ধর্ষক নির্মাণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ – ৪

শামীম আরা নীপা:

অতীতের তুলনায় এখন আমাদের দেশে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে অনেক বেশি, আগে এসব দুঃসংবাদ ঘরের চারদেয়ালের নিচেই চাপা পড়ে যেতো। এই খবরগুলো প্রকাশের মাধ্যমেই ধর্ষককে প্রতিরোধের একটা রাস্তা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। এখন নারীরা ধর্ষণের কথা প্রকাশ করে ধর্ষকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এখন মানুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলে, রাজপথে দাঁড়ায় তা সংখ্যায় যত কমই হোক, তারপরও এসবও ধর্ষণ ও ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।

একইসাথে ঘটছে ছেলেশিশুদের ওপর ‘বলাৎকার’ এর ঘটনা। বলাৎকার শব্দের অর্থ বলপ্রয়োগ/ শক্তিপ্রয়োগ/ অত্যাচার/ জুলুম/ জবরদস্তিমূলক আচরণ/ অন্যায়/ অত্যাচার এবং অন্যদিকে বলপূর্বক সতীত্বনাশ (ধর্ষণ)। ধর্ষণের মূলনীতি বলাৎকার। বলাৎকার অর্থই ধর্ষণ। বলাৎকার শুধু নারীর উপরই ঘটে না, পুরুষের উপরও ঘটে। ধর্ষণ যেহেতু শক্তি প্রয়োগের বিষয়, তাই তার শিকার সমসময়ই দুর্বল মানুষ তথা নারী, শিশু (ছেলে ও মেয়ে), দরিদ্র, প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারী ও শিশু। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে কোন শিশুই ঘরে- বাইরে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসা-চার্চ-মন্দির কোথাও নিরাপদ না। ছেলে শিশুদের ধর্ষণকে বলা হচ্ছে বলাৎকার এবং সেই বিষয়ে আমাদের সমাজে ও মিডিয়ায় তেমন কোন আলোচনা ও সচেতনতা নেই এখন পর্যন্ত। ছেলেশিশু ধর্ষণের পর মামলা করতে গিয়েও মামলার ধারা ধর্ষণের না দিয়ে যৌন নিপীড়নের দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্টজনেরা, অথচ ছেলে শিশুর ধর্ষণও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতায়ই পড়ে।

নারীর ধর্ষণের সাথে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ জুড়ে দিয়েছে দুটি শব্দ- ইজ্জত ও সম্ভ্রম, যার কোনো সম্পর্কই নাই ধর্ষণের সাথে এবং ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির সাথে। নারীর সম্মান তার যোনীতে যে নয় তা এই সমাজ আজও বুঝে উঠতে পারেনি। নারী কিংবা শিশুর সাথে যে যৌনসন্ত্রাস করলো সে হলো নীচ, ইজ্জত – সম্ভ্রম গেলে তার যাবে, অথচ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এসবের দায় চাপায় নারীর উপর। নারীকে নির্মাণ করেছে এইভাবে সমাজ ও রাজনীতি। লজ্জা নারীর ভূষণ বলে নারীকে আরও শৃঙ্খলিত করার প্রয়াস এই সমাজের বহু পুরনো চর্চা, অথচ লজ্জা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই ভূষণ হওয়ার কথা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এসব ভুলভাল মিথ তৈরি করেছে নারীর উপর যথেচ্ছভাবে অন্যায় অত্যাচার করতে, এবং নারীকে অবদমিত অবহেলিত, উপেক্ষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত রাখতে।

