ব্যবচ্ছেদ

ফাহমিদা খানম:

সভ্যতা, আধুনিকতা মানুষকে অনেককিছু দিলেও সহানুভূতি আর মানবিকতার জায়গাটা কেড়ে নিতে দেরি করছে না, নাকি আমরাই সবকিছু জটিল করে দেখতে পছন্দ করি কে জানে! আজকাল সবাই কি অবলীলায় অন্যকে বিচার করে বসে?

পাশের ফ্ল্যাটের দিদির হাত ধরে বসে আছি, উনি পাথরের মতো নিশ্চল আর বিহবল হয়ে আছেন, অথচ এখন উনার কান্নার দরকার, কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় উনি স্রেফ পাথর হয়ে গেছেন –বাসায় ফ্ল্যাটের লোকজন উনার সহকর্মী আর পুলিশের লোকজন দিয়ে ভরে গেছে, চারপাশের ফিসিফিসানি খুব টের পাচ্ছি – এটা কি আত্মহত্যা নাকি হত্যা, সেটা নিয়ে গুঞ্জন চলছে। পুলিশ লাশ পোস্টমোর্টেমের জন্যে নিয়ে যাবে বলে উনাকে লাশের সামনে নেওয়া হলো — হ্যাঁ গতকাল সন্ধ্যায়ও যে ছেলেটি আমার কাছে চিনি খুঁজতে এসেছিল, তারুণ্যে ভরপুর ছেলেটি সে এখন- লাশ।

“আমি কী নিয়ে বাঁচবো? এতোটি বছর আমি শুধু ওর জন্যেই যুদ্ধটা করছিলাম”
নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে সদ্য সন্তানহারা মায়ের কথাগুলো বুকের ভেতরে গিয়ে ধাক্কা মারলো – আমিও যে মা! লাশ নিয়ে যাবার সময় উনি ধরে রাখতে চাইলেন সন্তানের মুখে চুমু খাবার সময় মায়ের আহাজারিতে সবার বুকের ভেতরটা ছিঁড়েখুঁড়ে এলো।

কিছুক্ষণ পর বাসায় এসে আমি চা-বিস্কুট নিয়ে গেলাম। খুব ভোরে চিৎকার শুনে ছুটে গিয়েছিলাম
“একটু চা খান, আপনার ভালো লাগবে দিদি”
“সকালের চা পলকই বানাতো, দুই মগ বানিয়ে একটা আমাকে দিতো, আরেকটা ওর জন্যে– চিনি বেশি খেতো বলে কতো যে বকেছি!”

নিজেকে শক্ত রাখার প্রাণপণ চেস্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছি উনার পাশে থাকা মানুষেরা – মায়ের শোকের কাছে পরাজিত পৃথিবীর সবকিছু।
“আমি তো আমার সর্বোচ্চ দিয়েই ওর জন্যে সব করতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কীভাবে যে ও এই ভয়ংকর নেশার কবলে জড়িয়ে গেলো!”

