ধর্ষক নির্মাণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-৫

শামীম আরা নীপা:

সমাজে পুরুষতন্ত্রের ধারক নারী পুরুষ উভয়ই এবং পিতৃতন্ত্রের দ্বারা নির্যাতিত শুধু নারী না, পুরুষও। নারীবান্ধব পুরুষকে সহ্য করতে হয় অনেক অপমান ও বক্রোক্তি। যেমন: ‘বেইট্যা পোলা হইছে!’ ‘মাইয়া নাকি তুই?’ ‘বৌ-নেওটা’ ইত্যাদি। যেসব পুরুষের পুরুষালী মাসল নেই, যারা রুক্ষ না, কণ্ঠস্বর হরমোনাল কারণে চিকন, তাদেরকে বলা হয় ‘হাফ ল্যাডিস’ / ‘হিজড়া’। মেয়েরা পর্যন্ত তাদের কাছে ঘেঁষে না। ‘ছেলে বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে’,  স্ত্রীকে চাকরির ব্যাপারে কিছু বললে সরাসরি জানিয়ে দেয়া ‘তার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর’ – এসব বলে পুরুষতন্ত্র পুরুষকেই অধস্তন করে রাখে, বিবিধ চাপের ভেতর রেখে তার ভেতরের মানব সত্ত্বাটিকে আর বের হতে দিতে চায়না। ‘নারীর দায়িত্ব পুরুষের’- অনেক পুরুষ এই একপেশে দায়িত্ববোধকে নির্যাতন মনে করে, কারণ পুরো পরিবার একজনের ঘাড়ে, সেই ঘাড়টা হতে হয় শক্ত, কিন্তু পরিবারের নারী এবং পুরুষ দুজনের ঘাড়ে বোঝা ভাগাভাগি করে নিলে জীবনটা অনেক সহজ সাবলীল হয়।

শামীম আরা নীপা, এক্টিভিস্ট

এই পুরুষতন্ত্র পুরুষকে মহান করে নারীকে অধঃ ও নির্ভরশীল করেছে এবং পুরুষকে স্বাধীন ক্ষমতাশালী করার সাথে সাথে উপরোক্ত পুরুষকে কুক্ষিগত অপমানিত অধঃস্তন করে রেখেছে। পুরুষতন্ত্রের সম্মোহনী শক্তি এতোটাই যে পুরুষতন্ত্র কিংবা পিতৃতন্ত্রের ধারক বাহক পুরুষ নারী উভয়ই- এই তন্ত্রে মানুষ বলে কিছু নেই, আছে কেবল নারী ও পুরুষ লিঙ্গ বৈষম্য।

সমাজে পুরুষালী কিছু বৈশিষ্ট্য প্রচলিত আছে। যে বৈশিষ্ট্য পুরুষ ধারণ করে গর্ববোধ করে, ধারণ করতে না পারার ফলে হীনমন্যতায় ভোগে। অপরদিকে নারীর জন্যও কিছু বৈশিষ্ট্য অবধারিত। মূলত পুরুষের এই বৈশিষ্ট্যকে পুরুষালী এবং এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যকে মেয়েলী বলা হয়। আর তৃতীয় বক্তব্যের পুরুষটি স্পষ্টতই পুরুষতন্ত্রের ধারক হতে পারেননি বলে তাকে একধরণের মানসিক অত্যাচার ভোগ করতে হয় সবসময়। এই মানসিক অত্যাচার কোন নারী তৈরি করে দেয়নি, বরং পুরুষতন্ত্রই এর জনক। নারী হবে নরম, কোমল এবং পুরুষের ভেতর এসব বৈশিষ্ট থাকলে সে হবে কটাক্ষের শিকার। একজন নারী শক্ত, বলিষ্ঠ, রুক্ষ, ভারী কণ্ঠস্বরের হলে তাকেও কটাক্ষ শুনতে হয়। এসবই পুরুষতন্ত্রের হাজার বছরের বানানো রীতি।

