ধর্ষণের প্রতিকার: প্রতিবাদের সাথে চাই কঠিন প্রতিরোধ

মুশফিকা লাইজু:

ধর্ষণ একটি মামুলি ব্যাপার, এই সংস্কৃতি কত বছর আগে বাঙালির সামাজিক মগজে ঢুকে গেছে? ৫০০ বছর? ১০০০ বছর? না তারও বেশি, কিংবা আরো বেশি সময় ধরে। অধ:স্তনকে পীড়ন করা যেনো একটি অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সমাজে অবস্থানগত দিক থেকে নারীর চেয়ে আর সহজলভ্য কেউ নেই পীড়ন কিংবা নিপীড়ন করবার। একটি গরুর চেয়েও নারী মূল্যহীন, সে কথা প্রাচীন প্রবাদ, জারি-সারি, প্রচলিত গল্প এবং রুপকথা বিশ্লেষণে আমরা পেয়ে যাই। ‘ভাগ্যবানের বউ মরে অভাগার মরে গরু”, ‘বউ গেলে বউ পাওয়া যাবে, ভাই গেলে ভাই পাওয়া যাবে না’, আবার ‘ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন, যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ’। আরও আরও হাজারও শ্লোক বা উপকথা ছড়ানো আছে নারীকে অধঃস্তন ভাবার এবং করার।

অর্থাৎ মনুষ্য জগতে বুদ্ধিমান দুটি প্রজাতির মধ্যে একের উপর অন্যের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যে খুবই জরুরি ছিল, পুরুষতান্ত্রিকরা সেকথা সভ্যতা বিকাশের খানিক পরেই বুঝতে পেরেছিল। মূল্যহীন সেবা, স্বার্থহীন ত্যাগ এ জগতে নারীরা ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারে! তাই যত জিঘাংসা-প্রতিহিংসা-নৃশংসতা এবং নির্যাতন সবই নারীর উপরে করা যায়। এটা যেন বিধির বিধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কপট মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করতে যুগে যুগে পুরুষেরা ধর্মে আশ্রয় নিয়েছে। নারীর মাতৃত্বের সুযোগ নিয়েছে। সেইসাথে করেছে শক্তির অপপ্রয়োগ। রচনা করেছে সামাজিক বিধান নামাংকিত নির্বাক ঈশ্বরের। পুরুষ তার নিজের প্রয়োজনে সম্মান-সম্ভ্রমের বিলি-বণ্টন করেছে। পুরুষতন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে নারীর জীবনের বাঁকে বাঁকে। নারীর যোনীর একটি সামাজিক বাজার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর এই বাজারের নিয়ন্ত্রণ পুরুষ নিজের হাতেই রেখেছে। যাতে সমান বুদ্ধিসম্পন্ন একদল প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জাগতিক ভোগবিলাসকল্পে উপভোগ করা যায়। সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেছে, এই আদেশ ঐখান থেকে প্রাপ্ত হয়েছে, অতএব তোমাকে মানতে হবে। নারী মেনে নিয়েছে। কখনও বিদ্রোহ করেছে, কখনও পুড়ে মরেছে।
প্রাকৃতিকভাবেই যারা সৃষ্টি করে তারা সহনশীল স্থির প্রজ্ঞাবান এবং মহাত্মা। যেমন ভূমি, বৃক্ষ, পাহাড়। নারীও সৃষ্টিশীল- তাই জগতে একমাত্র নারীই মহাত্মা।

বলতে চাই ধর্ষণ নিয়ে, নারীর যোনী আর দশটা অঙ্গের মতো একটি অঙ্গ সেখানে সম্মানকে প্রোথিত করেছে সেই স্বার্থান্ধ পুরুষ, যা শুধুমাত্র নারীকে ঘায়েল করার উপাত্ত মাত্র। অথচ একই কর্মে যুক্ত পুরুষের লিঙ্গের সাথে কিন্তু সম্মান-সম্ভ্রম যুক্ত নয়। পুরুষের এই অঙ্গটি যেন বারোয়ারী। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভারতীয় উপমহাদেশে উন্মুক্ত রাস্তায় প্রস্রাব করা এবং পশ্চিমাদেশে কোন নির্দ্দিষ্ট একটি ঘরে দরোজাহীন সারি সারি টয়লেট তৈরি করা এবং ব্যবহার করা।

কথা বলতে চাই ধর্ষণ নিয়ে। এ বিষয়ে অনেক লিখেছি, আরও লিখবো। হয়তো লিখতে লিখতে উত্যক্ত করে ছাড়বো এই সমাজ ব্যবস্থাকে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন জোয়ারের জলের মতো বাড়ছে ধর্ষণের মতো সহিংস ঘটনা। হাজারও ঘটনার মধ্যে দু’একটি চলে আসে প্রচার নিষেধের প্রাচীরের ফাঁকফোকর দিয়ে। আমরা কাঁদি, চিৎকার করি, প্রতিবাদ করি, অত:পর ক্লান্ত-বিষন্ন হয়ে থেমে যাই। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ঘেরাটোপে পড়ে ফিরে যেতে হয় ঘরে। এবারের বিষয়টি একটু ব্যতিক্রম। রাষ্ট্রের কাছে প্রতিকার চেয়েছিলাম, ধর্ষকের জন্য যেনে রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়। তো রাষ্ট্রতো এতো নিলর্জ্জ হতে পারে না। আমাদের আপামর জনগণের দাবিটা রেখেছে। কিন্তু সেই দাবি মেনে নেয়ার মাঝেই যে সবচেয়ে বড় শুভংকরের ফাঁকিটা লুকানো আছে, তা আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারবো।

