নূর নাহার মরে যায়নি, ওকে খুন করা হয়েছে

সুপ্রীতি ধর:

মা-বাবা হয়তো শখ করেই মেয়েটির নাম রেখেছিল নূর, মানে আলো। তার কথা ছিল বেঁচে থেকে চারদিকে আলো ছড়িয়ে যাবার, কিন্তু তার বদলে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই নারী জনমের কঠিন অন্ধকার এক রূপ দেখে বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার নারীদের একজন হয়ে সে চলে গেছে।

ভালোই হয়েছে একদিক দিয়ে। বাকি জীবনের কষ্টগুলো তাকে আর পোহাতে হবে না। ও যে কী ভয়াবহ এক গণ্ডমূর্খ জাতির ঘরে জন্ম নিয়েছিল, মরে গিয়ে তা প্রমাণ করে গেছে। ওর মা-বাবা নিশ্চয়ই এখন শান্তিতে থাকবে আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে! মেয়েরা তো আপদই! নইলে যে মেয়েটি বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল, বন্ধুদের সাথে খুনসুঁটিতে মেতে থাকতো, পুকুরে লাফালাফি করতো, সেই মেয়েটিকে ধরে-বেঁধে কেনই বা স্বামী নামের ধর্ষকের খোয়াড়ে ঢুকাবে বাবা-মা? দীর্ঘ বছর ধরে লাগাতার আন্দোলন-প্রতিবাদের পরও বাল্যবিয়ের বয়স নিয়ে আইন, বাস্তবতা এবং এর প্রয়োগের মধ্যে যে ফারাক তৈরি হয়ে আছে সমাজে, মরে গিয়ে তারই মর্মান্তিক এক দৃষ্টান্ত তৈরি করে গেল নূর নাহার।

শিশুদের বিয়ে যে এক ধরনের যৌন নির্যাতন, মতান্তরে ধর্ষণ, এ বিষয়টি এখনও বিশ্বাস করে না বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ। তাদের কাছে কন্যাশিশু এখনও বাড়তি বোঝা বৈ তো নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বিয়ে দিয়ে বিদায় দিলেই ভালো। গ্রামেগঞ্জে প্রবাসী শ্রমিকরা মূল্যবান পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, তা তাদের বয়স যাই হোক না কেন। নূর নাহারও বলি হলো তার মা-বাবার লোভের কাছেই। কেবল ও মা-বাবাকেই বা দোষ দিই কী করে? একটা রাষ্ট্র যখন কোনো নাগরিকের দায়িত্ব নিতে পারে না, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্রের দরিদ্র বাবা-মায়েদের দোষ কোথায়?

১৪ বছরের কিশোরী নূর নাহার তার ৩৫ বছর বয়সী স্বামী রাজীবের সাথে

মেয়েটি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলো। মা-বাবা গার্মেন্টস কর্মী। প্রবাসী পাত্র পেয়ে তারা মেয়ের বয়সের কথা ভাবেননি। ১৪ বছরের এক কিশোরী মেয়ে যে শারীরিকভাবেই তৈরি হয়নি বিয়ের জন্য, সেই অপ্রস্ফুটিত শরীরেই বিয়ের রাত থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে উপুর্যপরি ধর্ষণ করে গেছে ৩৫ বছরের সোমত্ত পুরুষ স্বামীটি।
বিয়ের মতোন সার্টিফিকেট পেয়ে আস্ত একটা নারী শরীরের মালিক বনে যাওয়া স্বামী নামের পুরুষটি কিশোরী মেয়েটির নাজুকতা দেখেনি। দেখেনি ও যে নারী হয়ে ওঠেনি এখনও, দেখেনি ওর চোখে-মুখের ভয়! ওর কান্না! শারীরিক সম্পর্কের পর রক্তক্ষরণ হলে এমনকি ডাক্তারের কাছেও নেয়নি। উপরন্তু প্রায় একমাস ধরে ধর্ষণ করে গেছে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে শাশুড়ি তাকে কবিরাজ ডেকে চিকিৎসা দিয়েছে। শেষে যখন আর রক্ষা হচ্ছে না তখন হসপিটালে নিয়ে গেছে। কিন্তু নুর নাহার বাঁচেনি। আহারে মেয়েটা!

নূর নাহার মরে গিয়ে আমাদের গালেও কষে থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়েছে। আমরা যারা নারী অধিকারের কথা বলি, তাদের গালে। আমরা এখন কোথায় মুখ লুকাবো? বাল্যবিবাহের ভয়াবহতা কী তা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এতো সভা-সেমিনার, প্রচারণা, মিটিং-মিছিল-প্রতিবাদ কোথায় গেল? নূর নাহার কি আমাদের সবাইকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়নি তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে?
নূর নাহার কি একাই মরে গেল? এরকম কতশত মেয়ে ছিঁড়ে যাওয়া যোনি আর রক্তাক্ত শরীর আর মন নিয়ে মরছে, ধুঁকছে তার খবর কে রাখে! এদের কোন পরিসংখ্যান হয় কি? নারীর আবার সংখ্যা!

