এতো অবদান সত্ত্বেও নারী কেন অবাঞ্ছিত?

আসলাম আহমাদ খান:

বৈচিত্র্যময় এই পৃথিবী মানুষের পদচিহ্ন ছাড়া বড়ই একেলা। সেই বৈচিত্র্যের  একটি বড় অংশ নারী। বৃক্ষ-লতা-ফুল-ফল প্রকৃতিতে যেমন প্রাণের প্রবাহ আনে, মানব জীবনে নারীও তেমনি। নারী জীবন সৃষ্টি করে, জীবনকে লালন করে, এজন্য মানব জীবনে নারীর অবদান প্রকৃতির মতো। কখনও মাতৃরূপে, কখনও প্রিয়তমা, কখনোবা বন্ধু হয়ে মমতার বন্ধনে সমৃদ্ধ করেছে মানব জীবন। শুধু মমতা আর ভালোবাসায় নয়, যোগ্যতা গুণেও নারীর আসন শ্রদ্ধা ও সম্মানের। নারীরা আমাদেরকে একটি সভ্য সমাজ উপহার দিয়েছে। কৃষিকাজের সূচনার মাধ্যমে সভ্যতার সূচনা করেছে নারী। এক সময় আমাদের পরিবারগুলো ছিল মাতৃতান্দ্রিক। অর্থাৎ পরিবারের নেতৃত্ব ছিল নারীর হাতে। সমাজ বিবর্তনের কোন এক পর্যায়ে সে নেতৃত্ব হাতছাড়া হয়ে পুরুষের হাতে চলে গেলেও সমাজ সংসারে নারীর অবদান চলমান।

আমার মমতাময়ী মা-কে জানি, যিনি তাঁর সারাটি জীবন ব্যয় করেছেন আমার কৃষক বাবার সংসারের উন্নয়নে। কৃষি শ্রমিকদের তিনবেলা রান্না, দশ সন্তানের পড়াশুনার তদারকি সহ বিশাল সংসার সামলাতে হয়েছে এক হাতে। আমার সাথে ঘর বেঁধেছেন এক মমতাময়ী নারী, যে কিনা ২০ বছর ধরে আমার সুখ দু:খ আনন্দ-বেদনার সাথী। সংসারে মতবিরোধ হয় , মান-অভিমান হয়, কিন্তু পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ একটুও কমে না। বরং ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দুটোই জ্যামিতিক গতিতে উর্ধ্বমুখী। সে আমাকে চাঁদের মতো দুটি সন্তান উপহার দিয়েছে। ঘর সামলানোর পাশাপাশি চাকুরী করে পরিবারের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রেখেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় ছোট্ট সংসারই তার আসল পৃথিবী। কিছু কিছু ঋণ আছে শুধু স্বীকার করা যায়, শোধ করা যায় না; কথাগুলি বলার মাধ্যমে আমার মমতাময়ী মা ও স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে ঋণ স্বীকার করে নিলাম।

এইতো মাত্র কয়েক মাস আগের কথা, কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছি, এলমার্স্ট স্টেশনে এসে দেখি সাময়িকভাবে ট্রেন বন্ধ। বয়স্ক এক হিস্পানিক অতি নেশায় টলমটাল হয়ে প্লাটফর্ম থেকে নিচে পড়ে গেছে। রক্তাক্ত অবস্থায় কিছু মানুষ টেনে তুললো। ট্রেন অপারেটর ও কনডাক্টর এম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করছে। অনেক মানুষ স্টেশনে দাঁড়ানো, কিন্তু কেউই ভয়ে রক্তাক্ত লোকটির পাশে যাচ্ছে না। স্টেশনে অপেক্ষারত দুজন নারী স্পটে এসে হাজির হলো, যাদের একজন হিস্পানিক অপরজন ইন্ডিয়ান। লোকটাকে দেখে চিন্তা করার ন্যূনতম সময় না নিয়ে রোগীর শুশ্রুষায় ব্যস্ত হয়ে গেলো। রক্ত পড়া বন্ধ করতে হিস্পানিক তরুণীটি কিছু একটা খুঁজছিলো , ইন্ডিয়ান মেয়েটি তার গায়ের ওড়না দিয়ে দ্রুত লোকটির মাথা পেঁচিয়ে দিলো। স্টেশনে শত শত মানুষ থাকতেও দুজন নারীকেই কেন এ কাজটি করতে হলো ? আর কিছুই না মমতা ! আর এ মমতা গুণেই নারীর স্থান সবার উর্ধ্বে। কিন্তু দু:খজনক বিষয় হচ্ছে, যে নারী তাঁর মহত্ত্বের সর্বস্ব দিয়ে সাজিয়েছে এই পৃথিবী, তাঁরাই সবচে বেশী বঞ্চিত ও নিপীড়িত। যুদ্ধে নির্যাতিত বীরাঙ্গনা নারীদের নিয়ে কবি মনোয়ার সুলতানের কবিতার কথা মনে পড়ছে,
“ তোমার মহত্ত্বের সর্বস্ব দিয়ে, সাজালে এ জীবন
কবিতার মতো স্পর্ধা ঢেলে আমাকে অহংকারী করে বানিয়ে সম্পন্ন মানুষ তুমি আজ অবাঞ্ছিত- সে কার দোষ ?”…

