের ব্যাপারে নাগরিকগণ একমত এবং তারা বিশ্বাস করে রাষ্ট্র সত্য, সরকারব্যবস্থা সত্য, গণতন্ত্র সত্য, টাকা নামক একটা জিনিস আছে, ব্যক্তিমালিকানা সত্য; তেমনি বিশ্বাস করে বিয়েও আছে। তাই, বিয়ের কনসেপ্টকেও প্রশ্ন করার জন্যও আমরা প্রস্তুত নই।
শুধু তাই নয়, বিয়ের যেহেতু সভ্যতা নির্মাণের মিশন আছে, তাই এটি একইসাথে সামাজিক সম্পর্কগুলোকেও নির্ধারণ করে। সেই সম্পর্কগুলোও বিয়ের সম্পর্কের বিষয়ে প্রভাব রাখে। এই সম্পর্কগুলো সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় বটে, কিন্তু স্টিগমাও উৎপাদন করে। ফলে, বিয়ের মধ্যে শুধুমাত্র সাধারণ চুক্তির বিষয়টিই থাকে না। যদি এটা শুধুমাত্র সাধারণ চুক্তিই হতো, মানুষ ভেঙে ফেলতে দ্বিধা করতো না। কিন্তু তা হয় না। বিয়ের কনসেপ্ট যে সমাজের জন্ম দেয় সেই সমাজের মধ্যেই মানুষ স্টিগমাইজড হয়ে যায়, সামাজিকতার ভয় করে। ফলে গোপন করে, সহ্য করে, ত্যাগ স্বীকার করে। এসব কারণেও ম্যারিটাল রেপ প্রকাশ্যেও আসে না।

ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রা

আবার সনাতন ধর্মে এবং খ্রিস্ট ধর্মে বিয়ে কোনো সাধারণ চুক্তি নয়; ধর্মীয় পবিত্র বন্ধন। এই বন্ধন অবিচ্ছেদ্য, অর্থাৎ, বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান নাই (বলতে পারেন, ভারতে তো ডিভোর্স আছে, খ্রিস্টানদের ডিভোর্স হয় সব দেশেই, এমনকি মুসলিম মেয়েরাও তালাক দেয়, কিন্তু সেসব হয় রাষ্ট্রীয় প্যারালাল পারসোনাল আইনে, ধর্মীয় আইনে নয়। )

সনাতন ধর্মে, খ্রিস্ট ধর্মে ম্যারিটাল রেপকে প্রশ্ন করা একেবারেই অসম্ভব। তবে, এই শাপ বর হয়ে উঠতে পারে, যেটা ইউরোপের বেলায় হয়েছে, অন্যান্য কিছু দেশেও হয়েছে। খ্রিস্টধর্মকে বাইপাস করে রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকারনীতি রয়েছে অনেক দেশে, এরা সফলভাবে উত্তরাধিকার, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণাকে রিডিফাইন করতে পেরেছে আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তাল রেখে। ফলে ডিভোর্সসহ ম্যারিটাল রেপ ও আরও লিবারাল কনসেপ্টগুলোকেও এড্রেস করার রাস্তা তারা তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু, সনাতন ধর্ম এখনো এর উর্ধ্বে উঠতে পারেনি সঙ্গত কারণেই। উঠতে পারেনি ইসলাম ধর্মও।

মজার বিষয় হলো, ভারতীয় উপমহাদেশ যদি কেবল ধর্মীয় আইন দিয়েই অপরাধকে নির্ধারণ করতো তাহলেও হয়তো এতোদিনে একটা শাপে বর হয়ে আসতে পারতো। অথচ, কলোনিয়াল আইনগুলো এদেরকে সেই সুযোগটাও নিতে দেয়নি, এখনো দিচ্ছে না। কলোনিগুলোর ফৌজদারী বিচার একরকম, আর দেওয়ানি বিচার আরেকরকম! ফলে, তারা দেওয়ানি মোকাবেলায় ঠিক আধুনিক, লিবারাল রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারছে না, ধর্মীয় ঘেরাটোপে আটকে আছে। অথচ, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ম্যারিটাল রেপ পর্যন্ত ভাবতে পারছে, লিবারাল রাষ্ট্রের পলিসি এপ্লাই করতে চাচ্ছে।

