ইসলামি জঙ্গিবাদ এখনই নির্মুল না করা হলে আর কখন করা হবে?

কাজী তামান্না কেয়া:

২০২০ সালে বসে যখন এই লেখাটি লিখছি চারদিকে একের পর এক জঙ্গিবাদী হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে, কড়কাড়ি আরোপ করা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কতিপয় সন্ত্রাসীর কারণে ব্যাপক নজরদারিতে রাখা হচ্ছে তাবৎ শান্তিকামী মুসলিমদেরও। যে বাক স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এই মুহূর্তে উঠেপেড় লেগেছে একশ্রেণির ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, সেই বাক স্বাধীনতার কোনো স্থান ইসলামে কোনকালেই ছিল না। আর তাই ইউরোপ এবং আমেরিকাসহ আরও কিছু দেশে বাক স্বাধীনতার যে চর্চা করা হচ্ছিল, ইসলামি জঙ্গিবাদ তার কালো থাবা বাড়িয়ে দিয়েছে সেইসব অঞ্চলে। শান্তিকামী রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষ ইসলামি জঙ্গিবাদ নির্মুল করার কথা বহু বছর আগে থেকেই ভাবলেও এবং বিভিন্ন দেশ বিভিন্নভাবে তা মোকাবেলা করার চেষ্টাও করলেও  এখন পর্যন্ত কোন একক দেশ ইসলামি জঙ্গিদের হাত থেকে পুরোপুরি নিরাপদ হয়েছে কিনা তা জোর দিয়ে বলতে পারছে না।

সেই সপ্তম শতক থেকে ইসলামি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী জিহাদের নামে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে রক্ত ঝরিয়ে যাচ্ছে। সেই রক্তপাত বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। কয়েক বছর আগে ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড সিরিয়া (ISIS) নামে সালাফি ইসলামের তাণ্ডব আমরা দেখেছি। বলা হয়ে থাকে, এটাই ইসলামের প্রকৃত রুপ। প্রকৃত ইসলামের যুগে ISIS শাসিত ইরাক-সিরিয়ায় আমরা দেখেছি নারীদের বেচাকেনা করা, তাদেরকে যৌনকাজে প্রবৃত্ত করা, অন্যথায় নৃশংসভাবে খুন করা, সমকামিদের খুন করা, বিধর্মীদের নির্মমভাবে হত্যা করা এবং আরও ভয়ানক সব বীভৎসতা। আশার কথা ISIS এর পতন হয়েছে। তবে সংগঠনটি পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি, বরং বলা ভালো যে, এর প্রভাব খর্ব হয়েছে মাত্র। সে খর্ব হওয়া শক্তি নিয়েও আইসিস হামলা অব্যাহত রেখেছে। আবার এই সংগঠনের বাইরেও আলাদা আলাদাভাবে জিহাদিরা সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে যাচ্ছে। এই আধুনিক যুগে বসে আমরা কি ইসলামের রক্তপাতের শিকার হতে থাকবো? নাকি জিহাদি ইসলামকে বন্ধ করার সময় এসেছে?

সম্প্রতি ফ্রান্সের একটি ক্লাসরুমে নবী মোহাম্মদের কার্টুন দেখানোর পর সেই শিক্ষককে আল্লাহু আকবর বলে হত্যা করে এক রেফিউজি মুসলিম। ফ্রান্সের নাগরিকদের ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে জঙ্গিদের আক্রমণে বার বার রক্তাক্ত হওয়া ফ্রান্স জঙ্গিবাদ বিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করে। ইসলামী জঙ্গিবাদের মদদদাতা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মুসলিম সন্ত্রাসীর হাতে ফ্রেঞ্চ শিক্ষক হত্যার প্রতিবাদ না জানিয়ে উল্টো ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ডাক দেয় এবং একইসময়ে রাতারাতি বহু দেশে জঙ্গি হামলা হঠাত করে বেড়ে যায়। এইসব হামলায় যাদের মেরে ফেলা হচ্ছে তারা কেউই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব না, বরং খুন হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় যারা আছে তারা নিতান্তই সাধারণ মানুষ, যেমন ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছাত্রছাত্রী, চার্চের যাজক, ৭০ বছর বয়সী নারী, পথচারী, পুলিশ, শিক্ষক এবং মানসিক বিকারগ্রস্থ মানুষও আছে। এসব হামলার পেছনে জঙ্গিবাদের মদদ দানকারী প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভূমিকাটি তাই ঝেরে ফেলে দেয়া যায় না। সেইসাথে সামনে চলে আসে শান্তিকামী মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে হামলার পরবর্তি অবস্থার মতো এই মুহূর্তে সাধারণ মুসলমানদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।

জঙ্গি হামলার কেন্দ্রগুলি খেয়াল করলে দেখবেন এগুলো সংগঠিত হয়েছে চার্চ, মসজিদ, মন্দির, সিনাগগ, ইউনিভার্সিটি, পার্লামেন্টের সামনে, এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে অর্থাৎ যেখানে সাধারণের যাতায়াত, সেখানেই জঙ্গিদের হামলা। এর সবগুলি যে জঙ্গি হামলা, তা পরিষ্কার করে কেউ না বলে দিলেও বোঝা যায় যে, এগুলো ইসলামিক উগ্রবাদীদের কাজ, যদিও কিছু হামলার পেছনে কারা জড়িত আমাদের হাতে সে তথ্য নেই। হামলা করার অস্ত্র বা পদ্ধতিগুলির দিকে তাকালে দেখবেন এখানে আছে ছুরি, তরবারি, মানব বোমা, বন্দুক হামলা, আত্মঘাতী হামলা এবং সর্বশেষ ভিয়েনা আক্রমণে ব্যবহার করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। অর্থাৎ একেবারে মধ্যযুগের ছুরি, তরবারি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, কোনকিছুই বাদ রাখেনি উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী চক্র।

