ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব

তাছলিমা আক্তার:

মনস্তত্ত্ব বা মনোজগত যাই বলি না কেন বিজ্ঞানের ভাষায় আচরণকেই বোঝায়। প্রতিটি মানুষের আচরণ তৈরি হওয়ার সময় তার শৈশব। শিশুর বিকাশ বলতে শারীরিক, ভাষা, চিন্তাভাবনা এবং মানসিক পরিবর্তনের ক্রমকে বোঝায় যা জন্ম থেকে যৌবনের শুরু পর্যন্ত ঘটে। কিন্তু শূন্য থেকে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ব্যক্তিত্ব গঠনের মূল অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়। এসময়টাতে বাবা-মা পরিবারের সদস্য এবং পারিপার্শ্বিকতা অনেকটা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অনেকগুলো প্রভাবক কাজ করে যার মধ্যে রয়েছে জেনেটিক কিছু বিষয়, পরিবেশ, পাশাপশি শিশুর শেখার ক্ষমতা।

গত সাতদিনের বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রতিদিনে গড়ে ৫টি ঘটনা চোখে পড়ছিল ধর্ষণের। যখন মোটামুটি সব শ্রেণীর প্রতিবাদে উত্তাল দেশ। এতো প্রতিবাদ, আইনে পরির্তনের উদ্যোগ সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার নিম্নগামিতার কোন চিত্র আমার নজরে আসেনি। সমাধানের পথ হয়তো অজানা। ওপরের কথাগুলো এই অজানা পথকে খুঁজে নেয়ার প্রয়াস মাত্র।

প্রথমে এটি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন যে ধর্ষণ কোন আচরণমূলক বা মানসিক ব্যাধি নয়। এটি একটি অপরাধ এবং ফৌজদারী অপরাধ। মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি ধর্ষক হতে পারে, কিন্তু এটা প্রমাণিত যে এমন কোন ব্যাধি নাই যা মানুষকে ধর্ষকে রুপান্তর করে।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধে বাস করছে বিষাক্ত পৌরুষ। রাজনৈতিক ও সামাজিক এই ব্যাধি একদিনের তৈরি নয়। যুগ যুগের চর্চায় সমাজ কাঠামো, সংস্কুতির চর্চা আর ধর্মীয় লেবাসে জিইয়ে রাখা হয়েছে এই বিষ। ভাবার কোন অবকাশ নেই আমি আপনি এ থেকে মুক্ত। ধারণ, লালন, চর্চা বা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থনের মাধ্যমে এই বিষাক্ত পৌরুষের বেঁচে থাকা। নিজেকে প্রগতিশীলতার প্রলেপে উপস্থাপন করে প্রতিক্রিয়াশীলতার সূক্ষ আচরণ ক্ষমতা এবং বৈষম্যপূর্ণ সম্পর্ককে স্থায়ীত্বশীল করে।

২০২০ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা জরিপে বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া এক তথ্য অনুযায়ী ৩৫ ভাগ নারী যৌন সহিংসতার শিকার। জাতিসংঘ বলছে ৭০ ভাগ নারী তার জীবদ্দশায় শারীরিক এবং যৌন সহিয়সতার শিকার হন তার সহযোগীর মাধ্যমে। ক্ষমা করবেন ‘সহযোগী’ শব্দটির ব্যবহারে ত্রুটির কারণে।

ওটারবেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নর্ম শপ্যান্সার ২০১৪ সালে সাইকোলজি টুডে নিবন্ধে কেন পুরুষরা ধর্ষণ করে তার বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞানের কারণগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শপ্যান্সার-এর মতে ‘পুরুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী মনে করে: অতএব সে মনে করে সে ধর্ষণ করতে পারে’। যদিও খুব সূক্ষভাবে জীনগত কিছু বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে এখানে।

