স্তন ক্যান্সার: ঝুঁকি, কীভাবে শুরু হয় এবং কেমন করে ছড়ায়

মনিকা বেগ: 

গবেষকরা স্তন ক্যান্সার হওয়া এবং না হওয়ার পেছনে একদিকে যেমন অনেকগুলো কারণকে চিহ্নিত করেছেন, অন্যদিকে আবার স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রেই তাদের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকির কারণগুলো শনাক্ত করতে এখনো সক্ষম হননি।

চলুন দেখা যাক গবেষকদের মতে কী কী কারণ স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং কী কী কারণ স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

ডা. মনিকা বেগ


ঝুঁকি বাড়ায়:

১)  স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস, এবং কিছু কিছু জেনেটিক মিউটেশন (যেমন BRCA1 এবং BRCA2)।

২)  অল্প বয়সে (১২ বছরের আগে) মাসিক শুরু হওয়া।

৩)  বেশি বয়সে মেনোপজ (menopause) হওয়া।

৪)  বেশি বয়সে (৩০ বছর বয়সের পরে) প্রথম বাচ্চা নেয়া।

৫) কোনোদিন বাচ্চা না নেয়া।

৬) মেনোপজ-পরবর্তী হরমোন চিকিৎসা নেয়া।

৭)  মদ/এলকোহল পান করা।

৮)  শারীরিকভাবে ইনএক্টিভ (inactive) থাকা।

৯)  অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা।

১০) অল্প বয়সে কোনো কারণে বুকে রেডিয়েশন চিকিৎসা নেয়া।

ঝুঁকি কমায়:

১) শিশুকে স্তন্যদান করা – যে মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান, তাদের মেনোপজ-পূর্ববর্তী এবং মেনোপজ-পরবর্তী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। এবং যে মায়েরা বাচ্চাকে ছয় মাসের চেয়ে বেশি সময় ধরে বুকের দুধ খাওয়ান, স্তন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে তারা অতিরিক্ত সুরক্ষা পান।

২) পুষ্টিকর খাবার খাওয়া – যেমন শাক-সবজি, ফল, বাদাম, অলিভ অয়েল, মাছ ইত্যাদি।

৩) ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা – ডাক্তারের সাথে আলাপ করে জেনে নেয়া যে আপনার ওজন কত হওয়া উচিত। এবং সেই অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা।

৪)  প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম বা কোনো শারীরিক একটিভিটি (activity) করা।

৫) প্রতি মাসে একবার করে নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা। এবং কোনো লক্ষণ/উপসর্গ দেখলে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যাওয়া।*

৬) ডাক্তারের সাথে আলাপ করে ঠিক করে নেয়া, কবে থেকে এবং কত দিন পর পর আপনাকে স্ক্রিনিং (screening tests), যেমন স্তনের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা এবং ম্যামোগ্রাফি করতে হবে।

* নিজে নিজে কীভাবে স্তন পরীক্ষা করবেন?

যাদের এখনও মাসিক হচ্ছে, তারা মাসিক শেষ হওয়ার ৭ দিন পরে নিজেকে পরীক্ষা করুন। যাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তারা নিজেদের সুবিধামতো একটি তারিখ ঠিক করে নিন নিজেকে পরীক্ষা করার জন্য।

ইউটিউবে নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করার পদ্ধতির উপরে বেশ কিছু ভিডিও আছে। আপনারা সেগুলো দেখে নিলে উপকৃত হবেন।

 

স্তনের গঠন:

স্তন ক্যানসারের প্রকার ভেদ বুঝতে হলে, স্তনের গঠন সম্বন্ধে আমাদের একটু ধারণা থাকা প্রয়োজন:

প্রতিটি স্তনে ১৫-২০ টি করে গ্রন্থিযুক্ত টিস্যুর (Glandular tissue) লোব (Lobe) আছে, যা সূর্যমুখী ফুলের পাঁপড়ির মতো সাজানো থাকে। লোবগুলো আবার ছোট ছোট লোবিউলে (Lobule) বিভক্ত। এই লোবিউল গুলোতেই স্তন্যদান করার জন্য দুধ তৈরি হয়।