লেখক: ফাহমিদা খানম

অল্প কয়জন সহকর্মী ছাড়া অন্যরা চলে গেলেও ফ্ল্যাটের মানুষজন আর আশেপাশের মানুষেরা তখনো ছিল।
“আমরা খবর পেয়েছি আপনি প্রায়ই রাত করে ফিরতেন, আর বাসা থেকে আপনাদের ঝগড়ার কথাও অনেকেই জানিয়েছেন”
পুলিশের একজনের এমন কথা শুনে উনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আচ্ছা সবকিছু জটিল করে দেখাই কি ওদের অভ্যাস নাকি আমাদের অজান্তেই পৃথিবী ক্রমশ জটিল হচ্ছে!
“ম্যাডাম কিছু মনে করবেন না, এটা আমাদের রুটিন ডিউটি, আর ঘরে যেহেতু আপনি আর ছেলে ছিলেন তাই সন্দেহ থেকেই জানতে চাওয়া”
আমি স্তব্ধ হয়ে জেরা করা পুলিশের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।
“আমরা খবর পেয়েছি মাঝেমধ্যে আপনার বাসায় পার্টি হতো এবং অনেকের সাথেই আপনার উঠাবসা ছিলো”
“আমার পেশার সাথে সেসবের কী সম্পর্ক? তাছাড়া পার্টিতে ছেলে নিজেও থাকতো, বাসায় বন্ধু-বান্ধব আসা কিংবা পার্টি করা কি আইনের চোখে নিষিদ্ধ কিছু?”
উনার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বাহবা দিলাম, তবে পুলিশের কথাগুলো শুনে বিব্রত লাগছিল বলে উঠে অন্যরুমে গেলাম – সেখানেও একই আলাপ চলছে
“আপনার বাসায় কি আসা-যাওয়া ছিলো? ফ্ল্যাটের কারও সাথে তো তেমন মিশতেন না, আচ্ছা উনার বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ির কেউ কি এসেছে জানেন কিছু?”
ভাগ্যিস এই ঘরের কথাগুলো ঐ ঘর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না তাহলে হয়তো মরমেই মরে যেতেন উনি।
“আমি তো দুই বাচ্চা নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত থাকি, আর দিদিও ব্যস্ত ছিলেন। উনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে উনি জানিয়েছিলেন উনি সিঙ্গেল মা, আর কিছু জানি না”
সবার আগ্রহে একরাশ পানি ঢেলে দিলাম বলে সবাইর মুখ গোমড়া মনে হলো।
পুলিশ প্রতিবেশি হিসাবে আমাকেও অনেককিছুই জিজ্ঞেস করলো। পাশাপাশি হলেও আমি দুই যমজ মেয়ে নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকি –সৌজন্যতার খাতিরে দেখা হলে কথা হতো। বাচ্চাদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ছাদে গেলে ছেলেটা নিজে থেকে এসেই বাচ্চাদেরকে আদর করতো। মাঝেমধ্যে কিছুর প্রয়োজন হলে বাসায় আসতো। কখনও অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়েনি, তবে দেখা হলেই দিদি সবসময় বলতেন—
“আপনি এদেরকে আলাদা করেন কীভাবে? আমার দুটোকে দেখলেই বারবি পুতুল মনে হয়”
উনার ব্যাগে সবসময়ই বাচ্চাদের জন্যে চকলেট থাকতো, ফ্ল্যাটের সব বাচ্চাকে উনি চকলেট দিতেন বলে আমার বাচ্চারা নাম দিয়েছিল চকলেট আন্টি, সেটা শুনে দিদির সে কী হাসি। ফ্ল্যাটের অন্যরা উনাকে আড়ালে দেমাগী বলতো। আসলে পেশাগত কারণে উনি ব্যস্ত থাকতেন বলেই অন্যদের সাথে সেভাবে মিশতে সময় পেতেন না, তবে আমার বাচ্চাদের জন্মদিনে সবসময়ই আসতেন। আমি না জেনে মানুষ বিচার করতে পারতাম না বলে অন্যদের কথা শুনলেও উত্তর দিতাম না কখনই।
“ওর লাশ কাটাছেড়া হোক আমি চাই না –আমি কী করে সহ্য করবো এটা?”
কিছু সময় আসলে কথা বলতে হয় না -উনার দুজন সহকর্মী উনার চিৎকারের সময়ে উনাকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন।
“আমি বুঝতেই পারিনি কবে কখন ছেলে আমার নেশায় জড়িয়ে গিয়েছিল, ব্যাগ থেকে টাকা খোয়া গেলে নিজের অসর্তকতা ভেবেছি, তারপর এতোদিনের বিশ্বাসী মাসিকে অবিশ্বাস করে ছাড়িয়েছি, তাও ছেলের মধ্যে সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পাইনি। বুঝতে পারার পর রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করেছি, সেখান থেকে ফিরে ও আবারও নেশায় জড়াতো, কিন্তু শেষবার আমাকে কথা দিয়েছিল আর নেশা করবে না। এ লেভেল শেষ হবার পরে ওর কানাডা চলে যাবার কথা ছিল, কিন্তু ও দুনিয়া থেকেই চলে গেলো।
সবসময় বলতো –
“মাম্মা, তুমি একা কীভাবে থাকবে?”
এখন আমাকে নিয়ে ভাবার মতো এই পৃথিবীতে আর কেউই নাই – এই পৃথিবীতে আমি সত্যিই খুব একা হয়ে গেলাম”

উপস্থিত সবার চোখেই পানি মায়ের আহাজারিতে – কাঁদুক সন্তানহারা মা, মন ভরে কান্না করুক, বুকের ভেতরের যতো কষ্ট পাথর হয়ে চেপে আছে আজ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ুক।
“ডাক্তারের কাছে নাকি জানিয়েছিল মা-বাবার বিচ্ছেদ আর একাকিত্ব ওর ভেতরে হতাশা চেপে ধরেছিল। আচ্ছা দায়িত্ব কি কেবল আমার একারই ছিলো? বিচ্ছেদ হবার পর প্রথম প্রথম ওর বাবা ফোনে ওর সাথে কথা বলতো, দ্বিতীয় বিয়ের পর আর খবর রাখেনি, অথচ সবাই আমার ভুল ধরে। ওকে ভালবেসে বিয়ে করার পর বাবার বাড়ির সবাই আমাকে ত্যাগ করেছিল”
“এখন এসব কথা থাক তুই এখন চোখ বন্ধ করে থাক কিছুক্ষণ”

