মাতৃত্ব কি স্যাক্রিফাইস, নাকি চয়েজ?

বাসন্তি সাহা:

আজকাল ‘গুড এনাফ মাদার’ ‘কোয়ালিটি টাইম’ এরকম কিছু ধারণা চলে আসছে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে। এই ধারণাগুলো আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়, কিন্তু আবছা একটা ধারণা আছে। তবে গুড এনাফ মাদার আর কোয়ালিটি টাইম দুটোই আমার কাছে আপেক্ষিক মনে হয়। যারা সন্তানদের মুখ দেখে তার সমস্তকিছু বুঝতে পারেন আর সেটা মেটানোর জন্য সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন, তারা কি গুড এনাফ মাদার? আর কোয়ালিটি টাইম কাটানো যেটা বই-পত্রিকা থেকে জেনেছি, সেটা হচ্ছে, বাচ্চাকে গল্পের বই পড়ে শোনানো, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া এমন কিছু? জানি না। আমার ভুল হতে পারে।

চিরন্তন মায়ের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলেই –দেখি স্যাক্রিফাইসিং এক মায়ের চরিত্র। আমাদের মায়েরা সবাই তেমনই। সন্তানের জন্য জীবনের সমস্ত সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে সন্তানকে বড় করেছেন। তারাই কি তাহলে গুড এনাফ মাদার? এখনকার সময়ে ব্যক্তিগত আরাম সুখ বাদ দিলে মাকে সন্তানকে না খেয়ে খাওয়াতে হয় না। কিন্তু নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। কয়েকটা বছর নিজের স্নান-খাওয়ার ঠিক থাকে না একইভাবে। আমাদের বাবাদের সময়ে তো শুনেছি সন্তানকে জন্ম দিয়ে বড় বোনের হাতে তুলে দিয়ে মা আঁতুড়ঘর ছেড়ে রান্নাঘরে ঢুকতেন। বহু সন্তান আর একান্নবর্তী পরিবারে বাচ্চাকে আলাদা করে মা সময় দিতে পারতেন না। শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারেও মা বাচ্চাকে আলাদা সময় দিতেন, এমন শুনিনি। আমরা রবীন্দ্রনাথের কথা জানি –মা-বাবাকে তারা আজকের বাচ্চাদের মতো করে পাননি।

ষাট এর দশকে শুরু হওয়া নারী আন্দোলন বিশেষ করে আশির দশকের নারী আন্দোলন ও নারীদের ভোটাধিকার অর্জনের পর থেকেই মাতৃত্বের ধারণা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তখন নারী কেবল একজন স্ত্রী বা সন্তানের মা নন, তিনি একজন ‘পূর্ণাঙ্গ’ মানুষ এবং একজন কর্মজীবীও। তখনই সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা ও দায়িত্ব পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশে এই ধারণা এখন শহুরে শিক্ষিত নারীদের মধ্যেই কেবল নয়, ঢাকাতে প্রচুর গার্মেন্টস কর্মী তাদের সন্তানকে বাড়িতে মা বা শাশুড়ির কাছে রেখে ঢাকাতে কাজ করছেন। তারা সন্তানের লেখাপড়া আর স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিশ্রম করছেন, তারাও কি গুড এনাফ মাদার নন?

মাতৃত্ব আমার নিজের কাছে একটা চয়েজ ছিলো। হয় ক্যারিয়ার, নয় মাতৃত্ব। মাতৃত্ব আমার কাছে অনায়াস ছিলো না। আমি মাতৃত্বকে বেছে নিয়েছিলাম। আমি মা হতে পারবো না – এটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। এই ধারণাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে –একজন নারীকে কেন শরীরের ক্ষতি করে,
ক্যারিয়ারের ক্ষতি করে বায়োলজিক্যালি মা হতে হবে? চারপাশের চাপ ছিলো পরোক্ষ, কিন্তু সত্যি কেউ আমাকে বাধ্য করেনি। তাই এটাকে কি আমি স্যাক্রিফাইস বলবো? বলা উচিত না, বলিও না। কিন্তু মাঝে মাঝে এটা মনে উঁকি দেয় না তা নয়।

আমি ছিলাম ছাতে
তারায়-ভরা চৈত্রমাসের রাতে।
হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে উঠে
দেখতে গেলেম ছুটে।
সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে
প্রদীপটা তার নিবে গেছে বাতাসেতে।
শুধাই তারে, ‘কী হয়েছে বামি?’
সে কেঁদে কয় নীচে থেকে, ‘হারিয়ে গেছি আমি!’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

