আত্মপলব্ধি

ফাহমিদা খানম:

আজকে নিয়ে তৃতীয়বারের মতো আমি নীতুর গায়ে হাত তুললেও কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না, বরং মনে হচ্ছে অকৃতজ্ঞ নারীকে যদি আমি মনের সুখে আচ্ছামতো পিটাইতে পারতাম মনের জ্বালা কিছুটা হলেও কমতো, ওকে ভালো রাখতে গিয়ে কতো কী ছেড়েছি, তবুও মনের লাগাম ধরতে পারলাম আর কই? বাইরে আড্ডা দেওয়া, বন্ধু-বান্ধব সবই ছেড়েছি তবুও –

“টেবিলে খাবার দিয়েছি, খেতে এসো”
নীতুর এই নির্বিকার ভাবটাই আমার সবচে বেশি অসহ্য লাগে, ফর্সা গালে আঙ্গুলের দাগ বসে আছে, তবুও সে কেন কিছুই বলবে না? এতো তেজ, দেমাগ কীসের? হ্যাঁ, সে রূপসী আর সেই সাথে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার মেয়ে – আগে মুগ্ধ হলেও এখন অসহ্যকর লাগে, কেনো কাঁদবে না? কেনো অনুনয় করবে না? এই নির্লিপ্ত ভাবই আমার এখন অসহ্য মনে হয়।

“আমার খিদে নেই, তুমি খেয়ে নাও গিয়ে”
“তুমিতো খিদে সহ্য করতে পারো না, আমি তো জানি”
“এতোই যখন বুঝো, তখন আমার কথামতোন কেনো চলো না? কেনো বন্ধুবান্ধবদের ছাড়তে পারছো না? আমি কি ছাড়িনি?”
“আমি তোমাকে অসংখ্যবার বুঝানোর চেষ্টা করে এখন ক্লান্ত আশিক, ওরা আমার শুধুই বন্ধু—অথচ তুমি অহেতুক সন্দেহ করো সবসময়ই”
“আমাকে ভালবাসলে এই ছাড়টুকু তুমি নিশ্চয় দিতে”
“শুধু তোমার ভাললাগাটুকুর প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমি যে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়েছি এটা কি তুমি বোঝো ?”
“আমি কি তোমার জন্যে কিছুই করিনি?”
“যদি বলি সেসব নিজের স্বার্থেই করেছ?”

কথাটি বলেই নীতু রুম থেকে বেরিয়ে গেলো, আমিও ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় টেবিলে পানি খেতে গিয়ে দেখি নীতু ডাইনিং টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছে – হয়তো আমার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে, দিনে সময় হয় না বলে রাতে একসাথেই খাই আর খাবার সময় নীতু সবসময়ই পাশে থাকে, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে খারাপ লাগলো, তারপরেই মনে হলো এই মেয়েটা না চাইতেই আমি কত কী করি, তবুও অকৃতজ্ঞই রয়ে গেলো!

নীতুর কথা – আশিক আমার গায়ে হাত তুললেও আমি ওকে ছেড়ে যাবার কথা কখনো কল্পনাই করতে পারি না, কারণ আমার যাওয়ার জায়গা আসলে নেই।

একই পাড়ায় আমাদের বাসা ছিলো –ওর সংগ্রাম আমরা নিজেরাই দেখেছি, শুনেছি এক্সিডেন্টে ওর বাবা যখন মারা যায় তখন ওরা খুবই ছোট ছিল, একটু বড় হবার পর ওর মামারা এক রকম জোর করেই ওর মাকে আবারও বিয়ে দেন কারণ আশিকের দাদীর সাথে মায়ের ঝগড়া লেগেই থাকতো আর বিয়ের পর উনি যতবার বাচ্চাদেরকে দেখতে বাসায় আসতেন ওর দাদী গেটই খুলতো না, কিন্তু বাসা থেকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন, ছেলের মৃত্যুর জন্যে উনাকে দায়ী করতেন, রাস্তার পাশে বসে উনি কাঁদছেন এই দৃশ্য দেখে পাড়ার মুরুব্বীরা কয়েকবার এগিয়ে গেলেও দরজা কখনই খুলতো না, এই দৃশ্য সবার এক সময় সয়ে গেলেও সেই মা তবুও আসতেন – তারপর একদিন সেই আসাটা কমে গেলো। দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন করার পর আশিক মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে পাড়ি জমায়, আস্তে আস্তে ওদের ভাগ্য বদলালেও দাদী মারা যাবার পর আশিক দেশে আসা কমিয়ে দেয়, ততদিনে ছোট ভাই বিয়ে করে সংসার শুরু করলেও আশিকের যে বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে এটা বলার মতোন আসলে কেউ ছিলো না –

আমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না হলেও হুট করে বাবার মৃত্যুতে আমরা অথৈ সাগরে পড়লাম, বাবার মৃত্যুর দুই মাস পর দেশে ফিরে আশিক বিয়ের প্রস্তাব দিলেও আমি একদমই রাজি ছিলাম না কারণ আমার চাইতে বয়সে অনেক বড় আর সত্যি বলতে কী আশিককে আমার ভয় লাগতো কেনো লাগতো সেটা আগে না বুঝলেও এখন বেশ বুঝি – অনার্স পড়া অবস্থায়ই আমার ওর সাথে বিয়ে হয়ে যায়, পারিপার্শ্বিকতা চিন্তা করে আমিও রাজি হয়েছিলাম।