এসব রাষ্ট্র এক্ষেত্রে নতুন করে অপরাধকে আমলে নিতে চাইবে না। এইরকম রাষ্ট্রের মানুষেরা বলবে, এইসব ‘মাইনর প্রবলেম’, এসবের সংখ্যা খুবই কম। ফলে এদের প্রেসক্রিপশন আসবে নয়া সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে। এটা ম্যানুফ্যাকচারিং অফ কনসেন্ট। আধুনিক রাষ্ট্রের অপরাধের ডেফিনিশনের এসেন্সটা হল, কোনো কাজ তখনই অপরাধ যখন সেটার উৎপাদনশীল ম্যানেজমেন্টের মেকানিজম তার জানা থাকে না।

কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে যখন রাষ্ট্র উৎপাদনশীল খাতের মেকানিজমে ফেলতে পারে তখন তা অপরাধের খাতা থেকেও বাদ যায় অথবা, ইমপ্লিমেন্টেশনের খাতা থেকেও বাদ যায় বিভিন্ন কারণে। যেমন ধরেন, খুন বিষয়টা কিন্তু এমনিতে অপরাধ। কিন্তু উৎপাদনের স্বার্থে খুন অপরাধ হইয়াও ঠিক অপরাধ নয়, যেমন: প্রবাস থেকে খুন হয়ে ফেরত শ্রমিকের লাশ, নারীর লাশ। মানুষ খুন হয়ে ফেরত এলেও ওই মানবসম্পদের একটা অর্থকরি মূল্য আছে। এই অর্থকরি সম্পর্কের ভিত্তিতেই আমরা খুন হয়ে ফেরত আসা দেশটির সঙ্গে ডিপ্লোমেসির নিয়ম নির্ধারণ করবো, আমাদের হাতে তা ভিন্ন উপায় থাকবে না।

তাই লক্ষ্য করলে দেখা যায় আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং ইউরোপের অনেক দেশে ম্যারিটাল রেপের স্বীকৃতি আছে। ইউরোপের রয়েছে উত্তরাধিকারের ধর্মীয় আইনের বাইরে আইন। এখানে বিয়ের বাইরেও নারীজাতির তথা মানবজাতির ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত হয়েছে। সুতরাং এখানে শুধুমাত্র বিয়েই সভ্যতা বিকাশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। আর আফ্রিকা কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার বেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ রয়েছে, যাদের এইড না হলে তাদের অর্থনীতি চলা মুশকিল। সুতরাং তারা নামকাওয়াস্তে ম্যারিটাল রেপকে স্বীকৃতি দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে। কিন্তু এদের আইনের এক্সিকিউশনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ইমপ্লিমেন্টেশন হতাশাজনক। এদের মধ্যে ইউরোপের বিষয়টি অন্যরকম হলেও আফ্রিকা কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার উদাহরণ বেশকিছু কারণে সিগনিফিকেন্ট নয়।

আবার ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব দর্শন ও প্রথা রয়েছে। সেসবও স্টিগমা উৎপাদন করে। কেবলমাত্র ধর্মীয় রীতিই একমাত্র ভূমিকা পালন করে না অবশ্যই।
তবে একথাও সত্য যে, ইউরোপ কিংবা আফ্রিকা অথবা ভারতীয় উপমহাদেশই হোক না কেন, কেউই বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটির অবদান অস্বীকার করতে পারেনি পুরোপুরি, এখনও পুরো পৃথিবীতে যে ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক সভ্যতা চলছে সেটি বিয়েকে ফেলে দিতে পারে না, তার কোনো কারণও নাই অবশ্য।

অপরদিকে সম্প্রতি প্রথম আলোর একটা রিপোর্টে জানা গেল, আদিবাসী পুরাতন ধাঁচের সোশালিস্ট সমাজে ধর্ষণের কোনো প্রতিশব্দই নাই। পুরাতন ধরনের যৌথমালিকানার এসেন্সওয়ালা সমাজগুলোতেও অপরাধকে যে চোখে দেখা হচ্ছে, কলোনিয়াল রাষ্ট্রগুলো সেই স্পিরিটটুকুও ফিল করতে অক্ষম।

শেয়ার করুন:
  • 333
  •  
  •  
  •  
  •  
    333
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.