বয়কটের হিপোক্রেসি এবং ফেসবুকিয় বয়কট

প্রভাত নাজমী:

বিশ্বের প্রতিটি দেশ একে অন্যের উপর কম-বেশি নির্ভরশীল। ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ অনেক বিষয়েই একটা দেশের সাথে আরেকটা দেশের একাধিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক চলমান থাকে। নানাবিধ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এক বা একাধিক বহুপাক্ষিক চুক্তির অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা একটা রাষ্ট্র চাইলেই বাতিল করতে পারে না। তাই বর্তমানে কোন দেশকে পুরোপুরি বয়কটের বিষয়টি হাস্যকর ও অযৌক্তিক। আর আমাদের মতো অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে একটা উন্নত দেশকে বয়কট আরো কঠিন ব্যাপার। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কিংবা আন্তর্জাতিক আইন সম্বন্ধে সম্যক ধারণা রাখেন; এমন কাউকেই আজ পর্যন্ত কোন দেশকে বয়কটের পক্ষে কথা বলতে শুনি নাই ৷

একজন বিবেকবান মানুষ এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনি অবশ্যই যে কোন অন্যায় ও অপরাধের প্রতিবাদ করবেন। মানুষ প্রতিবাদী হলে সমাজে অন্যায়-অবিচার হ্রাস পায়। নিজ নিজ অবস্থান থেকে অনেকভাবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সম্ভব। প্রতিবাদের ধরন ও ভাষা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। তবে তা কোন দেশকে বয়কট করে নয়৷ ফ্রান্স যে কাজটি করেছে, তা তাঁদের দেশের মানবাধিকারের সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে কোন অপরাধ নয়। বরং যিনি ঐ শিক্ষকের গলা কেটেছেন তা ফৌজদারি অপরাধ। অপরদিকে মুসলমানদের সবচে স্পর্শকাতর অনুভূতি হচ্ছে ধর্মানুভূতি। ফ্রান্স সমগ্র মুসলমানের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। সে হিসেবে ফ্রান্স অপরাধী। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের আরও সহনশীল ও নমনীয় হওয়া দরকার ছিল। তবে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই, আমাদের কাছে যা প্রবল অনুভূতির বিষয়, তা অন্যদের কাছে এবং অন্য সংস্কৃতিতে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে।

আগেই বলেছি মুসলমানদের সবচে স্পর্শকাতর অনুভূতি হচ্ছে ধর্মানুভূতি। মুসলমানগণ ধর্ম মানুক আর না মানুক, ধর্মের অত্যাবশ্যকীয় অনুশীলনসমূহ পালন করুক না করুক, ধর্মানুসারে সঠিকভাবে জীবন পরিচালনা করুক আর নাই করুক; ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগলেই হলো! ইউটিউবে আমাদের দেশের অনেক মোল্লা-মাওলানার অসংখ্য ওয়াজের ভিডিও আছে, যেখানে হিন্দু ধর্মের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। হিন্দুদের মুর্তিপূজা নিয়ে অজস্র নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। হিন্দুদের দেব-দেবীদের নিয়েও নানারকম বিদ্রুপ করা হয়েছে। অন্য ধর্ম নিয়ে হাসি ঠাট্টা করার সময় আমরা রীতিমতো ভুলে যাই ধর্মানুভূতি শুধুমাত্র মুসলমানেরই একচ্ছত্র সম্পদ নয়। ধর্মানুভূতি মুসলমানের পৈতৃক সম্পত্তিও নয়। নিজের ধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে অন্যের ধর্মকে ছোট করে কথা বললে অন্যদের ধর্মানুভূতিতেও আঘাত লাগে। সে হিসেবে তাঁরাও আমাদের কল্লা কাটার অধিকার রাখে!

জাতি হিসেবে আমরা মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী না। আমরা মানুষের কন্ঠরোধে বিশ্বাসী। সভ্য ও কল্যাণকর রাষ্ট্রে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে। সে স্বাধীনতায় সাধারণত সীমা থাকে না। আমাদের দেশে এ অধিকারটি কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে সেটি জাদুঘরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোন মুসলিম রাষ্ট্রেই গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত না।

ইসলামিক রাষ্ট্রসমূহ যেহেতু গণতন্ত্র ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী না, সেহেতু মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় নির্দিষ্ট সীমারেখা টানতেই তাঁরা ঐতিহাসিকভাবেই অভ্যস্ত। আপনি ইউরোপের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যিশু খ্রিস্টের সমালোচনা করে তাঁর চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ফেললেও কেউ আপনাকে আঘাত করতে আসবে না। এখানকার মানুষজন বিশ্বাস করে যিশু খ্রিস্টের সমালোচনা করলে কিংবা তাকে ব্যঙ্গ করে কোন কথা বললে তাঁর ন্যুনতম সম্মানহানি হয় না। এরা মনে করে যিশু খ্রিস্টের সম্মান এতোটা ঠুনকো নয় যে কেউ তাকে অসম্মান করলেই তাঁর অবস্থান নিচে নেমে যাবে। বরং যিশু খ্রিস্টও যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় এবং তাঁর কর্মের সমালোচনা করাও যে মানুষের অধিকার, এটা তাঁরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।

