ইনবক্স থেকে ইনবক্স

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন:

কন্যা দিবসে…ফেসবুকে মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়া মেয়ের ছবি আপলোড করে এক ভদ্রলোক লিখলেন, আলোকিত মানুষ হও। একটু পরেই বন্ধুদের ইনবক্সে তিনি পাঠান কিছু অশোভন ছবি। ছবির মেয়েটির বয়স তার মেয়েরই বয়সী। ভদ্রলোক এক উচ্চপদস্থ কর্পোরেট কর্মকর্তা।

আরেকজন নিপাট ভদ্রলোক। রুচিশীল ব্যারিস্টার হিসেবে সমাজে রয়েছে তার সুনাম। সেই ভদ্রলোক তার সহকর্মীদের ইনবক্সে প্রতিদিন পাঠান অল্প বয়সী মেয়েদের ভিডিও। তারও কিন্তু আছে ক্লাস নাইনে পরা এক কিশোরী কন্যা।

ফেসবুকে সবাই তাকে জানে নারীবান্ধব, নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী এক ভদ্রলোক। নারীর সম্মানহানি ইস্যুতে বড়ই সোচ্চার এই বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। এ ভদ্রলোকের ম্যাসেঞ্জারও ভরা অশোভন সব ছবিতে। এসব ছবি দেখে শকড তার স্ত্রী-কন্যা। সম্প্রতি সারাদেশে ধর্ষণ বিরোধিতায় প্রায়ই নানা লেখা লিখছেন তিনি। ফেসবুকে লাইক কমেন্টও পড়ছে ভালোই। এই তিনি যখন এক অভিনেত্রীর বিয়ে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন, তখন হতাশ পাঠক। মধ্যরাতে ইনবক্সে এই ভদ্রলোকের নক করা নিয়ে ক্ষুব্ধ অনেক নারী।

সুপ্রিয় পাঠক, ঘটনাগুলো সবই সত্যি। এরকম অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে সমাজে, আমাদের পরিবারে। বুঝে না বুঝে পরিবারের চেনা মানুষগুলো নানা অশ্লীল/অশোভন ছবি পাঠাচ্ছেন এক ইনবক্স থেকে আরেক ইনবক্সে। যা সমস্যা বয়ে আনছে সম্পর্কে, পরিবারে, সামাজিকীকরণে। এসব ঘটনাগুলো জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তারা উদ্বিগ্ন তাদের চারপাশে চেনা মানুষগুলোর চেহারা বদলে যাচ্ছে দ্রুত। বীভৎস্য এক অচেনা রুপ ফুটে উঠছে তাদের মুখে। মুখ ও মুখোশ যেন আজ সর্বত্র। এ ধরনের আচরণ নিতে পারছেন না তারা। ফলে ঘটছে সেপারেশন, ডিভোর্সের মতো ঘটনা।

সমাজে শিক্ষিত ভদ্রলোক বলে যে মানুষগুলো পরিচিত তারাই যদি এধরনের রুচিহীন আচরণ করেন তাহলে এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে একবার ভেবেছেন কেউ? প্রশ্ন এক ভুক্তভোগী পরিবারের স্ত্রীর। ম্যাসেঞ্জারে হাসব্যান্ডের অশোভন ছবি পাঠানো দেখে তা সহ্য করতে না পেরে তিনি তার দুই সন্তানকে নিয়ে এখন আলাদা থাকেন। চাকরিজীবী তামাসসুম বলেন, কন্যা দিবসে ফেসবুক জুড়ে বাবা/মায়েরা দিয়েছেন কন্যার ছবি। সবাই দোয়া শুভাশিস চেয়েছেন নিজ নিজ কন্যার জন্য। তিনি বলেন, নিজ কন্যার পাশাপশি অন্য কন্যা সন্তানরাও যেন নিরাপদে থাকে সেটাই চাওয়া উচিত সবার। অথচ এদের কাউকে কাউকে চিনি, তাদের ২/১ জনের ইনবক্স চেক করে দেখেন। কী ভয়াবহ সব ছবি পাবেন। এরা আমাদের কাছে পাঠিয়েছে বলে তাদের সম্পর্কে জানতে পেরেছি। ইনবক্সও তো একটা সুস্থ মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, তাই নয় কি?

ফেসবুকে রুনা নামের একজন লিখেছেন, মানুষের বাইরের চেহারা দেখে মুগ্ধ হবেন না। তার ইনবক্স চেক করুন। মানসিকতা বুঝে যাবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী এক স্ত্রী বলেন, আমি একদিন আমার বরের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে অবাক। ও যে এতো অশোভন ছবি কোথাও পাঠাতে পারে আমার ধারণা ছিল না। আমাদের এক মেয়ে আছে। ও কীভাবে পারলো এমন ছবি দিতে! একটওু হাত কাঁপলো না! ঘরে এখন অশান্তি চলছে। ঘৃণায় কথা বলতে ইচ্ছে করে না আমার। ভাবলেই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। এতো পড়াশোনা করে রুচির এতো অধ:পতন কেন হবে, প্রশ্ন তার।

