উগ্রপন্থীরা, কার্টুন বোঝো, শিক্ষকের রক্তের দাম বোঝো না…

কাজী তামান্না কেয়া:

গত ১৬ই অক্টোবর ফ্রান্সের একজন মিডল স্কুল শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করে চেচনীয় বংশোদ্ভুত এক মুসলিম রেফিউজি। এই হত্যার পর ফ্রান্সের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর উপর চাপ বাড়তে থাকে মুসলিম রেফিউজিদের উপর নজরদারি বাড়াতে। ফ্রান্স সাময়িকভাবে ৭০টি মসজিদ বন্ধ ঘোষণা করেছে, দুইশো’র অধিক মানুষকে ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত করতে যাচ্ছে, যারা মৌলবাদী ধ্যান-ধারণা বহন করছে, আরও ২৫৮ প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির ভেতর রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোর মৌলবাদের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থানের জন্যে মুসলিমদের সমালোচনার শিকার হচ্ছে। এই সমালোচনা যারা করছেন তারা শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির জীবনের দাম ভুলে যাচ্ছেন, ২০১৫ সালে শার্লি হেব্দোর অফিসে দফায় দফায় হামলা, পত্রিকা অফিসে আগুন, সম্পাদকসহ কমপক্ষে ১২জন মানুষকে হত্যার বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছেন, এবং এর পরে ফ্রান্সে মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা সংঘটিত বাকি হামলাগুলিও ভুলে যাচ্ছেন।

ফ্রান্স পৃথবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উদার দেশ হিসেবে পরিচিত। এই দেশের উদার মানবিকতা এবং জীবনদর্শন সারা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলিম এবং অন্য ধর্মাবলম্বী এবং নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী রেফিউজিকে ফ্রান্সে মাইগ্রেট করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে ফ্রান্সে ৫৮ লাখ মুসলমানের বসবাস যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৯% (২০১৭)। ফ্রান্সে দ্রুত বর্ধমান ধর্মের তালিকায় ইসলাম আছে দ্বিতীয় অবস্থানে। ইউরোপের মুসলিম ইমিগ্রান্টদের উপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে ইউরোপের সবগুলো দেশের ভেতর ফ্রান্স মুসলিমদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিকভাবে গ্রহণ করার এই প্রক্রিয়ায় ফ্রান্স যদি উদার গণতান্ত্রিক না হতো, মুসলিমরা ফ্রান্সে এতো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না।

এমতাবস্থায় ফেইসবুকে এক বন্ধুর পোস্টে চোখ আটকে গেল। তিনি লিখেছেন, ফ্রান্স রিলিজিয়াস প্লুরারিজম প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তিনি ফ্রান্সকে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন ধর্মের সহবস্থানের কৌশল শিখে যেতে আহবান করেছেন। কদিন আগে ‘ফ্রিডম অফ স্পিচ’ এর উপর আমার অন্য একটি পোস্টের উপর প্রায় একই কথা বলেছিলেন- ফ্রান্সকে তিনি বাক স্বাধীনতার সংজ্ঞা শিখাবেন। ভেবে পাচ্ছিলাম না, উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ বারবার রক্তাক্ত হওয়া ফ্রান্সকে কেন ভিক্টিম ব্লেইম করছে!

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ফেইসবুক ভরে শুধু যে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা মৌলবাদ ধ্যান ধারণার মানুষই ফ্রান্সের প্রতি বিষোদগার করছে বিষয়টি তা নয়, এই মূর্খের দলের সাথে সুর মিলিয়েছেন শিক্ষিত মানুষজনও, এবং বড় বড় ডিগ্রিধারী মানুষও। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই লোকদের কেউই একজন নিরপরাধ শিক্ষককে কার্টুন দেখানোর কারণে যখন হত্যা করা হয়েছিল, তার প্রতিবাদ করেননি। তারা ভুলে যাচ্ছেন যে, শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছিল ক্লাসে ফ্রান্সের সংবিধানের মূলনীতি –স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব শেখাতে গিয়ে। তারা ভুলে যাচ্ছেন স্যামুয়েল প্যাটির শিক্ষা উপকরণে অন্যান্য ধর্ম প্রচারকদের সাথে নবী মোহাম্মদের কার্টুন দেখিয়েছিলেন, যেটা কোনভাবেই অন্যায় ছিল না। তারা ভুলে যাচ্ছেন যে তিনি কার্টুন দেখানোর আগে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। আজ যখন ফ্রান্স কঠোর অবস্থানে গেছে তখন তারা ফ্রান্সের কট্টর সমালোচনা করছে। বিষয়টা এলার্মিং।

আজ থেকে ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশে মৌলবাদ ছিল, কিন্তু শিক্ষিত লোকদের এতো অজ্ঞ আর অযৌক্তিক আচরণ করতে দেখা যেত না। দিনকে দিন এই ট্রেন্ডটা কমন হচ্ছে– জোব্বাধারী মোল্লারা যা বলে, প্যান্ট শার্ট পরা ক্লিন শেইভ করা লোকগুলি সেই একই রাবিশ বলছেন। স্কলার গ্রুপের সমর্থন পেয়ে মৌলাবাদী গ্রুপ বাংলাদেশে ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। এইটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ফিলিস্তিনের একজন মুসলিম ইজরাইলের হামলার শিকার হলে বাংলাদেশের উগ্রপন্থীরা ইজরাইলি তথা ইহুদি/নাসারাদের পণ্য বর্জনের ডাক দেয়। পণ্য বাংলাদেশীরা বর্জন করলে ফ্রান্স বর্জন করতে পারে না? অবশ্যই পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় চালানটি যায় ইউরোপে। ফ্রান্স যেহেতু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ, ফ্রান্স এবং ইইউ চাইলে কিছুদিনের জন্যে পোশাক কেনা বন্ধ করতে পারে বাংলাদেশ থেকে। সত্যি সত্যি যদি ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাজটি করে বসে, বাংলাদেশ তখন কোন অবস্থায় পড়বে, তা কি এই মৌলবাদীরা জানে?

মূর্খদের প্রতিশোধের ভাষা যেমন কার্টুনের বদলে রক্ত, তাদের প্রতিবাদের ভাষাও তেমন বয়কট, হুমকি ধামকি। ফ্রান্স যেখানে বড় বড় দেয়ালে কার্টুন দেখাচ্ছে, ফ্রান্সের জনগণ যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট যেভাবে স্যামুয়েল প্যাটিকের শেষযাত্রায় রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়েছেন, এর মাধ্যমে তারা কিন্তু মৌলবাদীদের একটা বার্তা দিতে চাচ্ছেন এবং বার্তাটি খুব ক্লিয়ার– ফ্রান্সে মৌলবাদের কোন স্থান নেই। একই বার্তা আমরা বুঝতে পারি চীনের উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের অবস্থান থেকে। বার্তাগুলো যত তাড়াতাড়ি মৌলবাদীরা ধরতে পারবেন, ফ্রান্সের সাধারণ মুসলিমরা তত তাড়াতাড়ি ফ্রান্সের মূলনীতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন, এবং শান্তির স্বপক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারবেন।

(উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত লেখার দায় সম্পূর্ণই লেখকের)

Feature Photo Source: The Independent

শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.