মৃত্যুদণ্ড কি ধর্ষণ বন্ধ করবে?

বাসন্তি সাহা:

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ও এর প্রতিবাদে সামাজিক আন্দোলন ও দাবির প্রেক্ষিতে এই আইন করা হলো। ধর্ষণবিরোধী এই আন্দোলন শুরু হয় নোয়াখালির বেগমগঞ্জে একজন গৃহবধুকে নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। একথা সবাই এখন আমরা জানি। ইতোমধ্যে একজন ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়েছে এই আইন পাশের পর।

কিন্তু এই আইন কি সমাজে নারীদের উপর নির্যাতন ও ধর্ষণ বন্ধ করতে পারবে? এইটা নিয়ে ভাবছিলাম আইন পাশ হওয়ার পর থেকেই। কথাও বলেছি অনেক মানুষের সাথে। কেউ কেউ বলেছেন, না, বন্ধ হবে না। কারণ বিচার পর্যন্ত যাওয়ার পথে এতো বাধা যে সেটা সরিয়ে ওখানে যেতে পারে মাত্র শতকরা তিনভাগ নারী। বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বাদী আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সাক্ষীদের পাওয়া যায় না। বাদীপক্ষ টাকা পয়সা নিয়ে আপোস করে ফেলে। ভয়ে পিছিয়ে আসে। এমন আরও বহু আলোচনা আছে। কেউ কেউ বলেছেন, এটাতে ধর্ষণের পর মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে, কারণ নির্যাতিত নারীকে বাঁচিয়ে রাখলে নিজের জীবনের সংশয় হবে ভেবে ধর্ষণের পরই হত্যা, গুম বেড়ে যাবে!

কিন্তু সর্বশেষ যে জবাবটি পেয়েছি গতকাল। রিকশায় ফিরছিলাম—দুজন শ্রমিক ও একজন পথচারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাসছিল। একজন শ্রমিকের কথা শুনলাম—‘তারা লেংটা হয়ে চলবে সেইডা দেইখা যদি আমার —-লাফায়, তাহলে আমার মৃত্যুদণ্ড কেন হবে? তারপর সমবেত হাসি। যারা ভেবেছিলাম ধর্ষণকারীরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে তাদের মুখের উপর এর চেয়ে ভালো জবাব আর হয় না।

মানব সভ্যতায় নারীদের উপর হওয়া অপরাধের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধটি হলো ধর্ষণ। নারীর শরীর তার নিজস্ব। সেই শরীরকে অপমান করার যে নির্লজ্জ, নৃশংস প্রক্রিয়া, প্রবণতা ধর্ষকের তার জন্য কোনো শাস্তিই যথেষ্ট নয়। দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় বেড়ে উঠছে এই ধর্ষকের দল। কেউ কেউ এটাকে বলছেন পুরুষতন্ত্রের সেই পুরনো রাজনীতি। মেয়ে, তুমি ঘর থেকে বের হবে না। বের হলেই তোমার বিপদ হবে। তুমি ঘরে থাকো।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা, নারীরা পরিবারের বাইরে যে পরিমাণ সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তার চাইতে অনেক গুণ বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে পরিবারের ভেতরেই, যার অধিকাংশ ঘটনা বিভিন্ন কারণে প্রকাশিত হয় না। বাংলাদেশে ৭৭ শতাংশ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পরিবারের মধ্যে (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি, ২০১৮)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তাদের কাছের মানুষ দ্বারা।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটিতে বলা ছিলো—ধর্ষণের পর যদি হত্যা করা হয়, সে ক্ষেত্রে ধর্ষককে আইনে থাকা সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। ধর্ষক যদি স্বীকার করে যে সে ধর্ষণ করেছে, সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি হবে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ধর্ষণের চেষ্টা করলে অনধিক ১০ বছর ও অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান আছে। নারী নির্যাতন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ, ১৯৮৩, এবং১৯৯৫ ও ২০০০ সালের আইনেও শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই ছিল। কিন্তু বিচার সম্পন্নের হার সাড়ে তিন ভাগের মতো। শাস্তির হার এক ভাগেরও নিচে।

আইন তৈরি হয় সমসাময়িক প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য দরকার হয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এই আইনের প্রয়োগ কীভাবে হয়েছে! পত্রিকার তথ্য থেকে জানা যায় ২০১৮ সালের ১৫ হাজার মামলার অভিযোগের চার হাজারটির কোনোই সত্যতা মেলেনি। ২০১৭ সালে মাত্র সাড়ে ৭০০-র মতো মামলার বিচার হয়েছে। জামিন-অযোগ্য অপরাধ বিধায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বা প্রতিশোধ নিতে অনেক নারীকে এসব মিথ্যা মামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রবণতা ধর্ষণের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। আইনটিকে রক্ষাকবচ হিসেবে না রেখে যদি প্রতিপক্ষকে ফাাঁসানোর কাজে ব্যবহার করা হয় তবে সমাজে আইনটি যর্থাথতা হারিয়ে ফেলে প্রকৃত ভুক্তভোগী বঞ্চিত হয়। অনেক সময়ই প্রেমের শারীরিক সম্পর্ক বদলে যায় ধর্ষণের অভিযোগে। এই প্রবণতাও কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

