বিয়ের সার্টিফিকেট ধর্ষণকে বৈধতা দেয় না

ফারজানা নীলা:

বৈবাহিক ধর্ষণ টার্মটা একটা হাস্যকর টার্ম আমাদের দেশ এবং সমাজের জন্য। এখানে শারীরিক সম্পর্ক বৈধ তখনই যখন কেউ বিবাহিত হয়। অথবা কেউ বিবাহিত মানেই সে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য। এই বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামীর দ্বারা। ‘যেহেতু বিয়ে করা বৈধ বৌ, সেহেতু তার সাথে আমি শারীরিক সম্পর্ক করতে পারবো যেকোনো সময়’!

স্ত্রীর সম্মতি লাগবে না? বাঙালী পুরুষের কাছে স্ত্রীর সম্মতি বলে কিছু নেই। স্ত্রী তার সম্পত্তি। স্বামী যেভাবে খুশি সেভাবে তার স্ত্রীকে ব্যবহার করবে।বৈবাহিক শারীরিক সম্পর্কে শুধুমাত্র স্বামীর ইচ্ছেই মুখ্য। স্ত্রীর ইচ্ছা, অনিচ্ছা, চাহিদা, এসবই আমাদের সমাজে হাস্যকর, গৌণ, অবাঞ্ছনীয়। ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অতিরিক্ত প্রেশার দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করলে যেকোনো মেয়ের শরীরের ক্ষতি হতে পারে সেটা আমাদের কাছে “ওমা এগুলো কী বলেন?” ধরনের আলাপ হয়ে যায়।

আমরা কোনো অবস্থাতেই মানতে রাজি না যে স্বামী দ্বারা কখনও কোনও মেয়ের শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও ক্ষতি হতে পারে। নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক ক্ষতিকর বা ধর্ষণ হওয়ার যোগ্য তখনই যখন সে অবিবাহিত থাকে। বা স্বামী ছাড়া অন্য কেউ নারীর সাথে সম্পর্ক করে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক নিরাপদ, এই চিন্তার বাইরে কোনও চিন্তাই আমরা গ্রহণ করি না। ধর্ষণ তো কখনই মানি না।

মানবোই বা কীভাবে? আমরা চিন্তা করি স্বামী স্ত্রী হওয়া মানেই এক বিছানায় ঘুমানো। প্রতি রাতে রতিক্রিয়া করা। স্ত্রীটি শারীরিকভাবে সক্ষম কি অক্ষম, না ক্লান্ত তা অবিবেচ্য। স্ত্রীটি সারাদিনের কাজের পরে হয়তো ঘুমাতে চায়, কিন্তু স্বামী যদি চায় তাহলে তাকে বিছানায় সায় দিতেই হবে। না হলে সে কেমন বৌ? আবার স্বামীকে অসুখী করে রাখলে সারারাত কারা কারা যেন গজবও দেয় স্ত্রীর উপর।

বাসর রাতে বিছানায় দাগ ফেলে দিতে হবে কুমারী কিনা জানার জন্য। যে কুমারী তার নাকি অবশ্যই দাগ পড়বে। স্বামীটি তখন বিজয় নিশানা পাবে। মনে মনে উল্লাস করবে। শুধু কি স্বামী? দাদি-নানীরা পর্যন্ত এই দাগের আশায় থাকে।

আমাদের এই শিক্ষা নেই যে প্রথম শারীরিক সম্পর্কে রক্তপাত নাও ঘটতে পারে। আবার প্রথম শারীরিক সম্পর্ক যেকোনো নারীর জন্য বেদনাদায়ক হয়। পার্টনার যদি বুঝদার হয় তবে হয়তো বেদনা সহনীয় হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বুঝদার স্বামী পাওয়ার ভাগ্য হয় কয়জনের? শারীরিক সম্পর্ক কতটা বেদনাদায়ক হলে একজন নারী রক্তে ভেসে যেতে পারে, এর বিন্দুমাত্র ধারণাই নেই আমাদের সমাজের। এসব যে ধর্ষণের সমতুল্য, সে সত্যও আমরা অস্বীকার করি বীরদর্পে।

