ধর্ষক নির্মাণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-৩

শামীম আরা নীপা:

ধর্ষণের অপরাধে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ, গুলি করে হত্যা, ঢিল মেরে হত্যা, ফাঁসি দিয়ে হত্যার দণ্ড নিশ্চিত করা দেশগুলোতে এখনও পর্যন্ত ধর্ষণ বন্ধ না হলেও সেসব দেশে ধর্ষণের মামলা হলে প্রশাসন দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসে অপরাধীকে এবং অপরাধ প্রমাণের সাথে সাথে কালক্ষেপন না করে শাস্তি নিশ্চিত করে।

কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার অপচর্চা –সবমিলিয়ে আমাদের দেশে ধর্ষণের বিচার হয় না বললেই চলে, যাও কিছু হয় তার জন্য আমাদেরকে ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয় না ধর্ষণ পরবর্তি হত্যার জন্যও।
বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে সম্প্রতি। প্রয়োজনে আইনের ধারা পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা হচ্ছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নাই বলেই এরকমটি ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

ধর্ষণের পরিসংখ্যানটা খেয়াল করুন –

২০০৮ – ধর্ষণ: ৩০৭, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ১১৪
২০০৯ – ধর্ষণ: ৩৯৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ১৩০
২০১০ – ধর্ষণ: ৫৯৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৬৬
২০১১ – ধর্ষণ: ৬৩৫, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৯৬
২০১২ – ধর্ষণ: ৫০৮, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ১০৬, শিশু ধর্ষণ: ৮৬
২০১৩ – ধর্ষণ: ৫১৬, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৬৪, শিশু ধর্ষণ: ১৭৯
২০১৪ – ধর্ষণ: ৫৪৪, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৭৮, শিশু ধর্ষণ: ১৯৯
২০১৫ – ধর্ষণ: ৮০৮, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৮৫, শিশু ধর্ষণ: ৫২১
২০১৬ – ধর্ষণ: ৭২৪, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৩৭ (সংখ্যায় কম হলেও ধর্ষণ ও নির্যাতনের ধরন ছিলো নির্মম) শিশু ধর্ষণ: ৪৪৬
২০১৭ – ধর্ষণ: ৮১৮, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৪৭, শিশু ধর্ষণ: ৫৯৩
২০১৮ – ধর্ষণ: ৭৩২, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৬৩, শিশু ধর্ষণ: ৭২৭
২০১৯ – ধর্ষণ: ১৪১৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা: ৭৬, শিশু ধর্ষণ: ৯০২
২০২০ – সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৪৮টি ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এগুলো কেবল সংবাদ মাধ্যমে আসা খবর। এর বাইরেও ধর্ষণ ঘটছে, যার সংখ্যা আমরা জানি না।

শামীম আরা নীপা, অ্যাক্টিভিস্ট

ধর্ষণ একটি ‘যৌন সন্ত্রাস’ যা সমাজ সভ্যতার ইতিহাসে নতুন কোন ঘটনা নয়। এর ইতিহাস অনেক পুরনো। কালের বিবর্তনে মানুষ আধুনিক হয়েছে আর সাথে নারীর প্রতি তার এই যৌনসন্ত্রাসের ধরনে ভিন্নতা পেয়েছে। নারীকে অবদমনের জন্য পুরুষতন্ত্র নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয় এবং কিছু ক্ষেত্রে নারীর প্রতি পুরুষ সেই আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগেই রয়ে গেছে। প্রাচীন যুগেও সমাজে ধর্ষকের মন তৈরি হওয়ার মতো বস্তুগত উপাদান ছিল, বর্তমানেও তা বিদ্যমান ভিন্ন আঙ্গিকে, কখনও তা সমাজ সংস্কারের নামে, কখনও ধর্মের নামে, কখনও রাষ্ট্রীয় আইনের নামে। প্রাচীন যুগ পেরিয়ে মধ্য যুগ তারপর আধুনিক যুগ – সকল সমাজেই নারীরা পুরুষের দ্বারা নিগৃহিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, মৃত্যুবরণ করছে। সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা পুরুষের আধিপত্যবাদী সমাজ কাঠামোর কারণে পুরুষ যে আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সেটি এবং পৌরুষত্ব ও যৌনতার বিশেষ সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক নির্মাণই ধর্ষণকে সম্ভবপর করেছে।

