প্রতিবাদ নয়, বিচার চাই

পলি শাহীনা:

টানা এগারো ঘন্টা কাজ শেষে প্রাক সন্ধ্যার নরম আলো সাঁতরে বাসার পথে হাঁটছি, আর চোখের সামনে সদ্য বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক বর্বর, ভয়ংকর দৃশ্যগুলো ক্যামেরার রিলের মতো ভেসে চলছে। মস্তিষ্কের কোষে কোষে নৃশংস দৃশ্যগুলো ছড়িয়ে পড়ছে, গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে, আমি ঝড়ে বিধ্বস্ত ডানাভাঙা পাখীর মত তিরতির করে কাঁপছি। আমি প্রবাসী হলেও আমার পরিবার- আত্মীয়-স্বজন দেশে বসবাস করছেন। দেশের ভালো-মন্দ, আনন্দ-বেদনায় আমার শেকড়ে টান পড়ে, অনুভূতিতে নাড়া দেয়। দীর্ঘ সময় কাজ করে এতটা ক্লান্তি বোধ হয় না, যতটা ক্লান্ত লাগছে গত কয়েকদিন ধরে সিলেট, নোয়াখালী সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া বর্বর ঘটনাগুলোর কথা জেনে।

আমি একজন আহত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমার বাবা যখন তরুণ ছিলেন উনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। আমার বাবা সহ অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দেশে আজ মেয়েরা অনিরাপদ, ভাবতেই মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করি। আমার পূর্বপুরুষ তাঁদের তরুণ সময়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাঁদের মুখে সেসব আগুনঝরা দিনের কথা শুনে অনুপ্রাণিত হোতাম, আর এসময়ের তরুণ প্রজন্মের ভয়াবহ বিকৃতির অবস্থা জেনে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কোন কিছু আর ভালো লাগেনা। মন খারাপ থাকলে শরীরও খারাপ লাগে।

ক্লান্ত শরীরে কাজ থেকে ঘরে ফিরে আলো না জ্বেলেই শুয়ে পড়ি। অবসন্ন শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই আমি ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাই।

বাড়ীর সামনে লেজ নাচিয়ে কাঠবিড়ালিরা খুনসুটিতে মেতেছে, পাখীরা দলবেঁধে চক্রাকারে আকাশে উড়ছে, ওদের কিচিরমিচির শব্দে চারপাশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মেঘমুক্ত নীলাকাশ জুড়ে কাশফুলের মতো সাদা মেঘেদের ভেলা আনন্দে দুলছে, চেনা-অচেনা ফুলেদের সুবাস এসে নাকে লাগছে। প্রকৃতির যেন ঢলঢলে যৌবন কাল চলছে।

প্রকৃতির এতো এতো রূপ-লাবণ্যে বিমোহিত আমি জানালার গরাদে দোল খাওয়া পর্দা একপাশে সরিয়ে, প্রকৃতির গায়ে হেলান দিয়ে একটি প্রণয়ের কবিতা লিখতে বসেছি। সাদা কাগজের বুকে ঝর্ণা কলমের কালো কালিতে ‘ মুগ্ধ ‘ শব্দটি লিখি। পুরো বাক্য তখনো শেষ করতে পারিনি, ভাবনাকে ঝলমলে একটি পরিপূর্ণ ব্যক্যে রুপ দিতে ভাবছি আর ভাবছি। অমনি সাদা কাগজের বুক ফুঁড়ে শব্দের ভেতর থেকে বর্ণগুলো চোখের সামনে নড়েচড়ে উঠে। আমি চোখ কচলাই। একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি দেখে মনে হলো, আমি বোধ হয় হ্যালুচিনেশনে ভুগছি। মনে মনে ভাবনাটির ইতি না টানতেই আমার চারপাশজুড়ে একটা গমগমে শব্দ শুনতে পেলাম। আমি দুলতে থাকি। কোন আলো নেই। অদ্ভুত এক নীরবতা নেমেছে। মনে হচ্ছে আমি একটা অন্ধকার টানেলের ভেতরে আছি। গমগমে শব্দ আস্তে আস্তে আরো তীব্র এবং স্পষ্ট হচ্ছে।

কে যেন আমায় নাম ধরে ডাকছে আর বলছে – পৃথিবী ও প্রকৃতির এমন ঘোরলাগা সৌন্দর্যে তোমার মতো আমিও বিমোহিত হয়ে কবিতা- গল্প লিখতে বসতাম বলে – হা হা করে বিদ্রুপের হাসিতে ভেঙে পড়লো।

কে? কে? বলে আমি ডানে- বামে তাকাই। কাউকে দেখতে পাই না। বরফের মতো জমে যাওয়া নিশ্চল, নিশ্চুপ আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি একটি কংকাল দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে পথ দেখিয়ে ঘরের সাথের লাগোয়া বারান্দায় নিয়ে যায়। তাকে অনুসরণ করে আমি হাঁটছি আর ঘামছি।

