কথার সৌন্দর্য কথায় কদার্য জানান দেয় ব্যক্তিত্ব

শাহরিয়া দিনা:

মানুষ আবেগ এবং অনুভূতি প্রবণ প্রাণী। অনুভূতি দুই ধরনের, শারীরিক এবং মানসিক। আবেগ পুরোটাই মানসিক ব্যাপার, যার প্রভাব মনের পাশাপাশি শরীরেও পরে। আনন্দ, বিষাদ, ক্রোধ, হিংসা এসব মনুষ্য স্বভাবের সহজাত বিষয়। আনন্দে আমরা হাসি, দুঃখ-বেদনায় কাঁদি, তেমনি রাগ হলে গালি দেই।

অচেনা কোন মানুষ কেন অন্য মানুষকে গালি দেয় এটা ভাবছিলাম। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আপনার যদি পাব্লিক প্লাটফর্মে টুকটাক লেখার অভ্যাস থাকে তবে যতই আপনি ক্ল্যাসি হোন, ভদ্র হোন, অন্যকে আঘাত দিয়ে কথা না বলেন, তবুও একশ্রেণির মানুষ আপনাকে গালি দিবেই। তারা আপনার বক্তব্য পড়বে না, বুঝবার চেষ্টাও করবে না। মন চাইলো যাই একটা গালি দিয়ে আসি টাইপ অবস্থা। আপনার ঘরে টাকা নাই, আপনার কোন কাজ নাই, আপনার জীবনে ভালোবাসা নেই, সেই ফ্রাস্ট্রেশন থেকে যে ক্ষোভ তা ঝাড়ার জন্য উইমেন চ্যাপ্টারের ফেইসবুক কমেন্ট বক্সে এসে লেখিকাদের গালি দেয়াটা খুবই দারুণ একটা জায়গা কিছু মানুষের জন্য। যাক, সে কথা।

আচ্ছা, একটু জেনে নেই মানুষ কেন গালি দেয়? মানুষ সাধারণত খুব রাগ আর ক্রোধের কারণে গালি দেন। মূর্খ মানুষ গালি দেয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে, অক্ষম গালি দিয়ে নিজেকে ক্ষমতাবান ভাবে, মোদ্দা কথা জ্ঞানের অভাব হলে মানুষ গালি দেয়। প্রকাশ্যে পেরে উঠতে না পেরে স্যোশাল মিডিয়াতে গালি দেয়। অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের আশায়। কোন বিষয়বস্তু অপছন্দ হলে গালি দেয়াটা বিকৃত মানসিকতা। স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার মানুষ দ্বিমতে যুক্তিপূর্ণ হয়, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে বিনয়ী।

অনলাইনে গালি দেওয়া মানুষগুলো প্রকৃতপক্ষে সমাজেও একইরকম প্রভাব ফেলে। তার চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ করার মতো সুন্দর শব্দ-বাক্য জানা নেই। হয়তো সে বেড়ে উঠেছে প্রসংশাহীন ভাবে, হয়তো তার জীবন নেই কোন সফলতা, নেই ভালোবাসা তার জীবন এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে গালাগালির মাধ্যমে। কারণে-অকারণেই এরা গালিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে থাকে। গালি নিয়ে একটা পৈশাচিক আনন্দ গ্রহণের চেষ্টা করে।

পৃথিবীতে ভালোবাসা শেখানোর জন্য ধর্ম আছে, দর্শন আছে, আছে কবি-সাহিত্যিকের বিভিন্ন বিশ্লেষণ কিন্তু ঘৃণা করতে কেউ শেখায় না। ঘৃণা মানুষ নিজেই শিখে নেয়। এই অনুভূতি একদমই বিশুদ্ধ। কেউ ঘৃনা করলে মনপ্রাণ থেকেই করে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই, কিন্তু ভালোবাসাটা আজকাল আর কেউ মন থেকে বাসে কিনা সন্দেহ থেকেই যায়। পৃথিবীতে ঘৃণার এতো ছড়াছড়ি! সুতরাং আপনি ঘৃণা ছড়িয়ে আর লাভ কি, ব্যাতিক্রম কিছু তো করছেন না। ভালোবাসাটা জরুরি। জীবনের জন্য, পৃথিবীর জন্য।

মানুষের ৬ ইঞ্চি লম্বা জিহবা একটা ৬ ফুট মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। কথায় আঘাত লাগে, কথায় প্রশান্তি আনে। কারো কথা শুনলে মরে যেতে ইচ্ছে করে আবার কারো কথায় বাঁচতে ইচ্ছে করে। সুন্দর করে কথা বলতে জানাও এক ধরনের শিল্প। অচেনা মানুষকে বিশ্রী আক্রমণ করে কথা বলে কি প্রাপ্তি হয় না জানা গেলেও যার উদ্দেশ্যে দিয়েছেন তার মন খারাপ হয় নিশ্চিত। জীবন সমুদ্রের মতো যা নেয় তা ফিরিয়ে দেয়। কর্মফল এক দারুণ জিনিস। যেটা করা হবে সেটা ফেরত আসবে। একজনের মনোকষ্টের কারণ হলে ওইটা ফিরে আসে অন্যকোন মাধ্যমে, অন্য কোনোভাবে।

মানুষের জন্য কিছু না করতে পারলেও সুন্দর করে কথা বলতে পারাটাও ধর্মের অংশ। একজনের রুচি-ব্যক্তিত্ব এবং তার পারিবারিক শিক্ষা শিষ্টাচারের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার আচরণ এবং কথার মাধ্যমে। অশ্লীল কথাবার্তা এগ্রেসিভ মনোভাব কখনোই সুন্দরের প্রত্যাশা হতে পারে না। যার আত্মা সুন্দর না সে কুৎসিত। তারপক্ষে সম্ভব না পৃথিবীতে সুন্দর আনা বা পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করা। দিনশেষে দুই দিনের মেহমান পৃথিবীতে আমরা সবাই। মানুষের প্রতি এমনভাবেই কথা বলা উচিৎ যেন যদি এটাই হয় শেষ কথা তবুও যেন আক্ষেপ থাকেনা।

— ‘Raise your words, not voice. It is rain that grows flowers, not thunder.
~ RUMI

শেয়ার করুন:
  • 389
  •  
  •  
  •  
  •  
    389
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.