ধর্ষণকারী নারীকে যৌন সামগ্রী হিসেবে দেখে। তারা মনে করে নারী মাত্রই সে পুরুষের যৌন চাহিদা মেটাবে। যেকোন ধর্ষণের ঘটনা বেদনাদায়ক এবং যে নারী এই সহিংসতার শিকার হয় তার মানসিক অবস্থা ভয়াবহ পরিণতির দিকে যায়। সহিংসতার শিকার নারী কোন ক্ষেত্রে স্ব-ঘৃণা, স্ব-দোষ, ক্রোধের কারণে অনেক সময় পোস্ট ট্রমাটিক সিনড্রোমে পরিণত হয় (পিটিএসডি)। আমরা কি কখনো ধর্ষক সম্পর্কে ভেবেছি? একজন ধর্ষক তৈরিতে সমাজের কোন কোন কারণগুরো ভূমিকা পালন করে? একজন ধর্ষক সামজের যেকোনো শ্রেণী, পেশা এবং স্তরের হয়।

আমেরিকার সাইকোলজিস্ট ডঃ স্যামুয়েল স্মিথম্যান ৫০ জন ধর্ষকের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন যারা স্বীকার করেছিলেন যে তারা জীবনের কোন না কোন সময়ে ধর্ষণ করেছিলেন। এরা ছিল বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড, সামাজিক স্ট্যাটাস এবং বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের। ডঃ স্যামুয়েলকে অবাক করেছিল যে এ ধরনের ফৌজদারী অপরাধ করার পরও তারা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিলেন। ৫০ জন ধর্ষকের সাক্ষাতকার থেকে তিনি তাদের ব্যক্তিত্বের তিনটি বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন: সহানুভূতির অনুপস্থিতি, মাদকতা এবং নারীর প্রতি বৈরী মনোভাব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনিস রাজ্যের সাউথ ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের গবেষক শেরি হামবির মতে, ‘যৌন নিপীড়ন যৌন তৃপ্তি বা যৌন আগ্রহ থেকে প্রভাবশালী একধরনের মানসিকতা কাজ করে বা প্রভাব প্রতিপত্তির প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। যাকে তিনি একধরনের বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র বা পুরুষালী আচরণের বহি:প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন’

আমেরিকার সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের জার্নাল সাইকোলজি অফ ভায়োলেন্সের প্রতিষ্ঠাতা হামবি ব্যাখ্যা করেছিলেন কী করে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র ধর্ষণ সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়। তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নকারী অনেক পুরুষই মনে করেন সমবয়সীদের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো উচ্চতর যৌন অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং নিজের পুরুষত্ব প্রমাণ করা। যৌন সক্রিয়তা না থাকা প্রায়শ কলঙ্কজনক তাদের জন্য। অনেকে আতঙ্কে থাকেন যৌন অভিজ্ঞতা আবিস্কার না করার কারণে। তার মতে, এধরনের পিয়ার চাপ থেকে পুরুষ যৌন আপরাধী হয়ে উঠে। এছাড়াও সমাজ কাঠামো, সংস্কৃতি এবং মিডিয়ার বিভিন্ন পরিবেশনাও পুরুষকে পুরুষতন্ত্রের নকল আবরণে আবৃত করে তাকে নারীর উপর অধিপত্য বিস্তারে অনুপ্রাণিত করে। যাদের নারীর উপর আধিপত্য নেই বা অধিক যৌন সক্রিয়তা নেই তাদের কলঙ্কিত পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করে’।

প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ উত্তম। আমার চাই না একটি ঘটনাও। প্রতিরোধে সোচ্চার হই প্রতিটি আঙিনা থেকে। গাছের ফলো উৎপাটনের পাশাপাশি মূল উৎপাটনে এগিয়ে আসি সবাই। আমার শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠনে আমার ভূমিকা হোক অগ্রগামী।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী এবং ডেপুটি ম্যানেজার- উইমেন রাইটস এন্ড জেন্ডার ইক্যুইটি, এ্যাকশনএইড বাংলাদেশ

শেয়ার করুন:
  • 229
  •  
  •  
  •  
  •  
    229
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.