বাংলাদেশের সমসাময়িককালে যতগুলি মহাগুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় চলছে ধর্ষণ তার মধ্যে প্রথম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিদিন প্রতিটা প্রহরে গণমাধ্যম ধর্ষণের খবরকে উপজীব্য করে তাদের ধর্ষকপ্রিয়তাকে তুঙ্গে উঠিয়ে ফেলেছে। সেখানে অনেক আলোচনা, অনেক ভালোচনা আমরা শুনতে পাই, দেখতেও পাই। তবে প্রতিকারের নির্দেশনা খুবই কম, আলোচনা হয় নাই বললেই চলে। কখনও কখনও দেখা যায়, একজন চিহ্নিত যৌননিপীড়ক বা ধর্ষকই আবার ধর্ষণ নিরোধের আলোচনা করেছে। ধর্ষণের চলমান এই উৎসবের সময় অনেক প্রতিবাদ হয়েছে, রাষ্ট্রের কাছে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে, রাষ্ট্র মোটাদাগে আইনও পাশ করেছে। কিন্তু প্রতিরোধের কোনো ডাক কেউ তেমনভাবে দেয়নি। প্রতিকার হিসেবে অনেকেই ভেবেছে, পারিবারিক শিক্ষা, প্রাইমারির শিক্ষার সাথে নৈতিক ও লিঙ্গ-বৈষম্যহীন শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নসহ আরও অনেক কার্যকরি পরামর্শ উঠে এসেছে। যদিও জানি প্রতিকারের পথটা অনেকখানিই বিলম্বিত। এর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। তবে কঠিন প্রতিরোধ কিন্তু সম্ভব মুহূর্তেই।

যে এলাকায় ধর্ষণ সংঘটিত হয় সেই এলাকার এবং আশেপাশে সামাজিক মানুষজন যদি সামাজিকভাবে ঐ ধর্ষককে বয়কট করে, যেমন কোনো পরিবার তার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবে না, কোনো দোকানদার তার কাছে কোনো পণ্য বিক্রয় বা ক্রয় করবে না, কোনো এলাকার যানবাহন তাকে বহন করবে না, কোনো ডাক্তার তার চিকিৎসা করবে না (মানবিক প্রয়োজনে চিকিৎসার দরকার হলে স্থানীয় থানার বা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি লাগবে) কোনো দর্জি তার পোষাক বানাবে না, কোনো সেলুন তার ক্ষৌরকর্ম করবে না, কোনো আইনজীবী তার হয়ে মামলা লড়বে না, ধর্ষণের তো নয়ই, অন্য মামলাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। কোনো ব্যাংক তার হিসাব পরিচালনা করবে না। যদি আগে ব্যাংক একাউন্ট থেকে থাকে তবে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার সাথে সাথে তা বন্ধ করে দেবে, তার জমানো টাকা ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুকে প্রদান করা হবে। অন্যথায় সরকারি কোষাগারে জমা হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা সনদ বাতিল করা হবে। তার পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্র বাতিল করা হবে। সে কোনোদিন ভোটাধিকার পাবে না। দেশের প্রতিটি থানায় ধর্ষকের জন্য আলাদা বোর্ড তৈরি হবে যেখানে তার ছবি টানানো থাকবে কমপক্ষে ১২ বছর এবং লেখা থাকবে সে মানবতাবিরোধী একজন ধর্ষক।

আমি নিশ্চিত রাষ্ট্র এবং সমাজ যদি এভাবে ধর্ষণের ঘটনাগুলি প্রতিরোধ করা শুরু করে তবে অতি অল্পসময়ে বাংলাদেশে ধষর্ণের প্রতিকার করা সম্ভব। আমি এও জানি সরকার বা সমাজ এত সাধুসন্ত নয় যে, সত্যিকারেই ধর্ষণের প্রতিকার চেয়ে প্রতিরোধের কঠিন বলয় গড়ে তুলবে। কারণ এদেশে ধর্ষণ যে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ সেই ধারণাই নেই, আর জনগণ সেটা বিশ্বাসও করে না। অথচ ধর্ষককে রক্ষা করাই যেনো আমাদের সুশীল সমাজের সংস্কৃতি। প্রতিরোধহীন সমাজ প্রতিকারহীন বিচার ব্যবস্থা এবং বিচারহীন সংস্কৃতি বাংলাদেশকে ধর্ষনের মহাযজ্ঞে পরিণত করেছে।

শেয়ার করুন:
  • 283
  •  
  •  
  •  
  •  
    283
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.