জাত-ধর্ম যাই হোক, রক্তের রঙ কিন্তু লাল!

জিনাত নেছা:

একজন শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে জানে না সে হিন্দু নাকি মুসলিম নাকি খ্রিস্টান নাকি বৌদ্ধ নাকি অন্য কোন ধর্মাবলম্বীর। তাকে ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধর্ম শিক্ষা দেয়। জানানো হয় তোমার ধর্ম এইটা, তোমার সৃষ্টিকর্তাকে এইটা বলে ডাকতে হবে। তোমাকে এভাবে প্রার্থনা করতে হবে। শিশুটি কিন্তু এগুলো জেনেই বড় হতে থাকে।

ধীরে ধীরে শিশু থেকে কিশোর তারপর যুবক, বৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এরই মাঝে কারো ভেতরে ধর্মের প্রতি বিশ্বাসের প্রকটতা দেখা দেয়। আবার কারো মাঝে এই প্রকটতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতাও দেখা যায়। এর কারণ হলো আপনি দর্শন পড়ছেন, আপনি ইতিহাস চর্চা করছেন, যুক্তি দিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে থাকে। আপনি আপনার জীবনকে আপনার পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিচালনা করতে থাকেন। তাতে কিন্তু অন্যের কোন ক্ষতি হচ্ছে না। কিংবা আপনি অন্যকে প্রভাবিতও করছেন না আপনার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা। এতে আপনি নিজে যেমন শান্তিতে আছেন, অন্যকেও শান্তিতে রেখেছেন। আমি বিশ্বাস করি এটাই আসল ধর্ম, মানবতার ধর্ম।

এখন আসেন ধর্ম শব্দের অর্থ কী? প্রতিটি ধর্মের মূল অর্থ কী? বিশ্বাস, শান্তি, মানবতা। তাই নয় কি!
তাহলে আপনি যদি হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী হোন, অন্য ধর্মের কারো কি উচিত নয় আপনাকে এবং আপনার ধর্মকে সম্মান করা? ঠিক প্রতিটা ধর্মের ক্ষেত্রেই আমি মনে করি তা প্রযোজ্য।

একজনকে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য যেমন আঘাত করা অন্যায়। ঠিক তেমনি বলপূর্বক অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত করাও অন্যায়। বড়জোর আপনি আপনার ধর্মের দাওয়াত দিতে পারেন। আপনার ধর্মের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিন্তু জোর করতে পারেন না। একটা ধর্মের পথপ্রদর্শকের কার্টুন পোস্টারিং করে যেমন কারোর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আপনি দিতে পারেন না, ঠিক তেমনই একজন নন-বিলিভারকেও জোরপূর্বক তার সেট অফ বিলিফসে আঘাত করতে পারেন না। এটা অপরাধ। তাকে ধার্মিক করার অপচেষ্টাও অস্বস্তির। আপনি তাকে গঠনমূলক যুক্তি দিতে পারেন, শাস্তি দিতে পারেন না।

কোন ধর্মই জুলুমের নয়, অন্যায়ের নয়। জোর করার জন্য নয়। জোরাজুরি, চাপাচাপি করে ধর্ম চাপিয়ে দেয়া যায় না, বরং এটা আপনার ধর্মের সাথে অন্যায় করা হয়। কোন ধর্মই অন্যায় অত্যাচার যন্ত্রণা কষ্ট, জুলুমকে সমর্থন করে না। তাহলে সেইটাকে আমি অন্তত ধর্ম বলি না। ক্ষমতার অপব্যবহার বলি। আর এইটাই আমার “সেট অফ বিলিফস”।

লালমনিরহাটে আজ সন্ধ্যায় এক যুবককে নারায়ে তাকবির বলে পিটিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। যে পোড়ানোতে শত শত মানুষ অংশ নিয়েছে। এটাকে কোন ধর্ম বলে প্লিজ কেউ কি একটু বলবেন? যেখানে প্রতিটি ধর্মের মূলকথা জীবন হত্যা মহাপাপ কিংবা জীবন বাচানো ফরয।

পার্বতীপুরে ১৬ বছরের এক হিন্দু কিশোরীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে গেছে উন্মত্ত জনতা। এইটুকুন একটা মেয়ে, সেও নাকি ধর্ম অবমাননা করেছে!  মেয়েটা হিন্দু ছিলো বলেই এই সাহস দেখালো সবাই? এই নির্মমতা হলো ওর সাথে? এই বর্বরতা? জানি না মেয়েটি এবং তার পরিবার এখন কেমন আছে! কিন্তু প্রতিটি ধর্মেই শুধু নারী কেন, প্রতিটা মানুষকে সম্মান দেবার কথা বলা আছে!