সত্যি, যুদ্ধ সহ সমাজের প্রতি পদে পদে বিনা দোষে নারীরা কেন অবাঞ্ছিত ? – জোরেশোরে সে উপলব্ধি জাগ্রত করার সময় এসেছে।’ Nothing wrong in war and love’
এমন অসভ্য শ্লোগানে যুগে-যুগে, দেশে-দেশে , রাজায়-রাজায় , গোত্রে- গোত্রে যুদ্ধ সহিংসতার বলি হয়েছে নিরপরাধ নারী। যুদ্ধে বিজিত পক্ষের ধন সম্পদের সাথে নারীদেরকেও লুটের মাল হিসেবে তুলে নিয়ে উৎপীড়ন করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষণকে ব্যবহার করা হয়েছে অস্ত্র হিসেবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন নিরপরাধ নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধাও রয়েছে।*১

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শুধুমাত্র সোভিয়েত রেড আর্মি কর্তৃক ধর্ষণের ফলে তিন লক্ষ যুদ্ধ শিশুর জন্ম হয়। *২
একই যুদ্ধে জার্মানির সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণকালে এক কোটিরও বেশিসংখ্যক সোভিয়েত নারী জার্মান সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন এবং এর ফলে ৭,৫০,০০০ থেকে ১০,০০,০০০ যুদ্ধশিশুর জন্ম হয়। *৩

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ইসলামী রাষ্ট্র রক্ষার নামে পাকিস্তানী হানাদার কর্তৃক আড়াই লক্ষ মা-বোন ধর্ষণের শিকার হয়েছ, যার ক্ষতচিহ্ন জাতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। ১৯৭১ এর গ্যাং রেইপ এর ফসল যুদ্ধশিশুরা বিভিন্ন দেশ থেকে আজও বাংলাদেশে আসছে আত্মপরিচয়ের সন্ধানে। সেই ক্ষত কাটতে না কাটতেই রাজনীতি ও সমাজ নীতির নামে ধর্ষণকে মহামারীতে পরিণত করেছে মানুষরূপী কিছু পিশাচ। কখনও মাথায় শয়তান ভর করার অজুহাত দিয়ে, কখনো নারীর পোশাকের অজুহাত দিয়ে পুরুষ নামধারী কিছু বর্বর তাদের ঘৃণ্য বিকৃত বাসনা পূরণ করছে।

সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে অসুন্দর অনেক কিছুই আমরা সমাজ এবং মানব মস্তিষ্ক থেকে ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু ধর্ষণ নামক জৈবিক বিষ এখনও কিছু মানুষের মগজে রয়ে গেছে, অনুকূল পরিবেশ পেলেই ফণা তোলে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সিলেট ও নোয়াখালি সহ বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া গণধর্ষণ সেটাই প্রমাণ করে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এ ধরনের কাজে সমর্থন না থাকলেও নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না।

ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রয়োগের অভাবে অকার্যকর , গণদাবীর প্রেক্ষিতে এখন যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার প্রস্তাব পাশ হয়ে গেছে। এর পরেও ধর্ষণ বন্ধ হবে সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। কারণ রোগ যখন এডভান্সড লেভেলে চলে যায়, তখন কোন থেরাপিই কাজ করে না। তাছাড়া সঠিক রোগ নির্ণয় না করতে পারলে কোন চিকিৎসাই রোগীর উপকারে আসবে না। ধর্ষণের ক্ষেত্রেও তা। অর্থাৎ সমস্যাটির যেখানে উৎপত্তি- সেখানে হাত দিচ্ছি না।

