মাদ্রাসায় একের পর এক শিশুধর্ষণ: নজরদারিতে এতো অনীহা কেন?

সুপ্রীতি ধর:

লক্ষ্মীপুরে ছয় শিশু ছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মোবারক হোসেন (২৮) নামে এক মাদরাসা পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে ওই শিক্ষক  ছয়টি শিশুকে একাধিকবার যৌন নিপীড়ন করেছেন এবং ঘটনাগুলো গোপন রাখতে তিনি ছাত্রদের ভয়ভীতি দেখিয়ে শপথ করান এবং তা মোবাইলে ভিডিও করে রাখেন। সম্প্রতি এক শিশু নিপীড়নের পর রক্তক্ষরণের বিষয়টি নজরে এলে ঘটনাটি জানাজানি হয়। এরপর মঙ্গলবার বিকেলে মোবারককে আটকের পর মাদরাসার একটি কক্ষে অবরুদ্ধ করে পুলিশে খবর দেয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন মুসলিমাবাদ তালীমুল কোরআন ইসলামী একাডেমি বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

আরেকটি খবরে বিবিসি জানাচ্ছে, জয়পুরহাট সদর উপজেলায় একটি নুরানী মাদ্রাসায় চারজন কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে তাদের অভিভাবকরা মামলা দায়ের করেছেন গত রোববার। সেই মামলায় অভিযুক্ত মাদ্রাসাটির শিক্ষককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

বাংলাদেশে ধর্ষণসহ নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা নিয়ে খবর ক্রমাগত বেরিয়ে আসছে, যা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। উদ্বেগ বাড়ছে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের খবর নিয়ে।

একটি গল্প পড়লাম। মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের কোরান শিক্ষার নামে কী ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়, সেই গল্পে তাই তুলে ধরা হয়েছে। কাল রাতে গল্পটি পড়ার পর থেকে কচি কচি মুখগুলো চোখের সামনে ভাসছিল। আর মনে পড়ছিল ২০০৩ সালে আমি যখন ঢাকার তেজতুরি বাজার এলাকায় বাসা নিয়েছিলাম প্রথম আলো অফিস আর মেয়ের হলিক্রস স্কুল কাছে হবে বলে, তখন আমার এক বাসা পড়েই ছিল কওমী মাদ্রাসা কাম এতিমখানা।

একদিকে মেয়েরা, অন্যদিকে ছেলেরা থাকতো। ওই ছেলেমেয়েগুলো সবসময় জানালার শিক ধরে থাকতো আর রাস্তা দিয়ে যাওয়া সব সবজিওয়ালা, মাছওয়ালাদের ডেকে কথা বলতো। মাঝে মাঝে তাদের ঔদ্ধত্য সীমাও ছাড়িয়ে যেতো, বিশেষ করে ছেলেদের জানালাগুলো থেকে। ওরা আশেপাশের বাসার সবাইকে ‘টিজ’ করতো নানাভাবে। বিশেষ করে যেসব বাসায় কিশোরী মেয়েরা ছিল। ওদের জন্য আমাদের বারান্দায় যাওয়া অসম্ভব হয়ে গেছিল।  মাঝে মাঝেই পুলিশি অভিযান চলতো এই মাদ্রাসাটিতে, তখন দেখতাম ছেলেরা শিক গলিয়ে পালাতো। একে তো মাদ্রাসা, যেখানে আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, পবিত্র গ্রন্থ পড়ানো হয়, শেখানো হয়, তাই তাদের নিয়ে সেই সময়টাতে কিছু বলার বা করার ঔদ্ধত্য আমার ছিল না। আর অন্যরা ‘সয়ে’ নিতো ধর্মের নামে। আজ মনে হয়, এই যে ‘সয়ে’ নেওয়ার কালচার, এটাই সহায়ক হয়েছে এই বিষাক্ত সাপের বংশবৃদ্ধিতে। অথচ গোড়াতেই বিষদাঁত ভেঙে দিলে আজকের বাংলাদেশ অন্তত দেখতে হতো না।

এই মুহূর্তে আরও কয়েকটি খবর দেখলাম …

  • পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ‘বলাৎকারের’ শিকার,
  • নাটোরে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেপ্তার,
  • ১২ শিশুকে ধর্ষণ: মাদ্রাসা শিক্ষক বললেন ‘শয়তানের প্ররোচনা’
  • মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, শিক্ষক পলাতক
  • মাদ্রাসা ছাত্রকে অজুখানায় নিয়ে বলাৎকার করলেন শিক্ষক
  • ধর্ষণের পর কোরআন শরীফ ছুঁইয়ে শপথ করাতেন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ
  • ১৩ বছরের শিশু ছাত্রকে বলাৎকার: মাদ্রাসা শিক্ষক আটক

তো, এরকম আরও অজস্র খবর বেরিয়ে আসে একটু গুগল সার্চ দিলেই। গত কয়েকদিনেই বেশ কয়েকটি রোমহর্ষক ঘটনার খবর আমরা জানতে পেরেছি। একটি টিভি চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে দরিদ্র এক মা বলছিলেন, তার মাদ্রাসা পড়ুয়া ছোট্ট ছেলেটির পায়ুপথ দিয়ে রক্ত পড়ছিল, টয়লেট করতে পারতো না। এরপর সে কর্তৃপক্ষকে জানায় তার ওপরে হওয়া অত্যাচারের কথা। মা তখন অভিযোগ নিয়ে মাদ্রাসায় গেলে তাকে বের করে দেয়া হয়, অভিযোগের তদন্ত তো হয়ইনি, বরং মাদ্রাসা বন্ধ করে পালিয়ে যায় সবাই। সেই মা তার সন্তানের ওপর হওয়া নির্যাতনের দাবি জানিয়েছেন।

