আর কত নারী নির্যাতন? আর কত হ্যারাসমেন্ট?

ফারজানা জলি:

#এদের চিনে রাখা জরুরি#

আসুন আজ আপনাদের সামনে শিল্পীর মুখোশধারী একজন ভয়ংকর নোংরা মানুষের মুখোশ উন্মোচন করি। একটু ধৈর্য্য নিয়ে পুরো লিখাটি পড়ার অনুরোধ রইলো।
নাম- স্মরণ সাহা, সাধারণ সম্পাদক সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সাভার।

জোটের একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে কাজ করতে গিয়ে স্মরণ সাহার সাথে আমার কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় তিন বছরের। এর মধ্যে মাত্র তিনটি ঘটনা আমি শেয়ার করছি…।

এই সেই নিপীড়ক স্মরণ সাহা

স্মরণ সাহার বিরুদ্ধে তারই থিয়েটারের দুজন নারী কর্মী যৌন হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন অনেকদিন যাবত। কিন্তু অভিযোগগুলো হালে পানি পায় করোনা প্যানডেমিক শুরু হওয়ার পর এপ্রিল মাসের দিকে। টানা প্রায় ৮/১০ দিন যাবত সাভারের স্থানীয় অনলাইন পত্রিকাগুলোতে ওই দুই নারী কর্মীর অডিও জবানবন্দিসহ নিউজ হতে থাকে। এই নিউজ, আলোচনা, সমালোচনা সব মিলিয়ে বিষয়টি জোটের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি করে বিধায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সাভার এর সম্মানিত সভাপতি কাদের তালুকদার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য। কিন্তু সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আাসার আগেই স্মরণ সাহা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রয়াণ দিবসে অনলাইনে জোটের ব্যানারে সমন্বয়ক হিসেবে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার ঘোষণা দেন এবং পোস্টার আপলোড করেন।

জোটের সহ-সভাপতি পারভিন ইসলাম এবং আমিসহ আমরা সাতজন সদস্য সভাপতির কাছে লিখিতভাবে একটি আবেদনপত্র জমা দেই। এতে আমাদের দাবি ছিল যেহেতু স্মরণ সাহা’র বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির একটি অভিযোগ উঠেছে এবং যেহেতু সভাপতি একটি তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যেই তৈরি করে দিয়েছেন এবং তারা কাজ শুরু করেছে, সেজন্য তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত এবং এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্মরণ সাহাকে আপাতত সকল কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হোক।
বরং অনুষ্ঠানটি নির্বাহী কমিটির অন্য কোন যোগ্য সদস্য দ্বারা পরিচালনা করা হোক।
কিন্তু আমাদের এই আবেদন আমলে নেয়া হলো না।
এদিকে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কমিটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১১ ই আগস্ট জোট একটি সাধারণ সভার আয়োজন করে। এই সভায় প্রতিবাদ জানিয়ে আমরা সেই সাত সদস্য আমাদের লিখিত আবেদনটি আবারও মৌখিকভাবে উপস্থাপন করি।

তারপর এই সমাজে যা হয় তাই করা হলো…

নারীকে যদি থামাতে হয় তবে তার চরিত্র নিয়ে কথা বলতে হবে, নারীর যদি কোমর ভেঙে দিতে হয় তাহলে তার চরিত্রে কালি লেপন করে দাও…ব্যস…আর কিচ্ছু লাগে না! সব থেকে সহজ পন্থা! দুর্বল চিত্তের হলে সে আর কখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

স্মরণ সাহা এবং তার পক্ষের মানুষেরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে পারভিন ইসলাম এবং আমাকে আক্রমণ করে কথা বলা শুরু করলো। হাস্যকর বিষয় হচ্ছে যে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার মতো কোন যথাযথ বিষয় বা কথা খুঁজে না পেয়ে একজন নারী শিক্ষিকা দাঁড়িয়ে বললেন যে আমার বিরুদ্ধে নাকি তার কাছে লিখিত রিপোর্ট আছে। যদিও সেই সভায়, এমনকি আজ পর্যন্ত তিনি সেই রিপোর্ট দেখাতে পারেননি! যদিও এই নারী শিক্ষিকার ব্যক্তিগত জীবন এবং চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে সাভারের মানুষ এবং তার কলিগরা যথার্থই অবগত।

সভা শেষ হওয়ার পর পারভিন ইসলাম ম্যামকে নিয়ে বের হয়ে আসি। এতো বয়োজ্যেষ্ঠ একজন মানুষ, যার পরম মমতা ও ভালবাসার আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে সাভারের প্রায় সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো, প্রচণ্ড অপমানে সেই মানুষটার চোখের কোনে পানি চিকচিক করছিল! নিতে পারলাম না! ওই মুহূর্তেই আমি সিদ্ধান্ত নেই আমি আর জোট করবো না।
এদের মতো সামান্য ক্ষমতার লোভে এতোটা নিচে নামা, এতোটা অমানুষ হয়ে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
পরের দিনই আমার পদত্যাগ পত্র ডাকযোগে পৌঁছে যায় সভাপতির কাছে।

চলে এলাম জোট ছেড়ে…কিন্তু তাতেও নিষ্কৃতি মিললো কি?