ঢাকার পল্লবী থানা থেকে তিথি সরকার নামের একজন নারীকে গুম করা হয়েছে। তিথি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বেশ কিছুদিন নিউজ দেখছিলাম সে নাকি মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করেছে এবং তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এতো এতো ঘটনা কি নিছকই কোন ঘটনা? কোন যোগসূত্রতা নাই? বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ধর্ম ইসলাম হলেও এই দেশনেত্রীই কিন্তু ঘোষণা করেছেন যে এই দেশ অসাম্প্রদায়িক। এ কেমন নমুনা অসাম্প্রদায়িকতার! যেখানে আমি আমার ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করতে পারবো না!

আপনি আপনার ধর্মের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, সুন্দর সুন্দর বাণী দিচ্ছেন, কিন্তু আমি আপনার যুক্তি মানতে বাধ্য নই, আমার কাছে অন্য যুক্তি আরো ভালো মনে হতেই পারে। মনে হতেই পারে আপনার ধর্মে কন্ট্রাডাক্টরি আছে। আমি মানি না আপনার ধর্ম।
তাই বলে আপনি আমায় পুড়িয়ে মারবেন, আপনি আমায় জেলে দিবেন, গুম করে দিবেন, ধর্ষণ করবেন? এই যে উপরের কাজগুলো করছেন এগুলো কি আপনার ধর্মানুযায়ী ঠিক, বৈধ? আপনার ধর্মে কি লেখা আছে কেউ যদি আপনার ধর্মের দাওয়াত গ্রহণ না করেন তাকে পুড়িয়ে মারবেন? গুম করবেন? হত্যা করবেন??

আপনার কি মনে হয় এগুলো কেবল ধর্মকে ভালোবেসে হত্যা, গুম, বলপ্রয়োগ? এই বলপ্রয়োগ মারামারি চাপাচাপির সাথে ক্ষমতা জড়িত নয়, প্রভাব বিস্তার জড়িত নয়, স্বার্থ জড়িত নয় কি! মোদ্দাকথা একে ধর্ম বলে না। এই মারামারি, খুনোখুনি সম্পর্কিত যে মাসালা আপনারা পড়েন বা জানেন তার বেশিরভাগই ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা তৈরি কৃত। এই দেশ থেকে ব্লগাররা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পাড়ি দিচ্ছে বা দিয়েছে অন্য দেশে। আল্লাহ আকবর রব তুলে মানুষ পুড়িয়ে মারলেন, কত কত ব্লগার হত্যা করলেন, মানুষ হত্যা করলেন এর দায় কে নেবে? আল্লাহর কাছে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াতে পারবেন তো?

অমি জিনাত ধর্মে বিশ্বাস করি না, তা নয়। তবে আমারও কিছু বিষয়ে কনফিউশান বা কনট্রাডিকশন আছে। এই কনফিউশানগুলো নিয়ে কেউ সুন্দর গঠনমূলক আলোচনা করবে না! বরং নাস্তিক আখ্যায়িত করে একরোখা একগুঁয়ে আলোচনা করবে। লেইম লেইম অযৌক্তিক আধ্যাত্মিক, মধ্যযুগীয় যুক্তি দাঁড় করাবে নতুবা একদিন ঠিকই কট্টর উগ্রবাদী কেউ পুড়িয়ে মেরে ফেলবে আমাকে। কিন্তু আমি পাক্কাপাক্কি ধর্মে বিশ্বাস করি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়ি। কোরান পড়ি। সাথে অন্যের ধর্মকে সম্মান করি। তেঁতুল হুজুরকে ঘেন্নাও করি। নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসও করি। ধর্মে বিভক্ত না করে মানুষকে মানুষ ভাবি, বিশ্বাস করি চামড়া কাটলে যে রক্ত বেরুবে তা লাল জাত- পাত, বর্ণ নির্বিশেষেই লাল!!

জিনাত নেছা
নৃবিজ্ঞানী ও উন্নয়নকর্মী।

শেয়ার করুন:
  • 322
  •  
  •  
  •  
  •  
    322
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.