মনে পড়ছে একবার ইউনিসেফ এর হয়ে মধুপুরের এক স্বাস্থ্য ক্লিনিকে গেছিলাম রিপোর্ট করতে। আমার সামনে ১৪/১৫ বছরের এক কিশোরী মা আর ১৬/১৭ বছরের কিশোর বাবা, আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম মেয়েটির প্রসবপরবর্তি জটিলতার কথা। ও চিকিৎসকের কাছে এসেছে। নারী চিকিৎসকটি সেদিন বলছিলেন বাল্যবিয়ের কী ভয়াবহ চিত্র গ্রামবাংলায়, যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করে তারাই জানে। প্রতিদিনই এমন অসংখ্য মেয়ের চিকিৎসা তাকে করতে হয়।

ইউনিসেফসহ বহু বেসরকারি সংস্থা, এমনকি সরকারিভাবেও বাল্যবিবাহ বন্ধে অনেক কার্যক্রম আছে। সচেতনতামূলক অনেক কর্মসূচি আছে, টেলিভিশনে দেখানো হয় বিভিন্ন প্রচারণা। তারপরও এর প্রয়োগ কোথাও বন্ধ হচ্ছে না। হয়তো কমেছে বাল্যবিয়ের হার। কিন্তু এখনও পর্যন্ত শুনিনি যে বাল্যবিয়ের কারণে কোথাও কারও কোন শাস্তি হয়েছে।

আমরা জানি যে বিশ্বে বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম। ইউনিসেফ এর তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শতাংশের অধিক বাংলাদেশের নারী যাদের বয়স এখন ২০ এর মাঝামাঝি তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই বিয়ে হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের নিচে। সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, যেসব পিতা-মাতা মেয়ে শিশুদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তারা মেয়ে শিশুর বয়ঃসন্ধির শুরুতে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশংকায় ভুগে। কিন্তু অধিকাংশ বিবাহিত কিশোরীও যে দৈহিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বা এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় এবং সেটা হয় স্বামীর দ্বারাই, সেই জানাটা অজ্ঞাতই থেকে যায়। কিশোরী বয়সে মা হওয়াটাও আরেক নির্যাতন। সেই কথাটাও উহ্য থেকে যায়।

নূর নাহার সেই তাদেরই একজন। ও বেঁচে গেলে এটা কোনো খবরই হয়ে আসতো না পত্রিকার পাতায়, আমরাও রাগে-ক্ষোভে-হতাশায় ভুগতাম না। জানতামই না যে দেশে একটা বিরাট সংখ্যক মেয়ে শিশু বয়সেই বিয়ের শিকার হয়ে যৌন নির্যাতন ভোগ করছে! মেয়েটির কথা ভাবতে গিয়ে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কী অসহায় একটি বাচ্চা মেয়েকে এক জওয়ান পুরুষের ঘরে ঠেলে দিল তারই মা-বাবা! আর মেয়েটি লাশ হয়ে গেল!

বিয়ের রাতের পর আরও ৩৪ দিন মেয়েটা বেঁচে ছিলো। যৌনাঙ্গের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলেও স্বামী তাকে ছেড়ে দেয়নি, সেই রক্তাক্ত যোনী দিয়েই স্বামীর হক আদায় করেছে। প্রতিদিন মেয়েটা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তো ম্যারিটাল রেপ এর কথা তুললেই বলে, এ আবার কী জিনিস! তারা ভাবে, মূলত পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সকলেই ভাবে, বিয়ে হলেই স্বামীটি স্ত্রীর যৌনাঙ্গের মালিক হয়ে যায়! স্ত্রীর ইচ্ছে বা অনিচ্ছা কোনটারই আর কোন মূল্য থাকে না, যেভাবেই হোক, যখনই হোক, স্বামী তার হক আদায় করেই নেয়।

এই যে বিবাহিত জীবনের ৩৪ দিন পর্যন্ত কিশোরী মেয়েটির উপর দিয়ে কী গেলো কেউ ভাবতে পারে তা কতো ভয়ংকর? শুধু কি ওই স্বামী রাজিব খানের দায় এই হত্যার পিছনে? যে বাবা মা এই বয়সে বিয়ে দিলো, যে রাষ্ট্রে দারিদ্র্যের জন্য বাচ্চাদের বিয়ে হয়ে যায়, যে বাবা মা মেয়ের এই অবস্থা জেনেও শ্বশুরবাড়ি ফেলে রেখেছিলো, যারা সময়মতো চিকিৎসা দেয়নি, সবাই তো দায়ী এই ঘটনায়। সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই যদি কিছুটা হলেও টনক নড়ে।

আর জাল বার্থ সার্টিফিকেট দেওয়াও বন্ধ করতে হবে সর্বস্তরে। তবেই হয়তো কিছু মেয়ে বেঁচে যাবে এই অন্যায়, অন্যায্য নির্যাতন, ধর্ষণ থেকে, অসময়োচিত মাতৃত্ব থেকে। বাল্যবিয়ে বন্ধের পাশাপাশি আমাদের বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধেও এখন সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সোচ্চার হতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 650
  •  
  •  
  •  
  •  
    650
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.