পুরুষেরও পর্দা করতে হবে

জেসমিন বন্যা:

পর্দার কথা উঠলেই মেয়েদের পর্দার কথা মনে হয়। কিছুদিন ধরে দেশে কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের পোশাক নিয়ে কথা উঠেছে, পর্দা প্রথার গুরুত্ব নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার বিষয়বস্তু মেয়েদের পর্দা না করা। কিন্তু সবাই ভুলে যান বা মনে করতে চান না যে ইসলামে পুরুষের পর্দার কথাও বলা হয়েছে।

মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরানে সুরা আন-নুর এর ৩০ নং আয়াতে নারীদের পর্দা প্রথার আগে পুরুষের পর্দার কথা বলেছেন, পুরুষের চোখ/নজর হেফাযত করার নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে,
“(হে নবী); মুমিন পুরুষদেও বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে, এবং পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তৎ সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।”

ইসলাম মতে, পুরুষের চোখ শুধুমাত্র তার নিজের স্ত্রীর সৌন্দর্য দর্শন করার অনুমতি পায়। বুবায়দা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার হজরত আলীকে (রা.) বলেন, “হে আলী, তুমি দৃষ্টির পর দৃষ্টি ফেল না। হঠাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে যে দৃষ্টি পড়ে তার জন্য তুমি ক্ষমা পাবে। কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য বৈধ নয়।” (আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, দারেমী, মিশকাত, ৩১১০)। আদৌ কোন পুরুষ এটা মনে রাখে! কখনও কাউকে দেখিনি মাটির দিকে তাকিয়ে হাটতে বা তাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। বরং রাস্তায় বের হলে কিছু মানুষ দেখা যায় তারা যেন নারীদের দেখতেই রাস্তায় বের হয়েছে। কিংবা রাস্তায় চলাচল করা মেয়েদের বিরক্ত বা উত্যক্ত করাটাই তাদের লক্ষ্য। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার কারণে ছেলেরা/পুরুষেরা এটা অপরাধ মনে করে না। কারণ পরিবার/সমাজে যেভাবে মেয়েদের পর্দা করাটা শিক্ষা দেয়া হয় ছেলেদের পর্দাকে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা দেয়া হয় না। যদিও ধর্মীয় দৃষ্টিতে পর্দা উভয়ের জন্য। ফলে ছেলেরা পথে ঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করাটাকে তেমন অপরাধ মনে করে না। সমাজও এ ধরনের ঘটনায় ছেলেদের অপরাধ খুঁজে পায় না। বরং মেয়েদের পর্দা না করার অপরাধ খুঁজে পায়।

মানুষ পোশাক পরবে। আবহাওয়া অনুযায়ী পোশাক পরবে। যে পোশাক আরামদায়ক ও শালীনতা বজায় রাখে সে পোশাক নিয়ে কোন কথা ওঠার কথা না। কিন্তু পোশাক/সাজসজ্জা শুধু মেয়ে নয় ছেলেদেও জন্যও প্রযোজ্য। যেমন: ছেলেরা লম্বা চুল রাখবে, আটসাট পোশাক পরে শরীর প্রদর্শন করবে ইসলাম তা অনুমোদন করে না। ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে পর্দার কথা যখন আসছে, ছেলে মেয়ে উভয়েরই তা পালন করা উচিৎ।
একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তবে যেমনটা হচ্ছে, বিষয়টা ঠিক পর্দার সমস্যা না। সমস্যাটা অন্যত্র, সুবিধাভোগী মানুষগুলো কখনোই বি ত মানুষকে উচ্চাসনে বা সমপর্যায়ে দেখতে অভ্যস্ত নয়। যেমন মানুষ আপন কর্মচারী বা সাহায্য গৃহীতাকে সব স্বাধীনতা দিতে চান না। কারণ তার মধ্যে মালিক মালিক ভাব বিরাজমান। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অন্ধকারের কারণে এরকম একপাক্ষিক ধারণা বিকশিত হয়েছে।

পরিবার থেকে শুরু করে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার ধ্যান ধারণাও মেয়েদের ব্যপারে নেতিবাচকভাবে গড়ে উঠছে। ধরা যাক, পরিবারের কন্যা সন্তানটি একটু জেদি, আদরের সুরেই বলা হবে “মেয়েদের এতো জেদি হতে নেই মা।” আর ছেলেদের বেলায়! তখন বক্তব্য “ছেলেদের জেদ না থাকলে মানায় না।” ছেলে মেয়ের কাজও ভাগ করা, এমনকি খেলনাও আলাদা। সবক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে এটা বুঝিয়ে দেয়া “তুমি মেয়ে, তুমি মানুষ থেকে একটু কম, অসম্পূর্ণ।” এবং অন্য কেউ মানুক আর না মানুক তোকে মানতেই হবে তুই যে নারী।