ধর্ষণ একটি অপরাধমূলক আচরণ এবং সেই আচরণের প্রাথমিক ভিত্তি হলো নারীর প্রতি ক্রমান্বয়ে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ও বিকৃত চিন্তাপ্রক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি। যুগ যুগ ধরে নাটক, সিনেমা জোকস এ নারী হয়ে উঠেছে ভোগ্যপণ্য বা একটি শরীর। তাই কঠোর শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন নারীর বিরুদ্ধে এই নিগ্রহ বন্ধ করতে পারবে না। কেবল তো ধর্ষণ নয় সমস্ত যুদ্ধ, মহামারী নারীর জন্য মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ অভিঘাত নিয়ে হাজির হয়। সম্প্রতি মহিলা পরিষদের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসেই ৮৩ জন কন্যাশিশুসহ মোট ১২৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এবছরের গত নয় মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর বাইরে বহু ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয় না।

প্রযুক্তির ব্যবহার নারীর প্রতি নিগ্রহকে বহুমাত্রিক করেছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ছোট বোনের নগ্ন ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে দুই বোনকে ধর্ষণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিপন (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। আটক শিপন ওই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুর আলমের ছেলে। প্রতিবেশী শিপন বিয়ের জন্য তাবিজ করতে হবে বলে আমার কাছে ছোট বোনের নগ্ন ছবি চায়। আমরা না বুঝে তাকে ওই ছবি দেই। পরে ওই ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আমাদের দুইজনকেই সে কৌশলে ধর্ষণ করে। (কালের কণ্ঠ ২৮ অক্টোবর ২০২০।
কোথায় নেই তারা? পরিবারে বাবা চাচা খালু মামা কেউ এর বাইরে নয়। তাদের আলাদা শিং নখ নেই। তারা আমাদের মধ্যেই মিশে আছে আপনজনের মতো। তাই খুঁজে খুঁজে ধর্ষকামী পুররুষদের আলাদা করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। ধর্ষণ হবে, ধর্ষণের পর ভিকটিমকে মেরে ফেলা হবে। বাদীর পরিবার ধৈর্য সাহস নিয়ে সমাজের ক্ষমতাবানদের সমস্ত হুমকি অগ্রাহ্য করে মামলা চালাবে। অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে, তারপর হবে মৃত্যুদণ্ড। এতোটা পথ কী যেতে পারবে নির্যাতিতার পরিবার? বেশিরভাগই পারবে না।

তাই ধর্ষকরা এই সমাজে রয়ে যাবে। কিন্তু নতুন করে যাতে তৈরি না হয় তার জন্যতো কাজ করা যায়! লেখাপড়ার বাইরে কী আছে তরুণদের সম্পৃক্ত করার জন্য? সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো তো একে একে ধ্বংস হয়ে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব নেই, নাটক নেই, কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই ফুটবল, ক্রিকেটও নেই সেভাবে। আছে রাজনীতি আর নেশা। এর পরবর্তী ফল হিসেবে আছে নারীর প্রতি অসম্মান আর নিগ্রহের প্রবণতা। প্রযুক্তির আবিস্কারের সাথে সাথে সময় পাল্টে গেছে। কোভিডের পর নতুন স্বাভাবিক সময়ে হয়তো আরও পাল্টে যাবে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কী হবে কেবল ক্রেতা আর বিক্রেতার; শোষক, অত্যাচারিতের। মানুষের মধ্যে মানবিক নৈতিক সম্পর্কের কোন দায় থাকবে না! সমাজ কী হবে কেবল একটা বাজার!

কেউ কেউ বলবে ধর্ষণের মতো চরম হেনস্থা হয়তো কম, কিন্তু চারপাশে নারীকে দেখে অশ্লীল উক্তি, ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া, কর্মক্ষেত্রে নারীকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়া না হলে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ছুড়িকাঘাত করে মেরে ফেলা বা এডিস নিক্ষেপ যৌতুকের দাবিতে খুন গুম এগুলোতো কম নয়। কিছুদিন আগে মিটু র ঝড়ে আমরা তথাকথিত ভদ্র শিক্ষিত সমাজের নারী নিগ্রহের কিছুটা আঁচও আমরা পেয়েছি।

অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
ঝাঁপ খুলে লেলিয়ে দেন কলঙ্কের অজস্র কুক্কুর _
আমার কলঙ্কের প্রয়োজন আছে !
যুদ্ধরীতি পাল্টানোর কোনও প্রয়োজন নেই
তাই করমর্দনের জন্য
হাত বাড়াবেন না।
আমার করতলে কোনও অলিভচিক্কন কোমলতা নেই—কবিতা সিংহ

নারীদের আইন সুরক্ষা দেবেই ঠিকই তবে নারীকে নিজেকেও তৈরি হতে হবে। শরীরের অপমানের স্টিগমা ছুঁড়ে ফেলে নারীকে উঠে দাঁড়াতে হবে। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। তবে সেটা নারী-পুরুষের বিভেদ বাড়িয়ে নয়। সব পুরুষ ধর্ষক নয়। নারীর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো শর্টকাট নেই। ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলে পরম্পরের হাত ধরে দাঁ[ড়াতে হবে।

বাসন্তি সাহা
প্রোগ্রাম ডিরেক্টর
দর্পণ, ঢাকা।

শেয়ার করুন:
  • 225
  •  
  •  
  •  
  •  
    225
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.