বেসরকারি কর্মকর্তা রিফাত বলেন, আমরা আসলে ভদ্রলোক সাজি। নীতিবাক্য দিয়ে ফেসবুক ভরিয়ে দেই। অথচ আমাদের মনেই অনেক অন্ধকার। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসে শ্বাপদের মুখ। নিজেদের আগে সংশোধন করতে হবে, তারপরে অন্যদের সমালোচনা করা উচিত। কমপিউটার ফার্মে কাজ করেন বনানী, তিনি বলেন, ইনবক্সে মাঝে মাঝে এমন সব ছবি আসে, বলার মতো না। অনেককে ব্লক করেছি। কতজনকে করবো? বালক কিশোর থেকে তরুণ সবার হাতে আজ মোবাইল। বয়স বাড়িয়ে ফেসবুকে একাউন্ট করছে শিশুরা। দেখার যেন কেউ নেই।

গৃহিনী আফরোজা বলেন, আমার মাথায় আসে না যেসব ছেলেরা এমন ছবি পাঠান তাদের কি একবারও খারাপ লাগে না? তার কি একবারও মনে হয় না এ বয়সী মেয়ে তার ঘরেও আছে? চাকরিজীবী রায়হান হাসান বলেন, সবার হাতে হাতে আজ স্মার্টফোন। ফলে মোবাইলের কারণে পর্নোগ্রাফি এমনভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে যার কুফল পেতে হচ্ছে আমাদের। সিলেট, খাগড়াছড়ি, গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, নোয়াখালি তার উদাহরণ। প্রেমে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা। খোদ রাজধানীতে নারীরা আজ যেন নিরাপদ নয়। হাসপাতালে স্বামীর জন্য রক্ত আনতে যেয়ে শ্লীলতাহানি ঘটে স্ত্রীর। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স থেকে শুরু করে নানা ভার্চুয়াল মাধ্যমে নারীদের উপস্থাপন করা হয় নেতিবাচকভাবে।

কলেজ ছাত্র সিফাত বলেন, আসলে বন্ধুদের সাথে মজা করতে করতে আজ ভার্চুয়াল জগত নেশার মতো হয়ে গেছে। একজন একটা ছবি পেলে তা শেয়ার করা হয় বিভিন্ন জনের কাছে। এটা নিছক মজা ভেবেই করি। এটা যে খারাপ তা আগে বুঝিনি।

সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন এডিসি মাহমুদা আফরোজ লাকী। তিনি বলেন, ম্যাসেঞ্জারে ভয়াবহ উত্যক্ততা বেড়ে গেছে। ইনবক্সে নানা বাজে বাজে ছবি পাঠায় অনেকে। সাইবার ক্রাইম নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর বিভিন্নজনের ইনবক্স চেক করে আমরা হতবাক। কী ভয়াবহ অবস্থা সেখানে! তিনি সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন। বিষয়গুলো চেপে না রেখে তিনি অভিযোগ করার পরামর্শ দেন। অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে বলেন সন্তানদের উপর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছূক এক অভিভাবক বলেন, ভার্চুয়াল ক্লাস করার ফলে সন্তানদের মোবাইল দিতে হয়। সবসময় খেয়াল রাখাও সম্ভব হয় না সে কী করছে। ক্লাশের ভিডিও দেখতে যেয়ে সে অনেক সময় পর্নোগ্রাফি নামিয়ে দেখে। এদিকটা সরকারের দেখা উচিত। এখনই বন্ধ করা উচিত এ সাইটগুলো। নইলে ভবিষ্যতে আমাদের সামনে আসবে এক অন্ধকার বিকৃতিময় সময়। তার দায় আমরা কেউ এড়াতে পারবো না। এই যে যৌন নিপীড়ন বন্ধ করা নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তা আসলে ঘর থেকেই শুরু করা দরকার। সবার আগে সংশোধন করতে হবে নিজেকে। আয়নায় দেখতে হবে নিজেরই মুখ। সে মুখ পুরুষতন্ত্রের হবে না মানুষের, তা আগে ঠিক করতে হবে। তার মতে, ঘরে যদি স্ত্রী কন্যা পুত্র সবাইকে সম্মান দেখানো যায়, একে অপরকে শ্রদ্ধা, সম্মান করা শেখানো যায়, ফেসবুক মেসেঞ্জার একান্ত গোপনীয় না করে তাতে যদি পরিবারের সবার সম্পৃক্ততা রাখা যায়, প্রাইভেসির অজুহাত দেখিয়ে পরিবারের সবাই সবার ফোন ধরার অলিখিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দেয়া যায়, তাহলে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে সব সম্পর্ক যখন সবার কাছে স্বচ্ছ থাকবে, পরিবার ও সমাজে সম্পর্কের জটিলতা তখন এমনিই কমে আসবে। তাতে কিছুটা হলেও কমবে নানা ধরনের নির্যাতন।

শেয়ার করুন:
  • 283
  •  
  •  
  •  
  •  
    283
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.