নিছক বিবাহিত নয়, সম্মানিত হয়েই বাঁচুন সবাই

মিল্লাত হোসেন:

তালাক নিয়ে বাংলাদেশী মুসলমান পুরুষ-নারীরা কী এক উভয় সংকটে যে ভোগেন! নারীরা তালাক মানতে চান না সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিকূলতা, আর্থিক দুরবস্থা, সন্তান ইত্যাদির দোহাই পেড়ে। তারা তালাকের নোটিশ গ্রহণ করতে চান না, যেনো নোটিশ গ্রহণ না করলে আর তালাক হবে না! এরপর অনেককে কুপরামর্শ ধরে নারী-শিশু, যৌতুক, খোরপোশ-মোহরানা, গার্হস্থ্য সহিংসতা আইন মিলিয়ে স্বামীর পরিবারের সবাইকে জড়িয়ে ০৪টি মামলা করতে দেখা যায়, প্রধানত এগুলো হয় মিথ্যা বয়ানে।

আবার বিয়ের পর মেয়েদের “স্বামী-সংসারই সব” বলে যৌতুকের দাবি, মারপিট-অসম্মান সব সহ্য করে হলেও সংসার করতে চান অনেকেই। উপর্যুক্ত মামলাগুলো করাই হয় স্বামী বা তার পরিবারকে টাইট দিতে অথবা তাদের হাতেপায়ে ধরে-বেঁধে চাকরানির মর্যাদায় হলেও ‘স্বামীর ঘরের ভাত’ খাওয়ার বাসনা থেকে।

অন্যদিকে পুরুষেরা স্ত্রীর দেয়া তালাক মেনে নিতে পারেন না পৌরুষে ঘা খাওয়া ও সমাজে হেয় হওয়ার জুজু থেকে। কোনো কোনো নারী/পুরুষ আবার নিজে তালাক দিলে দেনমোহর দেয়া/পাওয়া নিয়ে ভ্রান্তি ও পুনর্বিবাহ নিয়ে সংকোচে ভোগেন। কী অপরাধে তালাক দিচ্ছো, বলে আর্তি হাজির করেন।

বিয়ের মতো বিচ্ছেদও পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সমঝোতার বিষয়মাত্র। এতে পবিত্রতা বা ঐশ্বরিক কোনো মেলবন্ধন নেই। ভালোই লাগছে না, মনের মিল নেই বা শারীরিক অক্ষমতা কিংবা সন্তান হওয়া নিয়ে সমস্যা হলে সেই সম্পর্ককে আরো কিছু সময়, এক-আধটা সুযোগ দেয়াই যায়। তাতেও যদি ব্যাটে-বলে না মিলে তবে অসুখী সংসার যাপন শুধু ক্ষতিই বয়ে আনে।

কিন্তু গায়ে হাত তোলা, যৌতুক দাবি ও মর্যাদাহানির ক্ষেত্রে অবশ্যই শূন্য সহনশীলতার (zero tolerance) নীতি নিতে হবে। সাথে সাথেই তালাকের কার্যক্রম ও ফৌজদারি মামলা শুরু করতে হবে। নিরাপত্তা-সম্মান না থাকলে জোর করে একত্রে থাকাটাই শাস্তির মতো। স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, দু’পক্ষের আত্মীয়স্বজন, পড়শি সবার জন্যই তাই।

তালাক হলে সন্তানদের ক্ষেত্রে কার কী দায়িত্ব ও অধিকার- তা দেশের আইনে পুরোপুরি নির্ধারিত হয়ে আছে। তাই নির্ভয়ে সামাজিকতার বেড়াজালকে ছিন্ন করাই যায়, চাইলে।

যে সমাজ নরনারীর অসুখী মনের খবর নিতে জানে না; মজলুমের আর্তি আর মানবিক প্রয়োজন বুঝে সম্মানজনক প্রতিকার দিতে পারে না- সেটা নষ্ট ও ব্যর্থ সমাজ। একে বিলুপ্ত হতে দিলেই বরং উন্নততর মূল্যবোধসম্পন্ন নতুন সমাজ দ্রুত গড়ে উঠতে সহায়ক হবে।

এখন কেবল রাষ্ট্রেরই একটা দায় অবশিষ্ট থাকলো। তালাকের পর দম্পতির “বিবাহ বলবৎকালীন সময়ে” অর্জিত সম্পত্তির ন্যায়সঙ্গত আনুপাতিক ভাগবাটোয়ারা করার জন্য রাষ্ট্রকে দ্রুত একটা আইন প্রণয়ন করতে হবে।

মুসলিম তালাকের ক্ষেত্রে যেটা মৌলিক সমস্যা- দম্পতির সম্পদ ভাগাভাগি, সেখানে কেউই হাত দিতে চাইলো না। এ কারণে ৫০ বছর সংসার করার পরও একজন মুসলিম নারীকে হয়তো ৫০ বছর আগের কাবিনে লেখা ২০ হাজার টাকা দেনমোহর ধরিয়ে দিয়ে তিন তালাক দিয়ে দেয়া যায়। এ কেমন ইনসাফ!

কিন্তু দেখুন অন্যান্য দেশে যেখানে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের চর্চা আছে, সেখানে কিন্তু কেউ পার পেতে পারে না। উদারহণ দিই, আমাজনের মালিক জেফ বেজোস এমন বে-ইনসাফি করতে পারেন নাই। তাকে ২৫ বছর ধরে ঘর করা বউকে তালাক দেয়ার পর প্রাক্তন স্ত্রীকে ৩৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার দিতে হয়েছে!

হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খানের বহুল-চর্চিত তালাক উদাহরণ হিসাবে নিলে অবস্থাটা আরও পরিস্কার হবে। ২৭+ বছর সংসার করার পর তাদের তালাক হয়। এই সময়েই চার সন্তানের জন্ম-বেড়ে উঠার পাশাপাশি হুমায়ূন সুপারস্টার হয়ে উঠেন। সম্পদের ভাগাভাগির ন্যায্য হিসাব হলে হুমায়ূনের বই-সিনেমা-নাটক-সঙ্গীতের রয়াল্টি আর অন্যান্য ধনসম্পদের কমপক্ষে ৬০% পেতেন গুলতেকিন। বাস্তবে ৬০% এর তুলনায় অনেকটা মুফতেই হুমায়ূন তালাক দিয়ে পার পেয়েছিলেন বলেই মনে হয়।

মুসলিমদের তালাক নিয়ে ঠিক এইখানে যদি কোনো আইনগত পরিবর্তন আনা না যায়, তবে আর যাই করা হোক না কেনো, পুরোটাই লোকদেখানো ঢপের চপ, সোজা কথায়- ধাপ্পাবাজি।

তাই বলছিলাম যে নিছক বিবাহিত নয়, সম্মানিত হয়েই বাঁচুন নরনারীগণ।

লেখক: বিচারক

শেয়ার করুন:
  • 972
  •  
  •  
  •  
  •  
    972
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.