কংকালটির হাসির শব্দ ক্রমশ বেড়েই চলছে, হাসির ধ্বণিতে মুখরিত বারান্দায় আমি জড়োসড়ো দাঁড়িয়ে আছি। কংকালটি একবারে আমার নাক বরাবর মুখের সামনে এসে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো- আমাকে চিনতে পেরেছো?
নিরুত্তর আমার কানের কাছে এসে কংকালটি খিলখিল করে হাসতে থাকে আর বলে,
এর মধ্যেই বুঝি ভুলে গেছো?
অবশ্য রক্ত-মাংসহীন কংকাল এই আমাকে চিনতে না পারার – ই কথা!

আমি তনু! একদা তোমার ফেসবুকের ওয়ালে, প্রোফাইল পিকচারে ঝুলে ছিলাম বেশ অনেকদিন! শুধু তোমার ফেসবুক ওয়ালে নয়, তোমার মত আরো অনেকের ওয়ালে, প্রোফাইল পিকচারের অন্ধকারে, রাজপথে মিছিলে, প্রতিবাদে আমি কয়েক সপ্তাহ ঝুলে ছিলাম! আমাকে নিয়ে তুমি এবং তোমরা বেশ কয়েকটি প্রতিবাদের কবিতাও লিখেছো! ফেসবুকে কয়েকদিন জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়েছো!
আমার জন্য তুমি মাঝরাতে কতদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছো – সে তুমি আজ আমাকে চিনতেই পারছো না! একবারে ভুলেই গেছো দেখছি – বলে কংকালটি এবার ঝর্ণার মতো কলবলিয়ে অনর্গল হাসতে থাকে।

কিছু সময় পর হাসি থামিয়ে শান্ত স্বরে বলে – তুমি চিনতে পারোনি বলে আমার মন একদম খারাপ হয়নি, তোমাকে এজন্য দোষও দেবো না। কারণ এখন আমার তনু পরিচয়ের সঙ্গে আরো অসংখ্য নতুন পরিচয় যোগ হয়েছে। তুমি আর কয়জনের নাম- ই বা মনে রাখবে? মানুষ বিস্মৃতিপরায়ণ, ভুলে যায়। মানুষের মনে রাখার ক্ষমতাও সীমিত। সহ্য করতে কর‍তে একসময় মানুষের বোধ, অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায়।

আয়েশা, পূর্ণিমা, তানহা, বিশ্বজিত, অভিজিত, দীপন, রাজন, সৌরভ, নূসরাত, আবরার….. এমন অসংখ্য নতুন পরিচয়ের ভীড়ে জানি আমাকে মনে রাখা কষ্টকর! একেকটি গুম, হত্যা, ধর্ষণ হয় আর তোমরা কয়েকদিন হৈ চৈ প্রতিবাদ করো। ব্যাস, এই পর্যন্তই! এরপর অন্য কোন রঙিন উৎসবের মোহনায় ভুলে যাও আমাকে, আমাদেরকে!

কংকালটি এবার অগ্নিমূর্তির রুপ নেয় আর আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার দু’চোখের কোঠর হতে আগুনের স্ফূলিঙ্গ বেরিয়ে আসে। ভয়ে আমি দেয়াল ঘেঁষে ঠকঠক কাঁপতে থাকি। আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমার আর কোথাও পালাবার জায়গা নেই। কংকালটি আমার মুখের সামনে এসে চিৎকার করে বলতে থাকে – প্রতিবাদ নয় বিচার চাই! সান্ত্বনা নয় যথাযথ বিচার চাই!

প্রোফাইল পিকচার অন্ধকার করে, কয়েকটি প্রতিবাদী কবিতা আর ফেসবুক স্টেটাস লিখে যদি তোমরা থেমে যাও, ভুলে যাও, মনে রেখো সেদিন আর বেশী দূরে নয়, যেদিন তোমরাও একে একে সকলে ফেঁসে যাবে একই বিচারহীনতার নরকে! যে নরক যন্ত্রণায় বিনা অপরাধে আজ আমি, আমরা মরেছি, পুড়েছি, ধর্ষিত হয়েছি, গুম হয়েছি, সেদিন বেশী দূরে নয়, একইভাবে তোমাকে, তোমাদেরকেও মরতে হবে! ধর্ষিতা নয় ধর্ষকের ছবি শেয়ার করো। অন্ধকারে নয় আলোতে এসে শরীরের সব শক্তি কন্ঠে জড়ো করে ধর্ষকের বিচার নিশ্চিত করো। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ভাবে ধর্ষককে বয়কট করো!