ধর্ষক, খুনি, নির্যাতকরা এই সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে পুরুষের আধিপত্যকামী সংস্কৃতি চর্চায় যা পুরুষরা তৈরি করেছে নারীকে অধীনস্ত করার মানসিকতা থেকে। এই সংস্কৃতি বশেই পুরুষ নারীর শরীরকে দখল করে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেছে, নির্যাতনের যাতাকলে নিষ্পেষিত করেছে। প্রাচীন সমাজেও পুরুষেরা তাদের বীরত্বের প্রদর্শনপূর্বক বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে নারীর উপর নিপীড়ন চালাতো। সময় ও পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও সেই মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি- সমাজ ও রাষ্ট্রে সেই বস্তুগত উপাদানগুলো এখনও আছে বলেই নারীরা পুরুষের দ্বারা যৌনসন্ত্রাস ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণ নামক যৌনসন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটা হাতিয়ার।

যৌন নির্যাতনের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শনের বিষয়টিই প্রধান হয়ে ওঠে। ধর্ষণের মধ্য দিয়ে পুরুষের এই বিকৃত মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। যৌনতার ক্ষমতায়ন চূড়ান্তভাবে পুরুষকে নারী হত্যায়ও প্ররোচিত করে। ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা স্বাভাবিক কোন নারী নির্যাতন বিবেচনা করা যায় না। আধিপত্যকামী সমাজব্যবস্থা এর মধ্য দিয়ে আধুনিক সমাজে ‘পৌরুষত্ব’কে নির্মাণ করে। অপরদিকে নারীরা যে অধস্তন, অসহায়, ক্ষমতা কাঠামোর বাইরের বিষয় সেই অবস্থানও এর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। যৌনসন্ত্রাস ব্যক্তিক নয়, এর সাথে সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস জড়িত। আধিপত্যবাদী ক্ষমতাকাঠামোর উগ্র প্রতিফলন এই যৌনসন্ত্রাস। এই সকল অনাচারের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে ফেলে নুতন মানব সমাজ গড়তে হবে।

নারীর প্রতি বৈষম্য, নারীর প্রতি বিবিধ অবিচারের কাঠামো আমাদের দেশে কোথায় নাই? আমাদের সমাজ, আইন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পত্তি বন্টনের বৈষম্য, রাজনীতি, –এসবই একজন ধর্ষককে সুরক্ষা দেয়ার সংস্কৃতি লালন করে বলেই আমাদের দেশে ধর্ষণ একেবারে অনিবার্য।

কাজেই ধর্ষণের দ্রুত বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি সামাজিক সচেতনতা এবং আপামর জনতার প্রতিরোধ গড়ে তোলা। মানুষের জাগরণই পারে ধর্ষণকে প্রতিরোধ করতে। আইনের ফাঁকফোকরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় যেখানেই নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ আছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, রাষ্ট্রযন্ত্রের ধর্ষণ বিষয়ক নির্লিপ্ততার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ধর্ষণকে ক্ষমতা চর্চার হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, নারীর বিরুদ্ধে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যাবতীয় মিথের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে আমাদেরকে যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যমকে ব্যবহার করে।

(চলবে)

বিঃদ্রঃ এই লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে আমি প্রায় ৩৫ টার মতো নিউজ লিঙ্ক পড়েছি, কিছু পিডিএফ, কিছু বই আগেই পড়া ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে এই লেখাটা দাঁড়িয়েছে। এই লেখার ভেতর কোট না করেই আমি এমন অনেক কিছু অ্যাজ ইট ইজ যুক্ত করেছি, কারণ তার থেকে ভালো শব্দ সংযোজন আমি করতে পারিনি এবং রেফারেন্স ও ক্রেডিট দিতে পারছি না, কারণ যখন পড়েছি তখন কিছু নোট নিয়েছি। কিন্তু লেখার লিঙ্ক আর রাখিনি, লেখকের নামও মনে থাকার কথা না। তাই এই লেখা আমার একক লেখা না। আমার ইনপুটের সাথে এখানে অনেক মানুষের ইনপুটও আছে। সবার জন্য কোন স্বত্ব ছাড়াই এই লেখাটি উন্মুক্ত।

আগের পর্বগুলোর লিংক:

পর্ব-১ https://womenchapter.com/views/36339

পর্ব-২ https://womenchapter.com/views/36349

 

শেয়ার করুন:
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.