বিয়ের পর নিজের বাসায় রাখলেও যাবার আগে আমাকে মায়ের কাছে রেখে আসে
“আমি যত দ্রুত সম্ভব তোমাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবো, ততদিন তুমি এখানেই থাকো, তোমাদের দায়িত্ব এখন আমার”
আশিক কথা রেখেছিল – ভালো অংকের টাকাই পাঠাতো কিন্তু কখনো সেসবের হিসাব চায়নি, বরং আমার ছোট তিন ভাইবোনদের পড়ালেখার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস ছিলো, আমি আবিষ্কার করলাম আমার পড়ার প্রতি ওর অনীহা আর কারও সাথে কথা বলাও পছন্দ করছে না, পরের বছর ফিরেই বাচ্চা নেবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠলো, আমার আপত্তিতে বলেই বসলো—

আমি নাকি ওর সংসার করবো না সেজন্যে বাচ্চা নিতে চাই না, পেটে বাচ্চা নিয়ে অনার্স দেবার পর আমার কাগজ-পত্র রেডি হয়ে গেলো, মায়ের ইচ্ছা ছিলো বাচ্চা হবার পর আমি যাতে যাই, কিন্তু সে নিজে এসে আমাকে নিয়ে গেলো। ও কখনো রান্নায় খুঁত ধরে না, কোনো কিছু নিয়ে কিচ্ছু বলে না, শুয়ে থাকলে নিজেই রান্না করে অথবা চা খাইতে মন চাইলে নিজেই বানিয়ে খায়, দোকান থেকে একগাদা জিনিস নিয়ে আসে অথচ সেসবে যে আমার আগ্রহ নেই এটাও বুঝে না –
“এসব জিনিস এনে টাকা নষ্ট করো কেন? গহনা বা কসমেটিক্সের প্রতি আমার মোহ নেই”
“অন্য মেয়েরা এসব পেলেই খুশী হয়, তুমি যেনো কেমন নীতু!”
“আমি ঘুরতে পছন্দ করি, আড্ডা দিতে পছন্দ করি”।

প্রথমে বাচ্চা ছোট ছিলো বলে তেমন বেরুতে পারতাম না, তবুও ওর কলিগদের বা বন্ধুদের বাসায় দাওয়াতে যেতাম বা আমাদের বাসায় কেউ না কেউ আসতোই কিন্তু প্রথম থেকেই আবিষ্কার করলাম কেউ আমার প্রশংসা করলে আশিকের চেহারায় একটা বিরক্তি ভাব চলে আসতো, এক বন্ধু হেসে বলেছিল –
“তুই দেখি হাঁটুর বয়সী মেয়ে বিয়ে করেছিস!”

ব্যস, সামান্য ছুতো ধরে সেই বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে দিলো। এভাবে ওর বন্ধুদের সাথে নিজেই দূরত্ব করলো – প্রথমে না বুঝলেও এক সময়ে বুঝে যাই আশিক আসলে হীনমন্যতায় ভুগছে, দুজনের বয়স, গায়ের রঙ আর উচ্চতা নিয়ে কেউ কিছু বললেই ওর রিএক্ট দেখাতো খুব – প্রথমে অনেক বুঝিয়েছি তারপর অনুনয় করতাম কোনো কাজই হয়নি বরং দাওয়াতে যাওয়া বা বাসায় দাওয়াত দেওয়া চুকিয়ে দিয়েছে, অথচ বুঝতেই চায়নি একা বিদেশে এভাবে থাকা যায় না, তারপর দেশে ফিরে আবার চেষ্টা করে ইতালি চলে এলো আমাকে নিয়ে, আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হলো না আর! স্বামী বা বাবা হিসাবে আশিক দায়িত্বশীল – ছুটির দিনে বাসার কাজে সাহায্য করে, আমার পরিবারের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্ববান শুধু আমার সাথেই সম্পর্কটা সহজ আর হলো না, রাজা-প্রজার মতোই শুধু চাপিয়ে দেয়া –

“তিন বছরের বেশি হয়ে গেলো, আমি বাবুকে নিয়ে একটু দেশে ঘুরতে যেতে চাই”
“আমি ছুটির জন্যে দরখাস্ত করবো, কিছুদিন সময় লাগবেই”
“আমি না হয় বাবুকে নিয়ে যাই তুমি পরে এসো”।

আশিক এমনভাবে তাকালো যেনো এমন উদ্ভট কথা সে জীবনেও শুনেনি, হ্যাঁ আমাকে একা এখন পর্যন্ত কোথাও যেতে দেয় না, এখানে এসে জব করতে চেয়েছিলাম – অনুমতি মেলেনি। দেশে বেড়াতে গেলেও কোথাও একা বেরুতে পারি না, সে সাথে থাকবেই! সবাই দেখে আর ভাবে, আশিক কতো কেয়ারিং টাইপ, অথচ আমি জানি, অনুভব করি এটা রোমান্টিকতা নাহ,  এটার চিকিৎসা দরকার, কিন্তু এটা বললেই ও প্রচণ্ডরকম রেগে যায়– অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ করে, আমার মনে পড়ে গেটের বাইরে ওর মা যখন দুই বাচ্চাকে দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতো, ভেতর থেকে এমনই গালিগালাজ সবাই শুনতাম। সবকিছু ছাপিয়ে যখন ভালবাসা হিংস্র হয়ে উঠে তখন দমবন্ধ হয় আসে, হাঁসফাঁস লাগে, অথচ মুক্তির পথটাও ঠিক জানা থাকে না, তখন ভুক্তভোগীই জানে সে ভালবাসা কতটা অসহনীয়!

শেয়ার করুন:
  • 83
  •  
  •  
  •  
  •  
    83
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.