কওমি মাদ্রাসায় শিশুধর্ষণ: চিন্তার বর্ণবাদ এবং বিবেকের দায়-১

মুফতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ:

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে মাদ্রাসায় ছাত্র ধর্ষণ নিয়ে নিউজ হয়নি এমন দিন বোধহয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। মনে হয় যেন করোনা ভাইরাস নয়, বরং ধর্ষণের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের দুর্গ কওমি মাদ্রাসায়। আগেও কি সেখানে ধর্ষণ হতো না? হতো। আগেও কি সেখানে শিশু নির্যাতন হতো না? হতো। কেন এখন তো খবর পাওয়া যাচ্ছে, আগে কেন খবর পাওয়া যেত না এ প্রশ্ন স্বভাবতঃই আপনার মনে জাগতে পারে। আসলে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার আগে আমরা একটু মাদ্রাসা নামক জগদ্বিচ্ছিন্ন অন্ধকূপের পরিবেশ কেমন সেটি বোঝার চেষ্টা করি চলুন। পরিবেশটা বোঝার পর কেন সেখানে এতো বেশি ধর্ষণ হয়, সেটি বোঝা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। প্রথমত শুরু করি যে শিশুটিকে কওমি মাদ্রাসায় দেয়া হয় সেই শিশুর পরিবার থেকে, এবং এরপর চলে যাবো আমি মাদ্রাসার ভেতরকার পরিবেশে; আর সবশেষে চলে যাবো মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে।
কওমি মাদ্রাসায় যে শিশুদের দেয়া হয় তাদেরকে মূলত তিনটি কারণে দেয়া হয়:

প্রথমত: কোন এক পরিবারে শুধু মেয়ে জন্মগ্রহণ করছে এবং প্রত্যেকবার মেয়ে হওয়ার পর পরিবারের বৌটির উপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসছে। অবশেষে সেই নারী বা বৌ নিয়ত করলেন, ‘আল্লাহ যদি এবার একটা ছেলে দেয়, তাহলে ছেলেটাকে মাদ্রাসায় দেবো।’

দ্বিতীয়ত: কোন পরিবারের পুরুষ লোকটি হুজুরের কাছে শুনেছেন জন্মনিয়ন্ত্রণ করা ইসলামে হারাম, তাই তিনি হারাম থেকে বাঁচতে গিয়ে অনেকগুলি বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করে ফেলেছেন। স্বল্প আয় নিয়ে এবং ছোট্ট বাসায় এতোগুলো বাচ্চাকাচ্চার জায়গা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তখন বড় দু’একটা সন্তানকে স্কুলে রেখে নতুন জন্মগ্রহণ করা শিশুদের মাদ্রাসায় দিয়ে দেয়া হয়।

আর তৃতীয় কাহিনীটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বাংলাদেশের সমাজে বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের যেকোনো পুরুষই ইসলামের বহুবিবাহের ফতোয়ায় বিশ্বাসের কারণে পার্ভার্টেড হয়ে যায়। সে হুজুরদের কাছ থেকে ওয়াজ-নসিহতে শোনে – একজন পুরুষকে আল্লাহ চারটা বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। স্বভাবতঃই একটা স্ত্রী থাকার পর হুজুর-ভক্ত এই মুসলিম পুরুষটি আরও স্ত্রী খুঁজতে থাকে। আর এর বলি হয় মাদ্রাসার ছাত্র এবং তার মা। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বললে এরকম হয়। ধরুন কোনো একজন দিনমজুর, রিকশাওয়ালা বা বেসরকারি চাকরিজীবী একটা বিয়ে করলো। দুই-তিনটা বাচ্চা হওয়ার পরেই তার দৃষ্টি চলে যায় অন্য নারীর দিকে, ‘পুরান বৌ’ এখন আর তার ভালো লাগে না! একপর্যায়ে তালাকের মাধ্যমে ‘পুরান বৌ’ বিদায় দিয়ে কিংবা পালিয়ে গিয়ে নতুন করে বিয়ে করে সংসার করে অন্য কোনো নারীর সাথে। তার প্রথম স্ত্রী তথা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ঘরের ছেলেদের ঠাঁই হয় মাদ্রাসায়, আর মেয়েদের ঠাঁই হয় মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মি হিসেবে। ছেলেরা যেমন মাদ্রাসায় গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়, মেয়েরা তেমনি গৃহকর্মি হিসেবে মানুষের বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হয়।

এবার যে ছেলেগুলো মাদ্রাসায় গেল তারা সেখানে গিয়ে কী দেখে? চলুন আমরা সেই পরিবেশটার দিকে একটু নজর করি, বা পরিবেশটাকে ভিজুয়ালাইজ করার চেষ্টা করি। মাদ্রাসায় যাওয়ার পর দেখতে পাওয়া যায় একটি জেলখানা, যে জেলখানার শিক্ষকরা কারারক্ষীর ভূমিকায় আছেন। জেলখানার ভেতরটা একটি শরীয়া আইনের ক্ষুদ্র স্টেট হয়ে আছে। সেখানে ছাত্রটা ভর্তি হওয়ার পর তাকে প্রথমেই ৪০ টি হাদিস মুখস্ত করানো হয়। সেই ৪০ টি হাদিসের মধ্যে একটি হাদিস হচ্ছে, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম, যার হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’।