উইঘুর মুসলমানদের নির্যাতনের প্রতিবাদে বাংলার তৌহিদী জনতা বহুবার চীনকে বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে, চীনা পণ্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে৷ তবে তা প্রকৃতপক্ষে কোনকালেই সম্ভব হয়নি৷ গৃহস্থালির অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে হাতের মোবাইল ফোন, কাজের ল্যাপটপ- সবই মেড ইন চায়না৷ চাইনিজ পণ্য ছাড়া জীবন অচল৷ পুরোপুরি অচল৷ চীন যদি ফ্রান্সের মতো কাজ করে বসে, তাহলে তো চীনা পণ্য বর্জন করে আমাদের সবাইকে বনবাসে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আমেরিকা ও ইসরায়েল মুসলমানদের সবচে বড় শত্রু। এরা দুনিয়ার সব কাজ ফেলে সারাদিন শুধুমাত্র মুসলমানের পেছনে লেগে থাকে। মুসলমানদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করাই এদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য! ফ্রান্স যে ঘৃণ্য কাজ করেছে, একই ধরনের কাজ অথবা তার চেয়ে খারাপ কাজ যদি দুদিন পরে আমেরিকা করে, তাহলে নিশ্চয়ই বাংলার তৌহিদী জনতা আমেরিকাকে বয়কট করবে। তৎক্ষণাৎ আমেরিকান পণ্য বর্জন করবে। বাংলার ধর্মপ্রাণ ভাই-বোনেরা নিশ্চয়ই ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপসহ সকল আমেরিকান পণ্য চিরতরে বর্জন করবে। উইন্ডোজ চালিত ল্যাপটপ ছুঁড়ে দিবে, অ্যাপেলের ল্যাপটপ ভেঙ্গে ফেলবে, আইপ্যাড-আইফোন ফেলে দিবে অবলীলায়। আমেরিকাকে গালি দেয়ার জন্য, চরম অভিশাপ দেয়ার জন্য, নিজেদের প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তনের জন্য কিংবা কোন চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রয়োজনে নিশ্চয় ফেসবুকই স্পর্শ করবে না বাংলার অনুভূতিশীল মুমিন-মুমিনাগণ।

ছোট্ট একটা তথ্য দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে রপ্তানি হয়েছে ২.৪ বিলিয়ন ইউরো, বিনিময়ে ফ্রান্স থেকে আমদানি মাত্র ১৯১ মিলিয়ন ইউরো সমপরিমাণের পণ্য। বর্তমানে ফ্রান্সে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ইউরো, আমদানি ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর কম। ফ্রান্সে রপ্তানির ৯০ ভাগই গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল পণ্য, যার সাথে জড়িয়ে আছে বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান।

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্র ইয়েমেনকে ধ্বংস করে দিলেও আমাদের দেশের কোন সাচ্চা মুসলমানকে কখনো বলতে শুনি নাই- বয়কট সৌদি আরব। বয়কট সৌদি পণ্য! আসলে কোন দেশের পণ্য বর্জন এবং সে দেশকে বয়কটের গর্জন শুধুমাত্র ইহুদিদের তৈরি ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ৷ আর এ ধরনের ফেসবুকীয় হিপোক্রেটিক বয়কট ধর্মান্ধের কাজ, প্রকৃত ধার্মিকের নয়৷ একজন ধার্মিকের কাছে তাঁর ধর্ম যতটা নিরাপদ, ধর্মান্ধের কাছে ধর্ম ঠিক ততটাই অনিরাপদ।

আমরা যখন ফ্রান্সকে বর্জনের গর্জন দিচ্ছি, ঠিক তখনই ইউরোপে প্রবেশের লক্ষ্যে ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী বসনিয়ার জঙ্গলে অবস্থান করছে বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রায় পাঁচ শতাধিক তরুণ। আজ বাংলার যে সমস্ত তৌহিদী জনতা ফ্রান্সকে বয়কটের কথা বলছে, কাল তারা কেউ ফ্রান্সে যাওয়ার সুযোগ পাক, জ্যামে পড়ার ভয়ে ভোর বেলায় গিয়ে ফ্রান্স দূতাবাসের সামনে লাইন ধরবে৷ তারপর আইফেল টাওয়ারের সামনে গিয়ে খিচ মেরে সেলফি তুলে বলবে- লাইফ ইজ অসাম৷

প্রভাত নাজমী
লুন্ড ইউনিভার্সিটি, সুইডেন

শেয়ার করুন:
  • 2.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.