স্তন ক্যান্সার ট্যাবু নয়, এটা রোগ- সাহসের সাথে মোকাবিলা করুন

রোকসানা আক্তার:

সমাজের যেকোনো মানুষ কোন মানসিক সমস্যায় বা ডিজিজে আক্রান্ত হলে বা কারো যে কোন ধরনের শারীরিক অসামঞ্জস্যতা বা অসমর্থতা থাকলে সেটা যেমন সেই মানুষের জন্য ডিসক্রেডিট হতে পারে না এবং কোন মাপকাঠি হতে পারে না, তেমনি কোন নারী ব্রেস্ট বা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হলে সেটাও তার জন্য কোন ডিসক্রেডিট না। কিন্তু আমাদের সমাজে নারীর জন্য বানানো অন্যান্য ট্যাবুর মতো ব্রেষ্ট ক্যানসারকেও ট্যাবু বানানো হয়।

স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীরা সুস্থ হওয়ার পর প্রথমেই সমাজের মানুষের যে প্রশ্নের সম্মুখীন তারা হন, সেটা হলো যে, তার ব্রেষ্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া পার্ট পুরোপুরি কেটে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে কিনা? একটা কেটে ফেলা হয়েছে, নাকি দুটোই কেটে ফেলা হয়েছে? পরের প্রশ্ন আসে যে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেছে কিনা??

আমাদের সমাজে যেখানে কোন নারীর উচ্চতা, গায়ের রং, চোখ, চুল, দাঁত অর্থাৎ নারীর অঙ্গের যেকোনো কিছু একটু কম বেশি হলে সেটাকেই সেই নারীর ডিসক্রেডিট হিসাবে ধরা হয়। সেখানে কোন নারী যদি ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় তার ব্রেস্ট অপারেশন করে বাদ দিতে হয় এবং পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়, তবে সেই নারীকে আমাদের সমাজে করুণার চোখে দেখা হয়, এমনকি তাকে সমাজে এবং পরিবারে অমানবিক কথাবার্তা এবং পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কারণ একটাই, আর সেটা হলো আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর জীবনের সার্থকতা হলো বিয়ে, যৌনতা এবং সন্তান জন্মদান।

রোকসানা আক্তার, লেখক ও ক্যান্সার সারভাইভর

নারী যতই শিক্ষিত ,স্বনির্ভর হউক সেটাকে তার প্রধান যোগ্যতা হিসাবে ধরা হয় না। এমতাবস্থায় ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত নারীর ব্রেস্ট অপসারণ এবং পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে (সমাজ মনে করে) সেই নারী অকেজো হয়ে যাওয়া, কারণ মানুষ মনে করে ব্রেস্ট আর পিরিয়ড থাকলেই সে নারী যৌনতায় এবং সন্তান জন্মদানে সক্ষম। যে সমাজ নারী জীবনের সার্থকতার মাপকাঠির অনেকটাই এই বিষয়গুলোর উপর নির্ধারণ করে, সেই সমাজে একজন অবিবাহিত বা বিবাহিত নারী ব্রেষ্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হলে তার অবস্থা কী হয় বা হবে তা সহজেই অনুমেয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ক্ষেত্রে পুরুষের একটা ছুঁতো দরকার নারীকে অবহেলা, অসম্মান এবং নির্যাতন করার জন্য। আর দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য এটা তো অনেক বড় একটা ছুঁতো যে স্ত্রীর ব্রেস্ট ক্যানসার হয়েছিল।

কোন বিবাহিত নারী যখন কোন দূরারাগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন তখন পরিবার-পরিজন রোগাক্রান্ত মহিলার প্রতি সহনুভূতিশীল হয়ে তাকে ইমশোনাল সাপোর্ট দেয়ার বদলে সেই নারীর স্বামীর প্রতি সহানুভূতিশীল, আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন যে আহা বেচারা এই বউ নিয়ে বাকি জীবন কাটাবে কীভাবে! অর্থাৎ পুরুষ মানুষ, তার একটা সাধ আহ্লাদ আছে না! মানে সবাই স্বামী বেচারার যৌন জীবনের কী উপায় হবে তাই নিয়ে পরোক্ষভাবে আক্ষেপ করা শুরু করেন। কত অমানবিক!