শামীম আরা নীপা, এক্টিভিস্ট

পুরুষতন্ত্র ক্ষমতার তন্ত্র। আর ক্ষমতা নিজেকে প্রশ্ন করতে চায় না, নিজের কাছে জবাবদিহি করতে চায় না। প্রশ্ন করলে কারণ দর্শাতে হয় এবং ফলের দায়িত্ব নিতে হয়- পুরুষতন্ত্র এই দুইটি বিষম কাজ না করে বরং নিজ অন্যায়ের দায় ক্রমাগত নারীর উপর চাপিয়ে দিতে থাকে। পুরুষ দায় অন্যের ঘাড়ে না চাপাতে পারলে সেই কাজের দায়িত্ব নিতে হবে এবং সর্বোপরি নিজের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। যে জবাবদিহিতা পুরুষতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। এই রীতি পুরুষ বা পুরুষতন্ত্রের নয় বরং এটা সামগ্রিকভাবেই ক্ষমতার স্বভাব। আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নারীবান্ধব করতে পারিনি। আমাদের সমাজে একজন নারী একবার ধর্ষণের শিকার হলে তাকে প্রতিনিয়ত বৈরিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সহানুভূতি, সহমর্মিতার পরিবর্তে সবখানে অপমান, বক্রোক্তি, সন্দেহ, ভ্রূকুটির সম্মুখীন হতে হয়।

ধর্ষণ নিতান্তই পেশির জোর, পুরুষ ও পুরুষাঙ্গের জোর। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পরম পূজনীয় পুরুষাঙ্গের ন্যাড়া মাথায় মুকুট পরিয়ে বিজয় নিশান উড়ানোর আর এক নাম ধর্ষণ। ধর্ষণ একটি রাজনীতি, শরীর জবরদখলের রাজনীতি ও সন্ত্রাস। প্রত্যেকটা ধর্ষণের হিংস্রতায় এই ক্ষমতার রাজনীতি লুকিয়ে আছে। ধর্ষণ ক্ষমতার দাপট, একইসাথে ক্ষমতাবানের ঔদ্ধত্যের প্রকাশ। একজন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে, হাজার বাধা দেয়ার পরও, একা কিংবা কয়েকজন তার শরীরকে জবরদখল করে ধর্ষণ করা এবং সেই নারীর কিছু করতে না পারার অক্ষমতা তো শক্তি ও ক্ষমতার জয়, আধিপত্যের সুপ্রতিষ্ঠা। ক্ষমতা যেমন মানুষকে ভয় দেখায় সবকিছু লুটে নেয়ার, স্বেচ্ছাচার করার, মজা দেখানোর, প্রতিশোধ নেয়ার, অপমান করার, জোরপূর্বক ভোগ দখল করার পুরুষতন্ত্র নারীর সাথে ঠিক তাই করে যার সর্বোচ্চ ঘৃণ্য প্রকাশ এই ধর্ষণ।

যে ক্ষমতার জোরে বিরোধীদের কোণঠাসা করা যায়, ঠিক সেভাবেই একজন নারীর শরীর দখল করে তাকে সমাজের একেবারে কোণে ঠেলে ফেলা যায়। শরীরের জবরদখলের এই রাজনীতিকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হবে অতি অবশ্যই। নারীর উপর পুরুষের এই ক্ষমতার চর্চাকে শুধু যৌনলালসা বলে পুরুষতন্ত্রের এই যৌনসন্ত্রাসকে হাল্কা করে দেয়া যাবেনা কোনভাবেই। ধর্ষণ কেবল নারীর উপর নিরন্তর ঘটতে থাকা ‘লালসা’র বহিঃপ্রকাশ নয় বরং ধর্ষণ হলো ক্ষমতার রাজনীতি। এটা ক্ষমতার প্রত্যাঘাত- আমার শক্তি আছে, তোমাকে সম্ভোগ করব। ধর্ষণ মানেই ক্ষমতার উল্লাস।

পুরুষের আধিপত্য, হিংস্রতা, আগ্রাসন, ধর্ষকাম শুধু তার লিঙ্গভিত্তিক নয়, বরং আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থা নারী ও পুরুষের মগজে পৌরুষ ও তার আগ্রাসনকে সমুলে প্রোথিত ও লালন-পালন করেছে, যার নির্মম শিকার হচ্ছে নারী। ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে বিচার করতে হবে পুরুষের সামগ্রিক মূল্যবোধ ও লিঙ্গ রাজনীতিকে। এই ধর্ষকাম ও নারীবিদ্বেষ পরিবার ও সমাজ মিলে তৈরি করেছে ছেলেদের মনস্তত্ত্বে।