মাদ্রাসাগুলো থেকে অহরহ এ ধরনের খবর বেরিয়ে আসছে। নির্যাতন সইতে না পেরে শিশুরা আত্মহত্যা পর্যন্ত করছে। অথবা ধর্ষণের খবর প্রকাশের ভয়ে তাদেরকে হত্যাও করা হচ্ছে। এসবই করছে মাদ্রাসার শিক্ষক, অধ্যক্ষরা। অথচ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠালেই একদল আমাদের দিকে তেড়ে আসে এই বলে যে, আমরা ইসলাম বিদ্বেষী, তাই মাদ্রাসার বিরুদ্ধে কথা বলছি। কিন্তু এই ঘটনা যে খোদ ইসলামকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে, সেই কথাটা একবারও তারা ভাবছে না।

আমার মাঝে মাঝে এই মডারেট মানুষগুলোর মানসিকতা নিয়েই প্রশ্ন জাগে। তাদের চোখে কি অপরাধগুলো ঠিক অপরাধ হয়ে দেখা দেয় না? নাকি দিলেও জাস্ট ধর্মের নামে তারা তা চেপে যেতেই পছন্দ করেন? কোনটা? ধর্ম আর ধর্মান্ধতা যে এক বিষয় নয়, এটা কবে বুঝবে সবাই?

আমরা যখনই দেশে নতুন নতুন মাদ্রাসা নির্মাণের বিরোধিতা করি, তখনই আমাদেরকে একঘরে করে দেয়া হয়, আমাদের আইডি খেয়ে দেয়া হয়। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে দেশটি সামনের দিকে না এগিয়ে কেন পিছন দিকে হাঁটছে, এই প্রশ্নটা কেউ করছে? যারা করছে তারা তো গুটিকয়েক, এবং তাদের বাক্ স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার জন্য সরকার, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী সদা তৎপর। কিন্তু যারা চুপ করে আছেন, বা উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে আছেন, তারা কি ভাবছেন, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয়ে যাবে?

যে বয়সে একটি শিশুর, সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, পরম নিশ্চিন্তে মা-বাবার কাছে থাকার কথা, সাধারণ স্কুলে আর সবার মতো পড়াশোনা করার কথা, একই জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার কথা, একই খেলা খেলার কথা, সেই বয়সে একটা বিরাটসংখ্যক ছেলেমেয়েকে ‘আল্লাহর হাতে সমর্পণ’ এর নামে মাদ্রাসায় পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এই যে ধর্মের নামে মগজধোলাই  হয় মানুষের, সেজন্য আপনি, হ্যাঁ যে আপনি আজ চুপ করে আছেন, নীরব সম্মতি দিয়ে যাচ্ছেন ধর্মান্ধতার বিষয়ে, ভাবছেন যে আপনার ‘মহামূল্যবান ধর্মীয় মূল্যবোধ’ বুঝি কেউ কেড়ে নিচ্ছে এসব ঘটনার সমালোচনার মধ্য দিয়ে, সেই আপনি এবং আপনারাই দলে দলে দায়ী। আর সেই ধোলাইকৃত মগজ নিয়ে একদল ‘মূর্খ’ মানুষ তাদের সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছে আরও অন্ধকারের দিকে। মাদ্রাসায় ধর্ষণ বলুন, আর বলাৎকারই বলুন, এর শিকার হয়ে যখন শিশুগুলোর শারীরিক বা মানসিক মৃত্যু হচ্ছে, সেই ক্ষতি যে কী ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে ভবিষ্যতে বা এখনই যে ফেলছে, তার দায় ব্যক্তি আপনি না নিলেও এর থেকে মুক্তি কিন্তু আপনি পাবেন না। নিশ্চিন্ত থাকুন এ ব্যাপারে। আগুন যখন লাগে, দেবালয়ও রক্ষা পায় না। আপনি বা আপনারাও পাবেন না।

এখনও সময় আছে মাদ্রাসা শিক্ষা এবং মাদ্রাসায় সংঘটিত নির্যাতনগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, কথা বলুন, প্রতিবাদ করুন। একমুখি শিক্ষাব্যবস্থা কায়েমের জন্য সরকারকে বাধ্য করুন। বলুন যে মাদ্রাসা আর নয়, বরং সার্বজনিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হোক। যেখানে সব শিশু একই পোশাক পরবে, একই ভাষায় কথা বলবে, গান গাইবে, পাখি দেখবে, ছবি আঁকবে, দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা করবে। শিশুদের সুস্থ মানসিক ও শারীরিক গঠনে আরও বিনিয়োগ দরকার। সমাজে যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন মসজিদ বা মাদ্রাসা স্থাপন না করে সুস্থ, স্বাভাবিক স্কুল, কলেজ নির্মাণ করেন। সবাই মিলেই এই কাজটি করতে হবে শুধুমাত্র আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষার জন্যও।

 

সুপ্রীতি ধর, প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার 

শেয়ার করুন:
  • 961
  •  
  •  
  •  
  •  
    961
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.