আসলে পুরোটাই মস্তিষ্কের অর্থাৎ মানসিক ব্যাপার। কারণ একজন নারীর পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ব্রেস্ট কেটে ফেলে দিলেই সে যৌন জীবনে সক্ষম নয়, এ ধারণা ভুল। কারণ সঙ্গীর সাথে দিনের পর দিন একসাথে থাকলেও নারী যদি সঙ্গীর কাছে থেকে আশানুরূপ ব্যবহার, সম্মান, কেয়ার না পান, তবে তিনি সেই সঙ্গীর সাথে যৌনজীবনে মারাত্মক অনীহা বোধ করতে পারেন। আবার ব্রেস্ট ক্যানসারের সাইড ইফেক্ট নিয়েও একজন পুরুষ সঙ্গীর ভালবাসা, মমতা আর কেয়ারের ফলে সেই নারী তার সঙ্গীর প্রতি আগের মতোই আকর্ষণ অনুভব করতে পারেন, আর আকর্ষণ অনুভব করলে মস্তিস্ক দ্রুত কাজ করবে, ফলে নারীর আবেগ এবং সঙ্গীকে নিবিড় করে পাওয়ার ইচ্ছা জাগবে, তখন শরীরও সে অনুযায়ী সাড়া দিবে। তাই এই রোগকে কোন ছুঁতো বানানো অসুস্থ মানসিকতারই পরিচয়ই দেয়।

ব্রেস্ট ক্যানসার থেকে বেঁচে ফিরে আসা একজন নারী আসলে একজন যোদ্ধা, কারণ তিনি একটা মরণ ব্যাধিকে পরাজিত করে নিজের জীবনকে আবার নতুন করে বাঁচিয়ে তুলেছেন। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ কেউ একবার বলে না সেই নারীকে যে আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য। যে কোনো ক্যানসারের সাথে মোকাবিলা করতে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন ধৈর্য্য, মনোবল, সাহস, আত্মবিশ্বাস আর পরিকল্পনা মাফিক চলা। এটা একটা যুদ্ধক্ষেত্রের চাইতে কম না। আর একজন সাহসী যোদ্ধাই যুদ্ধের ময়দানে দিনের পর দিন যুদ্ধ করে তারপর জয়ী হয়ে ফিরে আসে। যুদ্ধের ময়দানে থেকে ফেরা সাহসী যোদ্ধা তো অক্ষত ফিরতে পারে না। যেকোনো একটা বা দুটো অঙ্গহানি সেই যুদ্ধে তো হবেই। ব্রেস্ট ক্যানসার থেকে ফিরে আসা যোদ্ধার ক্ষেত্রেও তেমনি হয়। সমাজের মানুষগুলো এতো অমানবিক আর বিবেক-বিবেচনাহীন যে এটাকেও নারীর জন্য একটা ট্যাবু বানিয়ে ফেলে। অথচ মানব জীবনে একটা মানুষের জীবন এবং তার বেঁচে থাকটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। তার ফিরে পাওয়া জীবনের জন্যই তাকে স্যালুট করা উচিত। কারণ এই যুদ্ধটা তাকে লড়াই করে বেঁচে ফিরে আসতে হয়েছে। তাই তাকে ছোট করার জন্য বা হেয় করার জন্য তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা উচিত না।

প্রত্যেক নারীর উচিত মাসে একবার নিজ হাতে চেক করা। ইউটিউবে দেয়া আছে কীভাবে চেক করতে হয়। যত তাড়াতাড়ি রোগ ধরা পড়বে তত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা কার্যকর এবং সাকসেসফুল হবে। এটা নারীর জন্য কোন ডিসক্রেডিট, লজ্জা বা ভয়ের বিষয় না। এটা একটা রোগ। তাই ভয় বা লজ্জা না করে নিজেই চেক করুন। এটা আপনি নিজেই পারবেন। শুধু ইউটিউবে সার্চ দিয়ে শিখে নিন।।

শেয়ার করুন:
  • 551
  •  
  •  
  •  
  •  
    551
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.