নারীকে সঠিক নিরাপত্তা দেওয়ার প্রথম দায়িত্ব রাষ্ট্রের

মুশফিকা লাইজু:

ধৃতরাষ্ট্রের এই দেশে গান্ধারী স্বেচ্ছায় অন্ধত্ব বরণ করে থাকবে এটাই বাস্তবতা। নারীর ‘সম্ভ্রম’ কিংবা নারীর ‘মর্যাদা’ ভূলুণ্ঠিত হবে সেটা কল্পনাতীত নয় কিন্তু। যুগযুগান্তরে পৌরাণিক ধৃতরাষ্ট্র আমাদের আজকের পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র- গান্ধারী ভূমিকায় অবতীর্ণ। রাষ্ট্র ধ্বজাধারী পুরুষতন্ত্রের মায়ায় ছায়ায় নিজের চোখ নিজে বেঁধে রেখেছে উন্নয়নের রঙিন রুমালে। আর সেই স্বেচ্ছান্ধ গান্ধারীর পাশে আছে কানা-খোঁড়া তোষামোদকারী মাকড়। নারী যেন সমাজের তামাশা- পুতুল। একটি গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যখন নারী, তখন রাষ্ট্রব্যবস্থা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো নারীকে স্বজ্ঞানে ঊনমানুষ করে রেখেছে।

সমাজের পুরুষতান্ত্রিক হেয় মানসিকতা বদলে দিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রধান। রাষ্ট্রের আইন-বিধি-শাসন এবং প্রশাসন চাইলেই সমাজ পরিবর্তনের গতিধারার ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। রাষ্ট্র চাইলে গণমানুষের কু-আচার সু-আচারে পরিনত করতে পারে। শুধু প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছা। যদিও আমাদের মত আধাশিক্ষিত গণতান্ত্রিক দেশে ভোটের কাঙালরা নিরন্নকাঙালের চেয়েও কাঙাল।

বর্তমান বাংলাদেশে একটি দিন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেদিন কোন না কোনো নারী খুন, ধর্ষণ এবং সহিংসতার শিকার হয়নি। চারিদিকে যেন ধর্ষণের মহোৎসব। যার একটি ঘটনার চেয়ে অন্যটা আরো দুর্ধর্ষ, আরো ভয়ঙ্কর, আরো দুঃসহ এবং আরো বেশি নির্মম-বেদনাদায়ক। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন নারী অধিকার সংস্থার ব্যানারে নারী নেত্রীদের নেতৃত্বে ক্ষমতায় থাকা সরকারকে জানান দেয়া হচ্ছে, নারীর প্রতি বৈষম্য, দুঃশাসন যথেষ্ট হয়েছে। এবার বদলাতে হবে আইন, সংশোধন করতে হবে সংবিধান, বদলাতে হবে প্রশাসনের নারীবান্ধবহীন মানসিকতা, ভিতর থেকে এবং বাইরে থেকে। নারীকে রাষ্ট্রের, সমাজের এবং ব্যক্তি জীবনের ভগ্নাংশ ভাবা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং রাষ্ট্র তা নিতে বাধ্য।

প্রতিদিনই সহিংসতার শিকার নারীদের আর্তনাদ বেড়েই চলেছে। ধর্ষক হিংস্র পুরুষেরা নিত্য নতুন ভয়ঙ্কর উপায় খুঁজে বের করছে নারীকে ছিন্নভিন্ন মর্যাদাহীন নিঃস্ব করে দেয়ার জন্য। রাষ্ট্র সে অবস্থায় মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্রে ভূমিকায় অবর্তীণ। আর ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল গান্ধারীর ভূমিকায় আছে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই পরপর কয়েকটি নারীর প্রতি নিষ্ঠুর সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র্র করে ফুঁসে উঠতে থাকে এদেশের সচেতন নাগরিক নারীরা সহযোদ্ধা হয় পুরুষেরাও। রাস্তায় বেরিয়ে এসে আন্দোলন শুরু করে তারা। ছাত্রনারী, গৃহীনারী, কর্মজীবি নারী সকলেই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে আন্দোলন জোরদার করে তুলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের অন্যান্য জেলাগুলিতেও শুরু হয় আন্দোলন। রাজনীতির বাইরে এসে শুধুমাত্র নারীর মর্যাদার লড়াইয়ের প্রশ্নে এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় অংশীদারী আন্দোলন। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দেড় সপ্তাহের বিবেচনায় ধর্ষনের শাস্তি স্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন পাশ করার ঘোষণা দেয়।