আরেকটি হাদিস হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করবে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন’। মাদ্রাসার জেলখানায় ছেলেগুলো যাওয়ার পরে তারা দেখতে পায় এক ধরনের হোঁদল কুতকুত, পানসে কিন্তু কঠোর স্বভাবের হুজুর। এই হুজুররা সচরাচর হাসেন না। ছাত্রদের সাথে সহজে মিশতে পারেন না। এই হুজুররা সবসময় গুরুগম্ভীর হয়ে থাকেন। তারা সবসময় চারিপাশে ‘ইহুদি-নাসারার ষড়যন্ত্রের’ গন্ধে অস্থির থাকেন। মাদ্রাসার এই বদ্ধ কারাগারের ভেতরে গান, নাচ, চিত্রাংকন, সব ধরনের বিনোদন এমনকি জোরে জোরে হাসাও নিষিদ্ধ! রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে যেতে হয়, আর কলিংবেলের তীব্র শব্দে কিংবা হুজুরদের লাঠির আঘাতে ঘুম থেকে জাগতে হয় রাত সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে। এরপর এরপর শুরু হয় কোরআন মুখস্থ করার পালা। অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে হুজুরের কাছে কোরআন নিয়ে গিয়ে সবক (মুখস্তপাঠ) শোনাতে হয়। সবকে ভুল হলেই ধমক এবং মারপিটের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিদিন সকালে কিংবা কোন কোন দিন বিকেলে হুজুররা সব ছাত্রকে একত্র করে নসিহত (উপদেশ) করে। এই নসিহতের মধ্যে নবীর প্রতি সাহাবীদের ভক্তির কাহিনী, ইমাম আবু হানিফার প্রতি তার ছাত্রদের ভক্তির কাহিনী, জুনায়েদ বাগদাদীর প্রতি তার ছাত্রদের ভক্তির কাহিনী, দেওবন্দের হুজুরদের প্রতি তাদের ছাত্রদের ভক্তির কাহিনী শোনানো হয়। হুজুরদের খেদমত (সেবা) করলে আল্লাহকে পাওয়া যায়, আল্লাহকে পেলে বেহেশত নসীব হয়; আর হুজুরদের সাথে বেয়াদবি করলে বা তাদের কথা না শুনলে আল্লাহ নারাজ হন, আল্লাহ নারাজ হলে দোজখে যেতে হয় এই হচ্ছে নসীহতের সারমর্ম।

মাদ্রাসার হুজুরদের বেতন খুব সীমিত, আর মাদ্রাসার মধ্যে তাদের থাকার জায়গাটাও খুব সংকীর্ণ। অপরদিকে ছাত্ররাও শিক্ষকের কাছ থেকে ‘উস্তাদের ভক্তি ও খেদমতের গল্প’ শোনার পর উস্তাদের খেদমত করার প্রতি আগ্রহী হয়ে থাকে। সুতরাং যখন কোন শিক্ষক তার ছাত্রকে বলে, আমার কাপড়টা ধুইয়া দে, আমার জুতাটা মুইছা দে, আমার বিছানার চাদরটা পাল্টাইয়া দে, আমার থালা বাসনগুলো ধুইয়া আন, তখন ছাত্র সেটা খুশিমনে হোক বা অখুশি মনে হোক, করে। হুজুরদের হাত-পা, মাথা টিপে দিতে বললেও ছাত্ররা তা করে।

মাদ্রাসার শিক্ষকদের জগতটা মাদ্রাসার ছাত্রদের মতোই ছোট্ট। জেলখানার বন্দীদের জগত যেমন খুব ক্ষুদ্র, কারারক্ষীদের জগতটাও ক্ষুদ্র তেমনি মাদ্রাসার ছাত্র এবং তাদের পাহারাদার হুজুরদের জগতটাও খুব ক্ষুদ্র। যে হুজুর সারাক্ষণ মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান করে সেই হুজুরের সামনে যেহেতু কোন বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই (কারণ জগতের সকল প্রকার বিনোদন ইসলামে হারাম), আবার অন্যদিকে বিবাহিত হুজুরের স্ত্রীও থাকে গ্রামের বাড়িতে, আবার ছাত্রদের পাহারা দেয়ার জন্য হুজুরদের মাদ্রাসার ভেতরে থাকাও বাধ্যতামূলক সেহেতু হুজুর তার শারীরবৃত্তীয় চাহিদা মেটানোর সুযোগ পায়না। আবার হুজুর দেখতে পাচ্ছে, যেকোন কথা বলামাত্রই বা যেকোন নির্দেশ দেয়ামাত্র ছাত্ররা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হুজুরের নির্দেশ মেনে চলে। হুজুরের নির্দেশ অমান্য করলেই ধমক, পিটুনি এবং মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কারাদেশ সহ বহু রকমের নিপীড়ন নেমে আসে।

সমাজের গণ্যমান্য-জঘন্য ব্যক্তিবর্গের সবাই এই নিয়মটার মান্যতা দিয়েছে। স্বভাবতঃই মাদ্রাসার শিক্ষকের শরীরের মধ্যে যখন যৌনতার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয় তখন সে চোখের সামনে দেখতে পায় তার ছাত্রদেরকে। তখন সে নিজেকে যতটা যতটা সামলানোর চেষ্টা করে আসলে সে ততটা সামলাতে পারেনা, একপর্যায়ে বেসামাল হয়ে রাতের বেলা হুজুরটি তার ছাত্রকে বলে, ‘আমার ঘরে আইসা হাত-পা টিপে দে, মাথাটা বানাইয়া দে’। ছাত্র যখন হুজুরের হাত-পা কিংবা মাথা টিপে দেয় সেই সময়ে হুজুরের মধ্যে জেগে ওঠে শারীরবৃত্তীয় চাহিদা; আর এই চাহিদাটা হুজুর যখন বাস্তবায়ন করতে যায়, তখন সে বিকৃতির আশ্রয় নেয়, যে বিকৃতিকে আমরা বলি ধর্ষণ।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 396
  •  
  •  
  •  
  •  
    396
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.