স্ত্রীর মানা করা, অনিচ্ছা, ব্যথা পাওয়ার চিৎকার এগুলো স্বামী বা পরিবার নাম দেয় “মেয়ে বেশি ন্যাকা!” ভাবি-জা দের মধ্যে কুৎসিত হাসি তামাশাও চলে এই বলে “লাগলে আমরা সাহায্য করবো, পা ধরে রাখতে”।

এসব কি শুধু মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত বা গ্রামেই ঘটে? না, শহরের তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারেও এই ধারণা প্রচলিত যে স্বামী স্ত্রী হওয়া মানেই সারাজীবন এক বিছানায় ঘুমানো। স্বামীর ইচ্ছেয় সায় দেওয়া। স্ত্রীর ইচ্ছে বলে কিছু থাকতে নেই। কোনও কারণে যদি স্বামী স্ত্রী আলাদা বিছানায় ঘুমায় তবে ঘরের বুয়া হতে শুরু করে শ্বশুর শাশুড়ি সবার কপালে ভাঁজ! নিশ্চয়ই এদের মধ্যে কোনও ঝামেলা, নইলে আলাদা শোবে কেন? এদেশে স্বামী স্ত্রীর আলাদা বিছানা হওয়া রীতিমতো অপরাধের সামিল।

স্বামী-স্ত্রী হলেও এদের যে নিজেদের জন্য আলাদা সময়ের দরকার আছে সেটা অনেক উচ্চশিক্ষিত লোকও মানতে চায় না। এসবই তো সমাজের পরিবারের অন্ধ ধারণা। আমাদের আইনও কি এর বিপক্ষে বলে? বাংলাদেশ পেনাল কোড এর ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী স্ত্রীর বয়স ১৩ বছরের উপরে হলে শারীরিক সম্পর্ক ধর্ষণ হিসেবে বিবেচ্য হবে না। যদি তার রক্তক্ষরণ হয়, যদি তার ভেতরে কিছু ছিঁড়ে যায়, যদি তার ইচ্ছে না থাকে, যদি তাকে জোর করা হয়, তবুও একে ধর্ষণ বলা যাবে না। কারণ তার বয়স ১৩ বছরের উপরে।

১৩ বছরের উপরে সবার শারীরিক গঠন একই হয়? সবার শারীরিক চাহিদা একই হয়? যাকে আইন এবং সমাজ ধর্ষণ বলে, সেখানে কী হয়? মেয়েটির ইচ্ছের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে প্রবেশের ফলে মেয়েটি যে যন্ত্রণা ভোগ করে, সেই যন্ত্রণার ফলে তার রক্তক্ষরণ হয়। এবং এই রক্তক্ষরণের ফলস্বরূপ অনেকে মারাও যায়। একই কাজ একজন বিবাহিত মেয়ের সাথে স্বামী করলে, একই যন্ত্রণা সেই মেয়েটি ভোগ করলে, একই রক্তক্ষরণ হলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে না কেন? সেই রক্তক্ষরণে মৃত্যু হলে তাকে হত্যা বলা যাবে না কেন?

সাধারণ কমনসেন্সে কি একে ধর্ষণ বলে না? শুধুমাত্র বিয়ে নামক একটা সার্টিফিকেট আছে বলেই ধর্ষণ বৈধ হয়ে যায়? যে অমানসিকতা যে বর্বরতা যে অত্যাচার আইনানুগ ধর্ষণে হয়, সেই একই বর্বরতা অত্যাচার বিবাহিত সম্পর্কে হলে সেটা ধর্ষণ না কীভাবে?