নারী, সমাজের যত বড় আসনেই থাকুক, তার অবস্থান তার বরের উপর নির্ভরশীল। বরের চাকরি, পারিবারিক স্ট্যাটাসই নারীর স্ট্যাটাস। শ্বশুরবাড়িতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে না পারলে জীবনের কোন মানে নেই। অনেক অন্যায় হলেও বলবে “শ্বশুরবাড়িতে তো একটু অত্যাচার সইতেই হবে।” বিপরীতে ছেলেকে শিখানো হয় শক্ত হওয়ার জন্য, “শ্বশুর বাড়িতে গলে পড়িস না।”

অনেকেই হয়তো বলবেন, “আমার পরিবার ব্যতিক্রম।” আমি বা আমার অনেক বন্ধু স্বাধীন। আমার বর আমাকে সাহায্য করে। ধরুন, আমাকে, ছেলে মেয়েকে খাওয়াতে, ঘরের কাজে, রান্নার কাজে সাহায্য করছে। আমার মতামতের গুরুত্ব দিচ্ছে। বাড়ির লোক, পাড়া পড়শী তো আমার বরকে কেউ কেউ ভেড়া বলে ফেলে, কারন সে আমার কথার গুরুত্ব দিচ্ছে। পুরুষত্ব বলতে কিছু নেই। বউ এর কথায় তাল মিলিয়ে চলে।

অন্যদিকে একই বৈশিষ্ট্যের জন্য আবার কেউ কেউ তো তাকে দেবতা বা ফেরেশতাও বলে ফেলেছেন। সংসার জীবনে এই সামান্য সহযোগিতায় পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ মানব খ্যাতি অর্জনটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়। সংসার দুজনের। কাজ ভাগাভাগি করে করলে পৃথীবিটা অশুদ্ধ হওয়ার কথা না। পরিবারে ছেলে মেয়ে যে যেকাজে আগ্রহী তাকে তাই দেয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো পরিবারে ছেলে মেয়ের কাজ আলাদা করে শেখানো হয়। স্বামী স্ত্রীকে সহায়তা করলে সে হয়ে যায় দেবতা বা ফেরেশতা।

আমি বা আমরা মানে নারীরা অনেক অনাকাঙ্খিত ও অনভ্যস্ত কাজ করি প্রতিদিন কিন্তু সেটা স্বাভাবিক কেন? নারীদের জন্য কোন জয়সূচক শব্দ নেই। আবারও বলছি সংসার দুজনের, সন্তানও দুজনের। কিছুই বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসিনি। সন্তান লালন পালন করার দায়িত্বও দুজনের। বরং ছেলেরা একটু বেশি করবে। কারন দশমাস সব যাতনা মেয়েটিই সহ্য করে।

একটু মনে করিয়ে দেই, এক সময়ে বার বার মেয়ে সন্তান জন্মালে পুরুষরা দ্বিতীয় বিয়ে করতো, ছেলের বাবা হওয়ার জন্য। আজ আমরা জানি সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার জন্য নারী দায়ী নয়, পুরুষ দায়ী। তাহলে এখন, “ছেলের মা হতে পারবো না তাই তোমার ঘর করছি না।” এটা বলে কোন নারী যদি সংসার সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয়; তাহলে কিন্তু রি রি পড়ে যাবে। যত ধরনের কালিমা লেপন মেয়ের কপালে জুটবে।
অনেক সময়ই বলতে শুনি, “ভাই, আমার ছেলেটা না একেবারে স্ত্রৈণ, বউ ছাড়া কিছু বোঝে না।” এমনটা ভাবা উচিৎ না, হওয়াও উচিৎ না। বউ মানে প্রতিপক্ষ না। বউ ভালো পরামর্শ দিতে পারে। সংসারে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। খারাপ যে, সে সব সময়ই খারাপ, সেটা ব্যতিক্রম। সেটা বাদ দিয়ে বধুকে/নারীকে তার যোগ্য মর্যাদা প্রদান করতে হবে।

সবাইকে যোগ্য সম্মান দিতে হবে। যার যে যায়গা সেটা দিতে হবে। অনেক সন্তানকে দেখি কত পড়াশুনা করছে, অনেক সার্টিফিকেট! কিন্তু নিজের মাকে মানুষ মনে করে না। মাকে সর্বদা আদেশ/নির্দেশ এর উপর রাখে। অনেকটা কেনা দাসীর মত আচরণ করে মায়ের সাথে। মায়ের কাজকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে। এটাও পরিবারেরই শিক্ষা। বাবার ক্ষমতাধরী শিক্ষা। মাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিতে জানতে হবে। সন্তানকে শিখাতে হবে।
সবার আগে প্রয়োজন সমানুভূতিশীল হওয়া। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও বিশ্বাস স্থাপন করা, হক আদায় করা। নারীকে অসম্পূর্ণ নয়, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করতে পারলে, ধর্মীয় অনুশাসন আংশিক/একপেশে হয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করলে পর্দা সমপর্কে প্রচলিত ধারণা পাল্টাবে। নারী পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। সমাজ জীবনে শান্তি শৃঙ্খলা বিরাজ করবে।

চলুন নিজেকে বদলাই। নিজের একপেশে সীমাবদ্ধ চিন্তাধারাকে বদলাই। তবেই সমাজ বদলাবে।

 

(উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত)

শেয়ার করুন:
  • 539
  •  
  •  
  •  
  •  
    539
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.