না মেলেনি। ১২ ই আগস্ট আমি জোট থেকে পদত্যাগ করি, ১৯ এ আগস্ট ফেইসবুকে Nadia Khan নামে একটি ফেইক এ্যাকাউন্ট খুলে আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। ফেইক বুঝে আমি এক্সেপ্ট করিনি। এরপর সেপ্টেম্বরের ০৪ তারিখ বৃহস্পতিবার রাত ১.২৫ মিনিটে এই আইডি থেকে ম্যাসেঞ্জারে কিছু স্ক্রিনশট পাঠানো হয়।
স্ক্রিনশট ওপেন করে আমি নির্বাক হয়ে যাই! আমার একটি শাড়ি পরা নরমাল ছবির সাথে একটি মেয়ের ন্যূড ছবি জুড়ে দিয়ে এডিট করে দাবি করা হচ্ছে এটা আমি! যদিও ন্যূড ছবিটিতে মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবুও দাবি করা হচ্ছে এটা আমি!!

এই প্রথম নারী হয়ে জন্মানোটা পাপ মনে হচ্ছিল! এই সমাজে কতো সহজ একটা মেয়েকে অপদস্থ করা!
মুখ দেখা যাচ্ছে না এমন একটা ছবি আমার ছবির সাথে জুড়ে দিয়ে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা যায়, এটা আমি! এবং সেইসাথে এটা অনলাইনে ভাইরাল করার হুমকিও দেয়া যায়!

আমার জায়গায় কোন দুর্বল চিত্তের মেয়ে হলে এই ঘটনার পর সুইসাইডও করতে পারতো। প্রচণ্ড কষ্টে জিদে আমার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছিল। আমি খুব স্পষ্টভাবেই ধারণা করতে পারছিলাম যে এটি কার কাজ!

সেদিনই রাত দুইটার সময় আমি থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। রাত তিনটা নাগাদ জিডি করে বাসায় আসি।
শুক্রবার দিনটা ভয়াবহ টেনশনে পার করে শনিবার সকালেই আমি ঢাকায় সাইবার ক্রাইম অফিসে গিয়ে লিখিত অভিযোগ করি। কিন্তু প্রায় দুই মাসেও সেই তদন্তের কোন কুল কিনারা হয়নি। কারণ আমরা একটি চমৎকার দেশে বাস করি এবং এই দেশের সিস্টেম আরও চমৎকার!

স্মরণ সাহা, যার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

এরপরের ঘটনা দিনকয়েক আগের …
ছোট ভাই নাজমুল হোসাইন এর মোমেন্টওয়ালা থেকে সৃষ্টি ও স্রষ্টা থিমকে কেন্দ্র করে এক্সপ্রেশন বেইসড একটা এক্সপেরিমেন্টাল ফটোশুটে অংশ নেই আমি। ছবিগুলো পূজা উপলক্ষে রিলিজ পায়। ছবিগুলো বিভিন্ন মহলে প্রসংশা কুড়ানোর পাশাপাশি বেশ কিছু আ্যাওয়ার্ডও পায়।
দিন তিনেক আগে থেকে আমার কাছে সাভারের পরিচিতজনদের কাছ থেকে সমানে ফোন আসতে থাকে।

পরে ঘটনা যেটা জানলাম…

আমার ফটোশুটের এই ছবিগুলো স্মরণ সাহা ফটোগ্রাফারের এর অনুমতি ছাড়াই সাভারের প্রায় শতাধিক মানুষকে ইনবক্সে পাঠিয়েছেন! এবং লিখেছেন- নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রীর অশালীন উপস্থাপনের প্রয়াস!

আমার কথা হলো, ছবিগুলো তো আমার ওয়ালে আমি পাবলিকলিই পোস্ট করেছি… তারপরও মানুষকে পার্সোনালি এসব পাঠিয়ে এমন নোংরা নোংরা কথা বলতে কীভাবে পারেন একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক!
যিনি সাভারের সংস্কৃতি চর্চাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন! যার বিরুদ্ধে অলরেডি দুইজন নারী কর্মীর যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে! আর বর্তমানে ননস্টপভাবে আমাকে মানসিকভাবে হ্যারেস করে যাচ্ছেন!

এমন মুখোশধারী নোংরা মানুষের হাতে যে সাভারের সংস্কৃতি পরিচালিত হচ্ছে, সেই সাভারের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ কী? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি শিখবে তার কাছ থেকে? ক্ষমতায় আসীন থাকার জন্য কীভাবে মানুষের পা চাটতে হয় আর কতটা নিচে নামতে হয়, কতটা নোংরামি করা যায়, নারী কর্মীদের কীভাবে অসম্মান-অপদস্থ করা যায়!
ক্ষমতায় থাকলে কীভাবে নারীদের চাইলেই যখন খুশি চরিত্রহীন বানিয়ে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা যায়!

এসব?
এসব শিখবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?
এই দেশের সিস্টেম এর ওপর আর কিভাবে ভরসা করবো?
আজ আপনাদের কাছে বিচার দিলাম…আপনারাই বলেন এভাবে আর কতদিন নারীরা শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতিত হবে?? আর কতওও দিন??
আপনারাই বলে দিন আমার কী করা উচিৎ?

শেয়ার করুন:
  • 224
  •  
  •  
  •  
  •  
    224
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.