ধর্ষণের পর পুরুষ চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা করানো, পুরুষ ইনস্পেক্টর দিয়ে তদন্ত বা ট্রাইব্যুনালে পুরুষ আইনজীবী দিয়ে মামলা সহায়তা– এগুলো মোটেও নারী সহায়ক নয়। এমনকি কোনো কোনো গণমাধ্যম পর্যন্ত ধর্ষককে অনুসরণ না করে মেয়েটিকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি বার বার ধর্ষণের শিকার হয় ঘরে–বাইরে–চিকিৎসালয়ে–আদালতে! দোষীদের কঠিন শাস্তি কার্যকর করা, উপযুক্ত তদন্ত-বিচার, পুলিশসহ বিচারিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের সংবেদনশীলতা, তদন্ত-বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ইত্যাদি যেমন জরুরী প্রয়োজন তেমন প্রয়োজন ব্যক্তির চেতনা নির্মাণ বা নারী-পুরুষ-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি সমান সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের শিক্ষা আমাদের আপমর জনসাধারণের ভেতর প্রোথিত করা। সম্পদ ও শিক্ষার বৈষম্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সমাজ যখন ভোগ আর লালসার সংস্কৃতির চর্চা করে, তখন ধর্ষণ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়াই অবশ্যম্ভাবী। এই মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার একমাত্র পথই এখন আমাদের সামনে খোলা।

প্রতিটি এলাকার সবচেয়ে মূল্যবোধহীন, সবচেয়ে বিবেকহীন, সবচেয়ে নিষ্ঠুর সন্ত্রাসীগুলো সরকারি দল করে এবং সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন এদেরকে দলে টেনে নেয়। তাদের ভোগের জন্যে দেশকে উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। এই মাফিয়া গুণ্ডা বাহিনীর আক্রমণের মুখে, তাদের মিডিয়া এবং কালচারাল ব্রিগেডের প্রপাগান্ডার মুখে জনগণের সম্মিলিত শক্তির প্রতিরোধ বিলীন হয়ে যায়। মানুষের জান মাল সম্মান- সব এই মাফিয়া-তন্ত্রের মুঠোয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক দশক আগেও ৯৯% ক্ষেত্রে ধর্ষণের উৎস ছিল সামাজিক। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বা দুর্বৃত্তদের হাতে অথবা বিচ্ছিন্নভাবে রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা বিত্তশালী ক্ষমতাসীনদের হাতে। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ধর্ষণ মূলত একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এবং ২০১৪ সালের পর এটা আরও তীব্র আকার নেয়। ধর্ষণকে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের শক্তিকে প্রতিহত করার, ভেঙ্গেচুড়ে দেয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। একটি জনপদের নাগরিক শক্তিকে ধ্বংস করতে হলে ধর্ষণ বিশেষ করে গণধর্ষণের চেয়ে কার্যকর আর কোন অস্ত্র নেই। এই অস্ত্রের ব্যবহার শুধু নারী নয়, পুরো সমাজের জন্যে হুঁশিয়ারি। ফলে এই রাজনৈতিক ধর্ষণকে বন্ধ করতে হলে প্রথমেই এই রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে।

(আগামীকাল পড়বেন এই পর্বের শেষ অংশটি)

বি:দ্র: এই লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে আমি প্রায় ৩৫ টার মতো নিউজ লিঙ্ক পড়েছি, কিছু পিডিএফ, কিছু বই আগেই পড়া ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে এই লেখাটা দাঁড়িয়েছে। এই লেখার ভেতর কোট না করেই আমি এমন অনেক কিছু অ্যাজ ইট ইজ যুক্ত করেছি, কারণ তার থেকে ভালো শব্দ সংযোজন আমি করতে পারিনি এবং রেফারেন্স ও ক্রেডিট দিতে পারছি না, কারণ যখন পড়েছি তখন কিছু নোট নিয়েছি। কিন্তু লেখার লিঙ্ক আর রাখিনি, লেখকের নামও মনে থাকার কথা না। তাই এই লেখা আমার একক লেখা না। আমার ইনপুটের সাথে এখানে অনেক মানুষের ইনপুটও আছে। সবার জন্য কোন স্বত্ব ছাড়াই এই লেখাটি উন্মুক্ত।

আগের পর্বগুলোর লিংক:

পর্ব-১ https://womenchapter.com/views/36339

পর্ব-২ https://womenchapter.com/views/36349

পর্ব-৩ https://womenchapter.com/views/36363

পর্ব-৪ https://womenchapter.com/views/36378

শেয়ার করুন:
  • 68
  •  
  •  
  •  
  •  
    68
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.