‘বিষফোঁড়া’ নিয়ে একটি সাদামাটা পর্যালোচনা

আফসানা কিশোয়ার:

ইস্টিশন ব্লগের বদৌলতে ‘বিষফোঁড়া’ বইটির ই-বুক ভার্সন পেলাম।

ঘটনার শুরুই হয় রফিকুল নামে নয় বছরের এক বাচ্চাকে মাদ্রাসার ওস্তাদ মারছেন এ দিয়ে। রফিকের মাথা দু পায়ের মাঝখানে চেপে মারা হচ্ছে নিতম্বের উপর বেত দিয়ে। ফলে রফিকের ব্যথাদীর্ণ আর্তনাদ খুব দূরে পৌঁছায় না। শাস্তি প্রাপ্তির সিরিয়ালে থাকে টগর। সে রফিকের শাস্তি দেখতে দেখতে অনবরত আল্লাহকে ডাকতে থাকে।

রফিকের দোষ কী? রফিক ছয় পারা পড়ার সময় দেখে দেখেও ভুল করেছে। সে আছে কোরআন শরীফ মুখস্থ করার প্রকল্প হেফজখানায়, সেখানে এই ভুল মেনে নেয়া যায় না, অতএব বেতের বাড়ি। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা ওস্তাদ জোড়া বেত দিয়ে নয় বছরের বাচ্চাকে মেরে তার শারীরিক শক্তির মহড়া দিয়ে যান অক্লান্ত।

টগরের কুসুমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকে যায় তার রিকশাচালক বাবা এক্সিডেন্টে মারা যাওয়াতে। ডেঙ্গু যখন টগরের মায়েরও প্রাণ কেড়ে নেয় তখন জীবন থেকে চলে যায় খেলাধূলা, রঙিন বই, সব। দৈনন্দিনের অনুষঙ্গ হয়ে যায় মাদ্রাসার জন্য তহবিল সংগ্রহের ভিক্ষা করা, যৌন নির্যাতনের ভয় এবং তা থেকে নিজেকে বাঁচাতে নানা ভাবনা।

টগরদের এলাকার সুদি নশু ও মুহতামিম মিলে মাদ্রাসা চালায়। প্রতিষ্ঠানটি এ দুজনের সামাজিক সম্মান ও টাকা প্রাপ্তির এক ব্যাংকের মতো। তাই মাদ্রাসার অভ্যন্তরে যাই ঘটুক না কেন তা তারা সহসা বাইরে যেতে দেয় না। যেকোনভাবে ম্যানেজ করে নিতে চেষ্টা করে।

কার নাম রেখে কার নাম বলবো! প্রতিটি শিক্ষক (!) ছোট ছোট ছেলে বাচ্চাদের ধর্ষণ করছে, যাকে যেভাবে পারছে। কোন কোন বাচ্চা মারাও যাচ্ছে। অধিকাংশ বাচ্চা এতিম হওয়াতে এসব খুনের কোন বিচার তো দূরে থাক, সেভাবে কেউ জানতেই পারছে না। কোন বাচ্চার কোনো আত্মীয় যদি খোঁজে চলেও আসে, তাহলে এসব মৃত্যুকে ‘বদজ্বীন’ দ্বারা সংঘটিত কাজ বলে রটিয়ে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষকদের (!) শেখানো যৌনশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বড় ক্লাসের ছাত্ররা ছোট ক্লাসের ছাত্রদের নিয়মিত ধর্ষণ করে যাচ্ছে। আবার এসব শিক্ষকই (!) হেলিকপ্টার ওয়াজকারী এলে স্টেজে দাঁড়িয়ে সমকামিতার বিরুদ্ধে তুমুল আওয়াজ তুলে মাঠ কাঁপিয়ে ফেলছে।

প্রতিটি অন্যায়কারী প্রতিজনের দোসর। নশু চৌধুরী, মুহতামিম, গফফর পাটোয়ারি, বদিউজ্জামান, সোহেল,কবীর, মন্টু সব মিলে এক দুষ্টচক্র। শেষমেশ ইয়াবা ব্যবসা ধরা পড়লো, তাও ধর্মীয় গ্রন্থের ভেতরে বহন করে।

এরাই আবার এলাকায় মহিলা মাদ্রাসা করার এক প্রকল্প উদ্বোধন করে, ছেলে বাচ্চারা কেউ যাদের ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, মহিলা মাদ্রাসায় এরা কী ঘটাবে তা ভাবার জন্য খুব বেশি কল্পনা শক্তির প্রয়োজন হয় না।

আমাদের টগর নামের বালকটি শেষ পর্যন্ত ধর্ষণে মারা যায়। মূলত দুর্নীতিবাজদের দ্বারা মাদ্রাসা পরিচালনা আর তাতে নিয়মিত শিশু ধর্ষণের ঘটনা ও ধর্ষণপরবর্তি মৃত্যু নিয়েই বইটি রচিত।

সাহিত্যের মান বিচারে হয়তো বিষফোঁড়া খুব উচ্চমার্গীয় কিছু নয়। বইটি নিষিদ্ধ করা নিয়ে স্বয়ং লেখকের বিরুদ্ধেই নানা গুজব আছে। সেসব একপাশে সরিয়ে কওমী মাদ্রাসার ভেতরের হাল হকিকত বুঝতে এ এক প্রামাণ দলিলের কাজ করবে, সহজেই বলতে পারি।
এ মুহূর্তে কওমী মাদ্রাসাগুলোতে আনুমানিক ৫০ লক্ষ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এসব প্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই বাচ্চাদের জানের কোন নিরাপত্তাও নেই। প্রতিটা শিশুর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ, শিক্ষক, রাষ্ট্র সবার দায়।
পুত্র শিশুরা রক্ষা পাক এই ধর্ষণের হাত থেকে।

আমি বুক রিভিউ দিয়ে আওয়াজ তুললাম আবার।
এই আওয়াজ পৌঁছে যাক সবার কানে।

শেয়ার করুন:
  • 148
  •  
  •  
  •  
  •  
    148
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.