টাঙ্গাইলে যে ১৪ বছর বয়সী কিশোরী মারা গেলো তার সাথে যে বর্বরতা হয়েছে সেটা শুধু একা স্বামীই করেছে? তার বাবা-মা আইন অমান্য করে বাল্য বিবাহ দিয়েছে তাকে। তার ৩৪ বছর বয়সী বর্বর স্বামী তাকে স্ত্রী বা ভোগবস্তু মনে করে অত্যাচারের সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘন করে তাকে শেষমেশ মেরেই ফেললো। একজন ১৪ বছর বয়সী ছোট কিশোরী, শারীরিক সম্পর্কের কতটুকুই বা বুঝে। তাকে তার বাবা-মা ঠেলে দিয়েছে একজন মধ্যবয়স্ক গুণ্ডার হাতে।

মাঝখানে বাল্যবিবাহের বলী হলো একজন নিষ্পাপ শিশু। আইন অনুযায়ী এটা বাল্যবিয়ে। বাল্যবিয়ে দেওয়ার জন্য মেয়ের বাবা মা এবং করার জন্য পাষণ্ড স্বামীকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমাদের বোধবুদ্ধি এতোই লোপ পেয়েছে যে ধর্ষণকে ধর্ষণ বলতেও বাধে শুধুমাত্র বিয়ের সার্টিফিকেট আছে বলে।

অবশ্য আইনের কঠোর ব্যবহার নিশ্চিত না হলে খুব সহজেই স্বামীটি ছাড়া পেয়ে যাবে। এবং স্বামীটি মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে সেই বিচার মেয়েটি হয়তো পাবে না। কারণ একে তো আইন ধর্ষণই বলে না।

বৈবাহিক ধর্ষণ একটি অপরাধ। স্ত্রী ইচ্ছের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষণই বলে; এই সত্য এবং বাস্তবকে মানতে হবে। মানার শিক্ষা দিতে হবে। যারা এই অত্যাচার নিতে না পেরে মরেই যায় শুধু তাদের কথাই আমরা জানি। আরও কত শত এমন ধর্ষণের শিকার হয় কিশোরী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক নারী। যারা প্রতি রাতেই এই মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করে যায়। যারা জানে কাউকে বলে কোনও লাভ নেই। কেউ একে ধর্ষণের নাম দিবে না। তারা নিজেরাও মুখ বুঁজে সহ্য করে যায় এই চিন্তায় যে এটাই স্বাভাবিক। মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার শাস্তি।

কিন্তু শারীরিক সম্পর্ক যে শাস্তি না, অত্যন্ত আনন্দদায়ক ব্যাপার সেই অভিজ্ঞতা এসব নারীদের জীবনে হয়তো আসেই না। বিয়ে মানে দুজন একে অপরকে বুঝবে, জানবে, ভালোবাসবে, শ্রদ্ধা করবে। একে অপরের ইচ্ছে অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিবে। একে অপরের সুবিধা-অসুবিধা জানবে, বুঝবে।

বিয়ে মানে এই না জীবনের প্রতিটি রাত দুজনকে একই বিছানায় ঘুমাতে হবে! বিয়ে মানে এই না যে স্বামীর ইচ্ছে হলেই নিজেকে মেলে দিতে হবে স্বামীর নিচে! বিয়ে মানে এই না স্বামী স্ত্রীকে সম্পত্তি মনে করবে! বিয়ে মানে এই না ধর্ষণকে বৈধতা দিবে!

শারীরিক সম্পর্ক দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে, একপক্ষের জীবনে চিরস্থায়ী যন্ত্রণা যেন না আনে। সমাজ কী বলবে, বাবা মা কী বলবে এই লোকলজ্জার ভয়ে প্রতিবাদ করতে যেন ভুলে না যাই। স্ত্রীরা সহ্য করে যায় বলেই স্বামীরা আরও বর্বর হয়ে উঠে। সুতরাং একবার প্রতিবাদ করেই দেখি না! আমাদের ভয়-লজ্জা সহ্য করে যাওয়ার প্রবণতাই ছেলেদের উগ্র হওয়ার প্রধান হাতিয়ার। প্রতিবাদ করি ধর্ষণকে যেন ধর্ষণই বলা হয়। বিয়ে হওয়ার ট্যাগ দিয়ে যেন কোনো ধর্ষক মুক্তি না পেয়ে যায়।

শেয়ার করুন:
  • 2.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.