“দিনে হউক রাতে হউক সামলিয়ে রাখ চোখ” বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে এতবড় সামাজিক হুমকি এর আগে কখনও কেউ দেয়নি। এবং হুমকি দিয়ে এদেশের অপেক্ষাকৃত তরুণ নারী সমাজ কোন রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়াই মধ্যরাতে শতশত মশাল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসে, অবস্থান নেয় খোদ জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে। আন্দোলন থেকে মূলত সরকার এবং আচরিত সমাজ কে দুটো বার্তা দেয়া হয়েছে। এক, আমরা মধ্যরাতে সমাজ র্নিধারিত সান্ধ্য আইনের শিকল ভাঙলাম। আর দুই, সংসদ ভবন যেখান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় সেখানেই আমাদের আর্জি জানিয়ে গেলাম। প্রতীকীভাবে জানিয়ে দেয়া হলো, আমরা তোমাদের মধ্যরাতে নারীর বাইরে না বের হওয়ার সংস্কৃতি ভেঙে ফেললাম। আমরা নারীরা আমাদের প্রয়োজনে যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবে যখন ইচ্ছে তখন বাইরে বের হবো। আর রাষ্ট্র বাধ্য নারীদের নিরাপত্তা দিতে। আমরা রাষ্ট্রের শক্তিশালী অংশীদার। আমরা আমাদের সেই অংশীদারিত্বের মর্যাদা বুঝে নিতে চাই।

আগামী দিনে এই আন্দোলন আরো দুর্বার হবে এবং ইতিহাসে এই আলোকিত মশাল রাত্রি একটি উজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে লেখা থাকবে। বাংলাদেশের পরিবারগুলির অভিভাবকরা কি কখনও কল্পনা করেছে যে শত শত নারী একযোগে এই ভাবে মধ্যরাতে বের হয়ে আসবে তাদের স্বাধীকারের প্রশ্নে, নিজেদের সুরক্ষার দাবিতে! অত্যাচার যেখানে নিষ্ঠুর, প্রতিবাদ সেখানে দুর্বার, সেটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

নিজেকে ধন্যবাদ দেই এই ভেবে যে শতশত মশালের আলোর মাঝে আমিও ছিলাম কালের সাক্ষী হয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ নক্ষত্র হয়ে। আগামীতে নিঃসন্দেহে নারী অধিকারের লড়াইয়ে এই প্রতিবাদটি একটি সোনার পালক হয়ে অসংখ্য সফলতার পালকের সাথে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।

আদর্শ বিচ্যুত এই অন্ধ-বধিরের দেশের সরকার বুঝে গেছে নারীর চোখে রূপালী রুমাল বেঁধে বেশি দূর আর যাওয়া যাবে না, অক্টোবরের আন্দোলন শাসকদের সেই বার্তাই দিয়ে গেছে। নারীর নিরাপত্তা দিতে হবে তো বটেই, আর বাদ দিতে হবে নারীর প্রতি বৈষম্যপূর্ণ যা যা কালো আইন আছে। দিতে হবে নারীকে সম্পত্তির অধিকার, অভিভাবকত্বের অধিকার, সাক্ষ্যদানের সমান অধিকার। মোট কথা একজন উপযুক্ত (এলিজেবেল) নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে পুরুষ অতিরোক্ত নাগরিক অধিকার বা সুযোগ পায় নারীরও তা পাওনা। নারীকে তা সমানভাবে ভাগীদার এবং অংশীদার করতে হবে। কোন কারণ দেখিয়ে আর তাকে ঊনমানুষ করে রাখা যাবে না।

রাষ্ট্রকে ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, সে নারী এবং পুরুষ সকল নাগরিকের সম্মিলিত একটি পুঞ্জ। সুতরাং আইন, সুবিধা এবং সুযোগের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সমান। এখানে ধর্মেরপুচ্ছ নাচনো বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রের চোখে সকল নাগরিক হবে সমান। লিঙ্গ চিহ্নকে পুঁজি করে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার দিন শেষ করতে হবে।

সময়ের দাবি হিসেবে একটা হুমকি দিয়েই রাখি, যারা একবার রাজপথে নেমেছে, অধিকার বঞ্চিত করে তাদের আবার ঘরে শেকলবদ্ধ করা খুব সহজে সম্ভব হবে না বলেই মনে হয়। সরকার ব্যাবস্থায় টিকে থাকতে হলে বা আগামী র্নিবাচনের অংশগ্রহণ করার আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল যেন সে কথা মনে রাখে।

শেয়ার করুন:
  • 267
  •  
  •  
  •  
  •  
    267
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.