কংকালটির ভয়ার্ত চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে যায়। এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে বসি। টলতে টলতে আমি জল পান করি। স্বপ্নের কথা ভেবে যন্ত্রণা বুকে অন্ধকারে জড়োসড়ো হয়ে থাকি।

আজ ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। কাজ করার সময় সারাদিন গত বছর নৃশংসভাবে খুন হওয়া আবরারের বাবা-মায়ের মুখটি চোখে ভেসেছে। না, আবরারকে আমি চিনি না। আসলে আমি তনু, আয়েশা, পূর্ণিমা, তানহা, বিশ্বজিত, অভিজিত, দীপন, রাজন, সৌরভ, নূসরাত…এঁদের কাউকে চিনি না। কিন্তু ওঁদের কথা ভাবলেই আমার চোখের মণিতে ভেসে উঠে আমার মেয়ে, বোন, মায়ের মুখখানি। তখন আর স্থির থাকতে পারি না, মানসিকভাবে বিকারগস্ত হয়ে পড়ি।

গত কয়েকদিন ধরে নোয়াখালীতে সংঘটিত ধর্ষণ, নির্যাতনের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে উত্তাল হতে দেখেছি। বর্বরোচিত ভিডিওটি দেখার সাহস আমার হয়নি। সবার লেখায়, মুখে বর্ণনা শুনেই আমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠেছে। ঘটনাটি কল্পনা করলেই আমার শরীরে কাঁটা দেয়। মাথা ঝিমঝিম করে উঠে।
প্রতিবাদ, শোক প্রকাশের প্রতীক হিসেবে প্রোফাইল পিকচার অন্ধকার করার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রতিটি ধর্ষণ, অন্যায়ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পক্ষে, বিচারের পক্ষে। আমার স্বপ্নে আসা তনুর মতো আমিও যথাযথ বিচার চাই! প্রোফাইল পিকচার অনেক অন্ধকার করেছি, অন্ধকারে অসহায়ের মতো কেঁদেছি, কয়েকদিন পর জাগতিক নিয়মে ভুলেও গেছি। এভাবে ভুলে যেতে যেতে ভাবছি, পরবর্তী সংখ্যায় কবে যে আমার নাম যুক্ত হবে, কী জানি?

শুধু ধর্ষণ নয় প্রতিটি অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া চাই, যে বিচারের কথা ভেবে সামনের দিনে অপরাধী নিজেকে শুধরে নিবে, অপরাধের জন্য এক পা আগালে দশ পা পিছিয়ে যাবে। ধর্ষকের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। খুব দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যেন ধর্ষক কোনভাবেই পার না হতে পারে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি একের পর এক অপরাধের জন্ম দেয়।

আমাদের সকলের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও ভীষণ জরুরী। মায়ের পেট থেকে কেউ ধর্ষক, অন্যায়কারী হয়ে জন্মায় না। জন্মের পর ধীরে ধীরে বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় একেকজন ধর্ষক, অন্যায়কারী হয়ে উঠে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে রাষ্ট্র এবং সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে পরিবারও পড়ে। প্রথমে পরিবার থেকেই পুত্র সন্তানটিকে মেয়েদেরকে সম্মান করা শেখাতে হবে। পরিবার থেকে ছেলেকে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার করার শিক্ষা দিতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা একেকজন ধর্ষক তৈরি করে। যে কারণে যুদ্ধে নারী বেশী লাঞ্চিত হয়। পুরুষালি মনোভাব বর্জনের শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। জন্মের পর প্রতিটি মানব শিশুকে নারী বা পুরুষ হতে শেখানোর আগে মানুষ হতে শেখানোর দায়িত্ব পরিবারের।

আদতে পুরুষ ধর্ষণ করে না, ধর্ষণ করে ধর্ষক৷ ধর্ষকের কোন জাত নেই। পুরুষ এবং নারী একে অন্যের পরিপূরক, পরস্পরের কাছে সম্মানের দাবীদার। আমরা যদি একে একে নিজেদেরকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি, ভেতরের ভয়ংকর দানবটাকে মেরে ফেলি, মানবিক গুণে প্রস্ফুটিত হই, অচিরেই জগৎ বদলে যাবেই, বদলে যেতে বাধ্য। অপরাধী কোন ভিনগ্রহের প্রাণী নয়, আমাদের ছত্রছায়ায় বসত করে অপরাধী।

স্বপ্ন দেখি সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমার বাংলাদেশ তথা গোটা পৃথিবী শীঘ্রই মুক্তি পাবে ধর্ষণ সহ সব ধরণের অন্যায় কার্যকলাপ থেকে।

(লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে ‘সাপ্তাহিক বাঙালী’ তে প্রকাশিত)

শেয়ার করুন:
  • 35
  •  
  •  
  •  
  •  
    35
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.