নারীর প্রতি সহিংসতা বনাম নারী লেখকের জন্ম!

কাজী তামান্না কেয়া:

আমি এমন এক সমাজে ও রাষ্ট্রে জন্ম নিয়েছি এবং বেড়ে উঠেছি যেখানে ১৫-২৫ বছর বয়সী ৬৩ ভাগ ছেলে মনে করে নারীকে পেটানো জায়েজ আছে। সূত্র-ডেইলি স্টার।

সেক্সুয়াল এনড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ রাইটস, সংক্ষেপে SRHR আমার দীর্ঘদিনের লেখাপড়া এবং গবেষণার বিষয়। এমন একটা সার্ভে রেজাল্ট আজ যখন ডেইলি স্টার প্রকাশ করলো, তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলাম। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার গ্রাম এবং শহরে এই সার্ভেটি পরিচালনা করা হয়েছে ব্র‍্যাকের পাবলিক হেলথ স্কুলের মাধ্যমে। ডাচ গভর্নমেন্টের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণাটি যে যা তা কোনো গবেষণা নয়, বরং গবেষণা পদ্ধতি পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে পরিচালিত একটা কাজ, সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। আসুন এই সার্ভে থেকে প্রাপ্ত আরো কিছু তথ্য দেখে নেই।

অংশগ্রহণকারী ৬৩% ছেলে মনে করে যৌন সঙ্গমে যেতে না চাইলে নারীকে পিটানো উচিত। ৩০℅ ছেলে মনে করে যেসব মেয়ে ধূমপায়ী কিংবা মদ্যপান করে, তারা যৌন সঙ্গমে সহজলভ্য। ২৮℅ ছেলে যৌন অসুখের জন্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ আস্থার অভাব এবং জ্বীন পরী বা খারাপ কোন কিছুর নজর লাগাকে দায়ী মনে করে।

গবেষণার ফলাফল পড়তে গিয়ে বার বার কেবল মনে হচ্ছিল, মার্কিন যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিতে আমি কাজ করতাম, আমাদের প্রতিষ্ঠানসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে বারবার সেক্স এডুকেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। স্কুল পর্যায়ে এই কারিকুলাম চালু করতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবার আমাদের পলিসি মেকাররা, রাজনীতিবিদরা একটাই যুক্তি দিয়েছেন–আমরা মুসলিম প্রধান দেশ, সেক্স এডুকেশন দিয়ে আমাদের কাজ নেই, আমরা এমনিতেই সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ মেনে চলি।

মাননীয় পলিসি মেকাররা, আপনারা কি জানেন, ১৫-২৪ বছর বয়সী ছেলেদের মন পরিপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল নারীর প্রতি ভালবাসায়, সহযোগিতায় এবং সহমর্মিতায়? এই কিশোর-তরুণ ছেলেগুলি বিশ্বাস করছে সেক্সের প্রয়োজনে নারীর গায়ে হাত তোলা জায়েজ! কী সাংঘাতিক একটা ধারণা নিয়ে তারা বেড়ে উঠছে, ভেবে দেখেছেন?

আচ্ছা, শুধু কি নারীর জীবন এই দেশে বিপন্ন? উত্তর হলো, না। আমার দেশে মাত্র ৫০ বছর আগেও তিনভাগের এক ভাগ লোক ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এখন আছে ৫% বা তারও কম। এরাও দেশ ছাড়তে চায়, শুধু সময় আর সুযোগের অপেক্ষায় মাটি কামড়ে পড়ে আছে। আমার দেশের বেশিরভাগ আদিবাসীর জীবন নরকের সমতুল্য, তারা হাসতে ভুলে গেছে, গাইতে ভুলে গেছে। এখানকার কাদিয়ানী, শিয়া, আহলে হাদিস– তারাও ভালো নেই, মুসলমান রাষ্ট্রে, প্রতি মুহূর্তে ভয় পায়, এই বুঝি কেউ মেরে ফেলতে আসছে।

এমন সমাজে বেড়ে উঠে আমি হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট এবং লেখালেখি করা ছাড়া আর কী করতে পারতাম? এই যে মুমিনরা সকাল-বিকাল আইডি হ্যাক করতে চায়, আইডি বন্ধ করে দিতে চায়, সাইবার বুলিয়িং করে, টাকা খেয়ে লেখার অপবাদ দেয়, এসাইলাম পাওয়ার জন্যে লিখি টাইপ দোষারোপ করে, তারা কি জানে কত শত মেয়ে হাতে কলম তুলে নিয়েছে? কত শত মেয়ে কথা বলতে চেয়েও পারছে না, কিন্তু একদিন ঠিকই পারবে! ফিনিক্স পাখির ছাই থেকে যেমন নতুন ফিনিক্সের জন্ম হয়, তেমন করে মেয়েরা উঠে আসবে কলম হাতে! শুধু সময়ের অপেক্ষা। ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধই নারীশক্তিকে দমাতে পারবে না, আজ বলে দিলাম। অতীতেও পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না।

আমি তামান্না কেয়া না লিখলে কিচ্ছু যাবে আসবে না। আমার অস্তিত্ব ক্ষুদ্র কণামাত্র। আমি সুদীর্ঘ কাল বাঁচার আকাঙ্খাও করি না। এমনকি কাল মরে গেলেও আমার কোন দু:খ নেই। আমি হাসি মুখে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত, অলিরেডি অনেক বছর বেঁচে ফেলেছি।

চলে গেলে কিচ্ছু খোয়া যাবে না। কিন্তু যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ পর্যন্ত নারীর উপর এবং দুর্বলের উপর (ইসলাম এবং অন্যান্য) ধর্মের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে যাবো। পুরুষতান্ত্রের দোষ দেওয়ার আগে ধর্ম কীভাবে পুরুষতন্ত্র তৈরি করে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাবো। রাষ্ট্রের যেসব পলিসি ধর্মের পেছন পেছন হাঁটে তা লিখে যাবো, সমাজ-পরিবার কীভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদ জিইয়ে রাখে তা লিখবো এবং সর্বোপরি ধর্ম কীভাবে খুনি-ধর্ষক তৈরি করে, তা লিখবো।

চাপাতিতে নাহি ভয়!
হবেই হবে জয়!

লেখক পরিচিতি:
Kaji Tamanna Keya, MS, MPS
Doctoral candidate
Arnold School of Public Health
University of South Carolina, USA

শেয়ার করুন:
  • 895
  •  
  •  
  •  
  •  
    895
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.