আবার এখন দিনের কিছু সময় আমি নিজের মতো করে কাটাই, চা খাই, কবিতা পড়ি, বন্ধুদের সাথে ফেসবুকে বা ফোনে কথা বলি, তখন আমি কাউকে না, আমার সন্তানকেও চাই না। একা ঘুরতে পছন্দ করি। নিজের মতো সময় কাটাতে পছন্দ করি, সেটা দিনে আধাঘন্টা হলেও, এটাও কখনও কখনও আমাকে গিল্টি ফিলিংস দেয়। আবার ভাবি, মা ছাড়াও আমি একজন আলাদা মানুষ, নিজের ভালো লাগার জায়গায় থাকার অধিকার আছে আমার। অন্য সব মায়ের এমন হয় কিনা জানি না।

আর কোয়ালিটি টাইম কাটানো আসলে কী? মেয়ে খেতে চায় না। অন্তত দু’বেলা মুখে তুলে দেই পুষ্টিকর খাবার। তার ভগ্নাংশের অংক নিয়ে হিমশিম খেয়ে যাই। ঠিকমত জল খেলো কিনা তারও হিসেবে রাখি। পায়ে যাতে ফোসকা না পরে তাই আরামদায়ক জুতো কিনে দেই। আমাদের ফোসকার ব্যথা মনে করে। কিন্তু তার প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে বিরক্ত হই। আমাদের সময়ের গল্প ওদের কাছে আর চলে না। কারণ ওরা স্পেসে কী হচ্ছে তার খবর রাখে। তবে রাতে ঘুমাবার সময় মা-মেয়ের কথোপকথন – স্কুলে কে কার ক্রাশ সেটা দারুণ উপভোগ করি। মা, ক না খ এর হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাদের দেখে ছেড়ে দিলো। কেন তোমরা বন্ধুরা ছেলেদের হাত ধরো না? বিরক্ত হয়ে তিস্তা বলে, মা এটা অন্য হাত ধরা। আবার বলে, মা, ক না আমাকে পছন্দ করে, কিন্তু আমি করি না। কেন করো না? কারণ ও খুব ঘামে। তাতে কী? যদি হাগ দিতে আসে! ব্য্যাকটেরিয়া লেগে যাবে না! হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে পড়ি। এটা আমার কাছে কোয়ালিটি টাইম মনে হয়েছে এতোদিনে।

আমরা অনেক না পেয়ে বড় হয়েছি। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি, এখনও নিচ্ছি, নিতে শিখেছি। এখনকার বাচ্চারা বাবা-মাকে সবসময় পেয়ে আদরে বড় হচ্ছে। তারা কি সুস্থ সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে? নাকি তারাই বেশি প্রশ্ন তুলছে আমার সমস্ত দায় মেটানোর দায়িত্ব তোমার। আমি ইচ্ছে করে পৃথিবীতে আসিনি। মাকে বলছে, কী করো, প্রতিদিন একই খাবার দাও টিফিনে অথবা তুমি কী বোঝো! অনেক বাবাও তো আছেন সন্তানকে মার দেয়ার পক্ষে, তাহলে সন্তান ঠিকঠাক মানুষ হবে। কারণ প্রাচীনকালে এমনই হয়েছে।

মাতৃত্ব বা সন্তান লালন পালনের পারফেক্ট কোনো ওয়ে আছে নাকি? ট্রায়াল এ্যান্ড এরর মেথড করে মা শিখবে? বাচ্চাও তো একটা কী দুটো! আটটা, দশটা নয় এখন আর। একজন কর্মজীবী মাকে ‘ভালো মা’ ধারণাটাকে চ্যালেঞ্জ করে করে যেতে হয়। সন্তানকেও তো এই ধারণাটা দিতে হবে, মা সবসময় এ্যাভেইলেভেল হবে তা নয়। মারও নিজের মতো করে নিজের কাজের সময় থাকবে। মাতৃত্ব থেকে কি কারও মাঝে মাঝে ব্রেক নিতে ইচ্ছে করে না?

বাসন্তি সাহা
প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, দর্পন ঢাকা।

শেয়ার করুন:
  • 418
  •  
  •  
  •  
  •  
    418
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.