দুটো সন্তানের ভেতরে লিঙ্গ বৈষম্য তৈরি করে ছেলেকে বলা হয়, তুমি ছেলে, তুমি শক্তিশালী, কর্তৃত্বকারী, পবিত্র, নির্দোষ, কান্না তোমায় মানায় না। ছেলেকে দেয়া হয় বল, খেলনা পিস্তল, ক্রিকেট ব্যাট, গাড়ি ইত্যাদি, আর মেয়েকে দেয়া হয় পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল, স্নো পাউডার ইত্যাদি। ছেলে শিশুটি ছোটবেলা থেকেই লিঙ্গ বৈষম্য শিখে নিলো এবং বুঝে নিলো তার কোন ভয় বা লজ্জা নাই, তার আছে ঔদ্ধত্য, তার আছে শিশ্ন। সে দেখলো শিবলিঙ্গের পূজা হয়, মুসলমানির উৎসব করা হয়। এর পাশাপাশি ছেলেটি নিজ ঘরেই দেখে কন্যা শিশুটির ‘স্ত্রীলিঙ্গের’ ভার নিয়ে কীভাবে ভীত, লজ্জিত, অসহায়, সঙ্কুচিত ও অধস্তন হয়ে থাকতে হয়। পুত্র শিশুটি দেখে জানে যে, তার নিজের শরীরকে লুকাতে হয় না, কিন্তু কন্যা শিশুটির নিজের শরীর লুকাতে হয়, রজঃস্বলা হয়ে কন্যা শিশুকে কীভাবে অপবিত্র হতে হয়, কীভাবে লজ্জাবনত থাকতে হয়।

পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গপাঠ এভাবেই ছেলে শিশুকে ধীরে ধীরে পরাক্রমশালী পুরুষ করে তুলে, যার যৌনতা নির্ভর করে কেবল তার স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ লিঙ্গের ওপর, নারী সেখানে খেলনা মাত্র। মেয়েশিশুটিকে ঘর গোছানো শিখিয়ে ভবিষ্যত নারী তৈরি করা হয় আর ছেলেশিশুটি ঘর অগোছালো রাখলে মা গর্বিত চোখে ভবিষ্যত পুরুষের বেড়ে ওঠা দেখতে পান! একজন পুরুষ চাইলেই ঘরের কাজে সাহায্য করতে পারেন, কিন্তু তাকে শুনতে হবে, ‘বেটিস্বভাব’ ‘মাইয়া’ ‘বৌ-পাগল’ এমন বহু সম্বোধন।

(চলবে)

বি:দ্র: এই লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে আমি প্রায় ৩৫ টার মতো নিউজ লিঙ্ক পড়েছি, কিছু পিডিএফ, কিছু বই আগেই পড়া ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে এই লেখাটা দাঁড়িয়েছে। এই লেখার ভেতর কোট না করেই আমি এমন অনেক কিছু অ্যাজ ইট ইজ যুক্ত করেছি, কারণ তার থেকে ভালো শব্দ সংযোজন আমি করতে পারিনি এবং রেফারেন্স ও ক্রেডিট দিতে পারছি না, কারণ যখন পড়েছি তখন কিছু নোট নিয়েছি। কিন্তু লেখার লিঙ্ক আর রাখিনি, লেখকের নামও মনে থাকার কথা না। তাই এই লেখা আমার একক লেখা না। আমার ইনপুটের সাথে এখানে অনেক মানুষের ইনপুটও আছে। সবার জন্য কোন স্বত্ব ছাড়াই এই লেখাটি উন্মুক্ত।

আগের পর্বগুলোর লিংক:

পর্ব-১ https://womenchapter.com/views/36339

পর্ব-২ https://womenchapter.com/views/36349

পর্ব-৩ https://womenchapter.com/views/36363

শেয়ার করুন:
  • 406
  •  
  •  
  •  
  •  
    406
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.