চাইল্ড পর্নোগ্রাফি এবং ইন্টারনেট বনাম কন্যাশিশুর নিরাপত্তা

শাহরিয়া দিনা:

পৃথিবীর বয়স বেড়েছে, মানুষ সভ্য হয়েছে, তবুও মানুষে মানুষে বিভেদ এখনও বহমান। এখনও ভাগ হই আমরা ধর্মে,বর্ণে,জাতিতে সর্বোপরি পুরুষ কিংবা নারীতে। অথচ পৃথিবী যেমন একটা, তেমনি আমরাও একটাই মানব জাতি। এই সময়ে এসেও বিশ্বের প্রায় সব জায়গাতেই কন্যা শিশু’র বেড়ে উঠার প্রতিটি ক্ষেত্রেই কম-বেশি বৈষম্যের শিকার।

শিশু ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, শিশু পাচার, বাল্যবিবাহ নিয়ে আলোচনা, সচেতনতা, আইন সবকিছুই হচ্ছে, তবুও নিশ্চিহ্ন হচ্ছে না বা কমছে না এসব অপরাধ। এই করোনাকালেই আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বাল্যবিবাহ। ধর্ষণের শিকার হয়েছে বহু শিশু। শিশু নিরাপদ না পরিবারে, নিরাপদ না খেলার মাঠে, নিরাপদ না তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ যেন সভ্যতার শিখরে থাকা পৃথিবীর এক চূড়ান্ত অসভ্যতার নিদর্শন। পৃথিবীর পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর আগেই যে শিশু দেখে এর কদর্য রুপ, তার মনোজগতে পরে এর ভয়াবহ প্রভাব। ভয় আর আতংকে ব্যাহত হয় তার স্বাভাবিক বেড়ে উঠা।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে শরণার্থীদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে শিশু পাচার। পাচার হয়ে যাওয়া ছেলে এবং মেয়ে শিশুদের বানানো হচ্ছে যৌনদাস-দাসী। বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে। তাদের দিয়ে বানানো হয় চাইল্ড পর্নোগ্রাফি কিংবা ভিডিও ছবি। প্রযুক্তির কারণে পর্নোগ্রাফি এখন হাতের মুঠোয়। চাইল্ড পর্নোগ্রাফির চাহিদা বিবেচনায় তুমুল লাভজনক ব্যবসা। সারা দুনিয়ায় সাধারণত ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে চাইল্ড পর্ন ট্রেড হয়ে থাকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সময়ে মানুষের সাথে যোগাযোগের অনেক অনেক মাধ্যম। এইগুলোকে ব্যবহার করে চক্রগুলো। যেমন তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় এ্যাপ ইনস্টাগ্রামের কথাই বলা যাক। ইনস্টাগ্রামে চাইল্ড পর্ন গ্রুপগুলো ‘শাটআউট’ নামে পরিচিত। এসব গ্রুপ থেকে কিশোরীদের কীভাবে মোটিভেটেড করে নগ্ন ছবি সংগ্রহ করা যায়, সেসব কৌশল শেখা এবং প্রয়োগ করে কিশোরীদের নগ্ন ছবি সংগ্রহ করে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি গ্রুপগুলোতে আপলোড করা হয়। এমনই এক ঘটনা জানা গেল সাম্প্রতিক কালে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে কয়েক বছর আগে ইনস্টাগ্রামে পরিচয় হয়েছিল ঢাকার এক তরুণের। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। কৌশলে ঢাকার এই তরুণ মার্কিন ওই কিশোরীর নগ্ন ছবি দিতে বাধ্য করতো। প্রথমদিকে নিজের কিছু নগ্ন ছবি দেয় সে। এক পর্যায়ে বুঝতে পারে সে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি চক্রের পাল্লায় পড়েছে। পরে ওই কিশোরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে বিষয়টি জানায় ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের কাছে। সাইবার ক্রাইম বিভাগ দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ভয়ঙ্কর এক চাইল্ড পর্নোগ্রাফি চক্রের সন্ধান পায়। এই অক্টোবরে ঔ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় তারা দেশে-বিদেশে বসবাসকারী স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের টার্গেট করে তাদের ফুসলিয়ে ছবি এবং ভিডিও সংগ্রহ করে বিক্রি করতো।

এই সময়ে বাচ্চাদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দিতে বাধ্য সবাই। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা সবই হচ্ছে অনলাইনে। আপনি যখন জানালা খুলে রাখবেন তখন নির্মল বাতাসের সাথে কিছু ধুলোবালিও আসবে। ঠিক প্রযুক্তির উপকারিতার সাথে কিছু ভয়ংকর অপকারিতাও আছে। ইন্টারনেটে নেট মানে জালের মতোই ফাঁদ পাতাও আছে। সুতরাং প্রযুক্তি ব্যবহারে পজিটিভ দিকগুলোর সুবিধা নেবার সাথে সাথে নেগেটিভ দিক জেনে সচেতন থাকাও জরুরি।

এখনকার দিনে যেহেতু প্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে চলার উপায় নেই, তাই অভিভাবক তথা বড়দের দায়িত্ব হচ্ছে, ছোটদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেবার সাথে এর ব্যবহার পদ্ধতিরও গাইডলাইন তৈরি করে দেয়া। যতদূর সম্ভব খেয়াল রাখা। বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে কথা বলে এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জানানো। মানুষ তো ভুল করেই, সুতরাং সাবধানতার পরও কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ভুল হয়ে গেলে সেটার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া এবং যথাযথ মানসিক সাপোর্ট দেয়া। পৃথিবীটা সবার জন্য সমান বাসযোগ্য করে তোলাটা আমাদের সবারই দায়িত্ব।

শেয়ার করুন:
  • 135
  •  
  •  
  •  
  •  
    135
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.