একটা শিশু সমাজে জন্মগ্রহণ করার পর অন্যান্য আচরণের মতো নারীর প্রতি কী ধরণের আচরণ করতে হবে সে শিক্ষাটাও পরিবার ও সমাজ থেকে পায়। পরিবারে যখন একটা ছেলে শিশুকে মেয়ে শিশুর তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, তখনই ছেলে শিশুটি জেনে যায় তার অবস্থান মেয়ে শিশুটির ওপরে। অর্থাৎ একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের শুরুতে শিশু মনস্তত্বের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয় নারী- পুরুষের বৈষম্য। নারীর প্রতি অসম্মানের ধারণাটা সেখান থেকেই তৈরি হয়। কাজেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে শিশুর প্রাথমিক শিক্ষালয় পরিবার থেকেই। পরিবারেই শিশুকে শেখাতে হবে মানুষের জৈবিক চাহিদা কোন লজ্জার বিষয় না, বরং খাওয়া ও ঘুমের মতোই একটি স্বাভাবিক চাহিদা, যা পেতে হবে নারীর মন জয় করে- জোর জবরদস্তি করে নয়। সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতি রেখে দিতে হবে যৌনতার শিক্ষা।

পরিবারের পরে শিশুর সামাজিকীকরণের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষালয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ আইন মানে রাষ্ট্রীয় শাস্তির ভয়ে, কিন্তু ধর্মীয় বিধি-বিধান মানে সৃষ্টিকর্তার ভয়ে। যে কারণে অপরাধ সংঘটনের অনুকূল পরিবেশ থাকলেও সৃষ্টিকর্তা দেখছেন এ ভয়ে অপরাধ কর্ম থেকে বিরত থাকে।

পবিত্র ইসলাম ধর্মেও সমাজে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। প্রাক-ইসলামি যুগে নারীর যখন কোনো সামাজিক অধিকার ও সম্মানবোধ ছিল না, যখন নবজাত কন্যাশিশুকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো এবং পুরুষেরা নারীকে শুধু ভোগের জন্য ব্যবহার করতো, তখন মহানবী (সা.) সৎ কর্মে নারী ও পুরুষের সমমর্যাদার কথা বলেছেন। তিনি মানুষকে জানিয়ে দিলেন, ‘পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে কেউ সৎ কাজ করলে ও মুমিন হলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও জুলুম করা হবে না।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৪)
নবী করিম (সা.) স্বয়ং নারীদের শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্বের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে নারীদের উদ্দেশে শিক্ষামূলক ভাষণ দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ।’ (ইবনে মাজা)
ইসলাম নারীদের আবশ্যিক শিক্ষা, ধর্মচিন্তা, কর্মের স্বাধীনতাসহ পাত্র নির্বাচন ও সম্মতি প্রদানের অধিকার দিয়েছে। বিবাহের সময় অবিবাহিতা, তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবাদের মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে।**

কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে যথাযথ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে না। অধিকাংশ ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল থেকে নারীর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, নারীকে অসম্মান করে তেঁতুলের সাথে তুলনা করা হয়, যার প্রভাব ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে, সে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ কিভাবে আশা করেন ? কাজেই পরিবর্তন আনতে হবে ধর্মীয় শিক্ষাতেও।

উপরের আলোচনার মর্মকথা হচ্ছে, একটি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও নীতি নৈতিকতা বিকাশের শুরুতে যতদিন আমরা নারীকে সমমর্যাদা দেয়ার শিক্ষা না দিতে পারবো, ততোদিন ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন কোনটিই বন্ধ হবে না। যে ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে শিশু একদিন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার হবে, তার কাছ থেকে বাঞ্ছিত আচরণ প্রত্যাশা দুরাশা মাত্র। রাতারাতি পরিবর্তন হয়তো হবে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুফল অবশ্যই পাওয়া যাবে।

আসলাম আহমাদ খান
নিউ ইয়র্ক।

তথ্যসূত্র: *১ The Guardian , wed 1 May 2002
*২ Deutche Welle , 2015
*৩ Wikipedia
** দৈনিক প্রথম আলো, ৬ মার্চ ২০১৪

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.