উনার সহকর্মী এসে উনাকে চুপ করাতে চাইলেন–
“নাহ আজ আমি বলবোই, কেউ একজন ওর বাবাকে ফোন করে এখানে আসতে বলো। আজীবনের দায়িত্ব নেবার কথা বলে মাঝ রাস্তায় আমাকে একা ছেড়ে চলে গেছে কখনো ভাবেনি কী করে বাকিটা পথ আমি হাঁটবো! শুনেছি সে বিয়ে করে দায়িত্বশীল স্বামী আর বাবাও হয়েছে, অথচ এটাও কিন্তু তার সন্তান ছিলো! ওকে ভালবেসে আমি যে জীবনে সবই হারিয়েছিলাম এটা সে ভুলেই গিয়েছিল – ডাঙ্গায় মাটি না দেখে পা দিয়ে আমি একাই ডুবেছিলাম। সবটা হারিয়েছিলাম, কিন্তু তার কিছুই হয়নি”
দুপুরে টিভি ছেড়ে বাচ্চাদের খাওয়াতে গিয়ে খবরে উৎসুক মানুষের কথায় বুঝলাম সন্দেহের তীরটা মায়ের দিকেই – সেজন্যেই উনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যবচ্ছেদ চলছে –বড় অদ্ভুত আর আজিব এই জগত সংসার। কী সহজেই বিচার করার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে সবাই!

পোস্টমোর্টেম রিপোর্ট আসার আগেই প্রশ্ন এলো লাশ কি দাহ হবে, নাকি দাফন? যেহেতু দুজন দুই ধর্মের তাই মানুষের আগ্রহের কমতি নাই। কী নির্মম বাস্তবতা যে একদিন অন্যের খবর নিয়ে বেড়িয়েছেন সেই আজ মুখরোচক খবরের কেন্দ্রবিন্দু। উনাকে ডাক্তার কড়া ঘুমের মেডিসিন দিয়ে রেখেছেন, ঘুমের মধ্যেই বার বার বাবার কাছে নিজের কাজের জন্যে ক্ষমা চাইতেন, আর জেগে থাকলে প্রলাপ বকতেন। অনেক চেষ্টা করেও দুই বাড়ির কারও সাথেই যোগাযোগ করতে পারলেন না উনার সহকর্মিরা – যতবড় অন্যায়ই করুক না কেন অন্তত এই সময়ে উনার পাশে দাঁড়ালে শোকের তীব্রতা কমতো।

পোস্টমোর্টেমের রিপোর্টে মাত্রাতিরিক্ত ড্রাগের কথা এলেও বাস্তবে অনেকেই সেটাকে কল্পনার রঙে ডুবাতে দেরি করলেন না। সন্দেহের তীরটা মায়ের দিকে গেলেও কিছু পরোপকারী যখন-তখন বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলেন। উনি আমাকে নক দিতেন, অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম এই দলে আদর্শের বুলি কপচানো অনেকেই আছেন!
“দিদি এভাবে একা টিকতে পারবেন না, কারও সাথে সাবলেট অথবা নারীদের হোস্টেলে উঠে যেতে পারেন”
“পুলিশ এই মুহূর্তে ঠিকানা বদল করতে না করেছে বলে সেটা পারছি কই! এই বাসায় আমারও একদম মন টিকছে না এতো পরোপকারী বন্ধুদের জ্বালায়!”

ছেলের মৃত্যুর পর আমরা দুজন খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। ধর্ম সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, এই পৃথিবীতে একজন মানুষ সম্পূর্ণ একা, এটা ভাবলেই আমার ভয়ানক কষ্ট হতো। দুই মাসের মাথায় দিদি বাসা ছেড়ে দিলেন। মাঝে-মধ্যে ফোনে কথা হলেও এক সময় সেটা বন্ধই পেলাম – একদিন মার্কেটে গিয়ে উনার এক সহকর্মির সংগে দেখা হওয়ায় দিদির খবর জানতে চাইলাম—
“ও চাকুরি ছেড়ে দিয়েছে, কারও সাথেই যোগাযোগ রাখেনি – একদমই হারিয়ে গেছে মৌমিতা”
বুকের ভেতরে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিলো, বারবার মনে হচ্ছিল উনার পোস্টমোর্টেম নিয়ে যারা ব্যস্ত ছিলো তারা হয়তো নতুন কারও করছে বা করবে, কিন্তু সবকিছুর উপরে একজন মানুষের এভাবে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কেউই তাকে খুঁজবে না। তাকে বোঝার বা ভরসার হাতের সংখ্যা ছিলো না বলেই কি আত্মাভিমানে সবকিছু থেকে দূরে সরে গেলেন? প্রতিদিন কতো মানুষই যে কতভাবে হারিয়ে যায়, কে কয়দিন খবর রাখে! আধুনিক দুনিয়া বড় ব্যস্ত অন্যকে ব্যবচ্ছেদ করা নিয়ে ।

ফাহমিদা খানম
১৩/১১/২০২০

শেয়ার করুন:
  • 137
  •  
  •  
  •  
  •  
    137
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.