তারপর সেই দুধ ছোট ছোট দুগ্ধ নালীর (Duct) মাধ্যমে স্তনের বোঁটার (Nipple) ঠিক নীচে অবস্থিত আধারে এসে জমা হয়।

স্তনে এবং তার আসে পাশে রয়েছে অনেক লিম্ফ নালী (Lymph vessels) এবং লিম্ফ নোড (Lymph node), যাদের কাজ হচ্ছে আমাদের শরীর থেকে বিভিন্ন রোগ জীবাণু, বর্জ্য এবং অন্যান্য অযাচিত উপকরণগুলোকে বের করে দিতে সহায়তা করা।

এছাড়াও স্তনে প্রচুর পরিমানে ফ্যাটি টিস্যু (Fatty tissue) এবং কানেক্টিভ/ফাইব্রাস টিস্যু (Connective or fibrous tissue) থাকে। ফ্যাটি টিস্যু স্তনের আকার নির্ধারণ করে, এবং কানেক্টিভ/ফাইব্রাস টিস্যু স্তনের সব টিস্যুকে এক সাথে ধরে রাখে।


স্তন ক্যান্সার কীভাবে শুরু হয় এবং কেমন করে ছড়ায়?

অনেকেই মনে করেন, স্তন ক্যান্সার কোনো রোগ জীবাণু বা জার্ম (Germ) দ্বারা সৃষ্ট। তাই প্রথমেই এই প্রচলিত ভুল ধারণাটি ভেঙে দিতে চাই।

মনে রাখবেন, স্তন ক্যান্সার কোনো রোগ জীবাণু বা জার্ম দ্বারা সৃষ্ট নয়। এবং অন্যান্য ক্যান্সারের মতো স্তন ক্যান্সারও কোনভাবেই ছোঁয়াচে নয়।

স্তনের কিছু কোষ (Cell) যখন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখনই স্তনে ক্যান্সারের জন্ম হয়। ঐ কোষগুলি স্বাস্থ্যকর কোষগুলির চেয়ে আরও দ্রুতগতিতে বিভাজিত এবং ক্রমাগত একত্রিত হয়ে একটি টিউমারে রূপ নেয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্তন ক্যান্সার শুরু হয় স্তনের দুগ্ধ নালী (Duct) গুলোতে। তবে স্তনের দুগ্ধ উৎপাদনকারী লোবিউল (Lobule) গুলোতে বা স্তনের অন্য কোষে বা টিস্যুতেও স্তন ক্যান্সার জন্ম নিতে পারে।

শুরুতেই স্তন ক্যান্সারের নির্ণয় এবং তার চিকিৎসা না হলে, ঐ স্তন ক্যান্সার কোষগুলি সরাসরি অথবা লিম্ফ নালী (Lymph vessels) অথবা রক্ত নালীর (Blood vessels) মাধ্যমে, আসে পাশের লিম্ফ নোড (Lymph nodes) গুলোতে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

 

স্তন ক্যান্সার যখন স্তন এবং তার আসে পাশের লিম্ফ নোডের গন্ডি পেড়িয়ে, শরীরের অন্যান্য অংশ, যেমন হাড়, ফুসফুস, লিভার, ব্রেইন ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই তাকে ‘মেটাস্টাটিক স্তন ক্যান্সার’ (Metastatic Breast Cancer) বলে।

(চলবে)

 

ডাক্তার মনিকা বেগ,
প্রধান এবং বৈশ্বিক সমন্বয়ক (অবসরপ্রাপ্ত),
এইচআইভি/এইডস সেকশন,
জাতিসংঘ সদর দপ্তর,
ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।

শেয়ার করুন:
  • 477
  •  
  •  
  •  
  •  
    477
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.