অনেকগুলো আক্রমণের পর সন্ত্রাসীরা নিজেরাই এর দায় স্বীকার করেছে। তা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন যে এটা ইসলামিক মিলিট্যান্টদের কাজ। যেমন ধরুন, সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার দুটো হয়েছে আফগানিস্তানের একটি টিউশন সেন্টারে এবং একটি হয়েছে কাবুল ইউনিভার্সিটিতে। দুটো হামলা ঘটেছে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এবং আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করেছে৷ ভয়ংকর এই হামলা দুটোতে কমপক্ষে ৬০ জন ছাত্রছাত্রী নিহত হয়। ফ্রান্সে নিরপরাধ শিক্ষক প্যাটিকে হত্যার পর অভিযুক্ত ১৮ বছর বয়সী চেচনিয়ান রেফিউজিও টুইটারে বলেছে যে, ইসলামের নবীর কার্টুন দেখানোর কারণেই সে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী জঙ্গিবাদ আফগানিস্তানে যেমন থাবা দিয়েছে, আবার সভ্যতার কেন্দ্রস্থল ফ্রান্সেও হাত বাড়িয়েছে।

ফ্রান্সে আল্লাহু আকবার বলে শিক্ষক হত্যার পর আরও দুটি হামলা চালানো হয়, যার একটিতে চার্চের ভেতর তিনজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করে মেরে ফেলা হয় এবং পরের হামলাটিতে একইভাবে ছুরিকাঘাতে আহত হয় বেশ কয়েকজন। এর পরপরই কানাডায় তরবারি দিয়ে আক্রমণ করে কমপক্ষে দুইজনকে মেরে ফেলা হয়। এই তিনটি হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও হত্যার স্থান এবং ব্যবহৃত অস্ত্র দেখলে আমরা ধারণা করতে পারি যে এগুলোও ইসলামিক জঙ্গিদেরই কাজ। যদি তা নাও হয়, তবুও মনে করি যে এই মুহূর্তেই এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে না ধরলে শেষমেষ নিজেদের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়বে।

বাংলাদেশে কোরান অবমাননার অভিযোগ এনে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে মসজিদের ভেতরেই ব্যাপক মারধর করে হত্যা নিশ্চিত করতে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। পরবর্তিতে তদন্তে প্রমাণ হয়েছে যে নিহত ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে আনা অবমাননার অভিযোগ মিথ্যা। এদিকে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে এবং মন্দিরে ভাংচুর চালানো হয়েছে এবং নারীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কোরান অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে বিভিন্নজনের ওপর হামলা, গুম, গ্রেপ্তার, সবই অব্যাহত আছে। রোববার ভিয়েনায় ইহুদিদের সিনাগগে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে গুচ্ছ আক্রমণ চালিয়ে কমপক্ষে পাঁচজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। এইসব ঘটনার সাথে আইসিসের সংশ্লিষ্টতার তথ্য না থাকলেও গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে এগুলিও ইসলামিক জঙ্গিদের কাজ। তাছাড়া একটি ভিডিওতে হামলার সময় ‘আল্লাহু আকবর’ শব্দটি শোনা গেছে।

আইএসের এখন আর আগের মতো রমরমা অবস্থা নেই। তাদের নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ডও নেই, যেমনটা ছিল সিরিয়া এবং ইরাকে। কিন্তু হোম গ্রোউন ইসলামিক জঙ্গিরা কিন্তু থেমে নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার কিছু দেশে নিজ নিজ দেশে গড়ে ওঠা ইসলামিক সন্ত্রাসীদের ঘটনা আমরা হরদম দেখছি। এগুলোর সাথে বিক্ষিপ্তভাবে বেড়ে গেছে ইউরোপের দেশগুলিতে চালানো হামলা। এমেরিকায় নাইন ইলেভেনের পরে ইসলামিক সন্ত্রাসীদের দাপট কমলেও যেকোনো সময় তা আবার শুরু হতে পারে বলে আশংকা করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইসলামিক সন্ত্রাসের হাত থেকে কেউ এখন আর মুক্ত নয়। সারা পৃথিবীতে এই সন্ত্রাস জাঁকিয়ে বসেছে।

এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। সময় হলো শান্তিকামী এবং নিরপরাধ মানুষের জীবনমান নির্বিঘ্ন করতে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে একযোগে জঙ্গিবাদকে না বলা। পৃথিবীর কোনো একক দেশ তা করতে পারবে বলে মনে হয় না। জাতিসংঘের সহায়তা নিয়ে ইসলামিক জঙ্গিবাদকে নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি। ইসলামের নামে হত্যা, লুটপাট, জোর-জুলুম বন্ধ করার বিকল্প নেই। জঙ্গিবাদ মুক্ত পৃথিবী গড়তে এখনই এক জোট হয়ে কাজ করতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.