বিয়েটা হোক পছন্দের ভার্সন, চাপিয়ে দেয়ার নয়!

পৌষালী সেনগুপ্ত:

এই লেখাটি, আমাদের সমাজের কূপমুন্ডক ব্যবহারের ওপর আলো ফেলার আমার একটি ছোট্ট প্রয়াস। জীবন একটাই। এবং, সেটা সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার আমাদের সবার আছে বলেই আমি মনে করি। আমরা কথায় কথায় অনেক কিছুই বলি, তাই না? সমাজ শুধরিয়ে ফেলবো, মেয়েদের নিজস্ব জগত দেবো, তারা যেন নিজেদের মতো বাঁচতে পারে — ইত্যাদি কতকিছু! একটা মানুষ, ছেলে বা মেয়ে, বা এই বাইনারি ম্যাট্রিক্সের বাইরের যে কেউ, যে কেউই যেদিন সম্পূর্ণ সুস্থভাবে, নিজের পছন্দমতো বাঁচতে পারবে — সেদিন হয়তো নিজেদের ভদ্র, সভ্য, এসব বড় বড় ভূষণে ভূষিত করার অধিকার অর্জন করতে পারবো আমরা, তার আগে নয়!

আপনারা একই পাকেচক্রে বেশিরভাগ লোক ঘুরে যাচ্ছেন। সেই এক বাঁধা গতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছে বছরের পর বছর। আর আপনারা হঠাৎ হঠাৎ করে চেঁচান, “কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না! আমাদের এসব পাল্টাতে হবে, ঠিক করতে হবে সব!”

“Change is the only Constant.”

“Be the change you wish to see/want/deserve!”

এইসব গালভরা কোটেশনগুলো আওড়াতে খুব ভালোলাগে, তাই না?

হ্যাঁ, সেইইই!
ওইটুকুই করবেন আপনারা, কারণ আসলে তো পারেননা আর কিছু। করার বেলা ঠিক এর উল্টোটা করেন! অসভ্যতামোর লিমিট ক্রস করা মানুষজন, ভদ্রতা আর আত্মীয়তার মুখোশ পরে, কতশত মানুষের জীবনে কর্তৃত্ব ফলিয়ে শেষ করে দিচ্ছেন সেইসব প্রাণদের, যারাই একটু অন্যভাবে বাঁচতে চেয়েছে বা চাইছে, তার ইয়ত্তা নেই!

অনেকেই খুব তো বলেন, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদির কথা। পড়ান, বাচ্চা মেয়ে জন্মালে। পড়াশোনা, শিক্ষার দাম আছে!
কেন? ডিগ্রীধারী হয়ে “বিয়ের বাজার”-এ দাম পাওয়ার জন্য!
উঁহু, না না, আমাকে আক্রমণ করতে আসবেন না, দাঁড়ান!
সেটাই তো শেখান, নিজেরাও মানেন সর্বতোভাবে এই ২০২০ সালে এসেও!

“বিয়ে” — না হলে নাকি একটা মেয়ে একদম অসহায়! তার জীবন বৃথা ; তা সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, প্রফেসর, বা যে কোনো পেশাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাক! সৃজনশীল পথ অনুসরণ করে চলা মানুষটি তো আরোই অসহায় মনে হয়, তাই না?

সেই চরম মোক্ষলাভের জন্য তাদের নিজ গণ্ডির বাইরে একদম অচেনা, বিদঘুটে লোকজন, পরিবেশের মধ্যে ঠেলে দিতে একটুও অসুবিধে হয় না আপনাদের। কারণ, “সংসার ধর্ম পালন”, “মাতৃত্ব, বিয়ের পর!” — এইগুলোই মোক্ষম, আপনাদের মতে একটা মেয়ের জীবনে!

অনেকে তো পড়ানোর হ্যাপাটুকুও নেন না। বিয়ে দিয়ে “বেড়াল পার”!

কেন? কেন?
একজীবনে মানুষের আর কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না? তাকে আপনারা বিয়ের ভুজুং দিয়েই আটকাবেন, কেন?
সে হাঁটবে, চলবে, কথা বলবে, নিশ্বাস নেবে কিনা — নিলেও কতটুকু, কতক্ষণ , সব সওওব আপনারাই ঠিক করে দেবেন?
তারপর গাট্টিবোঁচকা বেঁধে, অন্য জায়গায় দিয়ে, আপনাদের দায় শেষ! আহ! নিশ্চিন্ত। বিশাআআল একটা কাজ করে ফেলেছি, এমন ভাব করে ফেলেন!

তারপর, মেয়েটির কোনোভাবে অসুবিধা হোক — তার আর পালাবার পথ নেই। কোথায় যাবেই বা সে? যে বাড়ির লোকরা তাকে আজীবন জায়গা দিতে না পেরে অন্যত্র পার করেছে, তাদের কাছে ফিরবে? সত্যিই?

মরে গেলে অথচ তারাই মরাকান্না কাঁদতে আসে, বা ডিভোর্স… আহা! ডিভোর্সড হলেও (যেন ডিভোর্স পাওয়াটা সোজা ব্যাপার!) তাকে তো টিঁকতে দেন না আপনারা! আবার মানসিক টর্চার করে, বাধ্য করেন আরেকটা কম্প্রোমাইসের জীবন বেছে নিতে…

এইসব করতে গিয়ে কী হয় জানেন?
জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়। মানুষের, সম্পর্কের, পরিবারতন্ত্রের ওপর থেকে বিশ্বাস — মুছে যায়।
একেবারের মতো। কোনো অস্তিত্ব থাকে না।
এবং এই জিনিস অল্পবিস্তর পর্যায়ে একটা ছেলের সাথেও হয়। জোরজার। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। মানসিক অত্যাচার।

এগুলো আটকানোর উপায় হিসেবে কাউন্সেলিং সাজেস্ট করবেন, যাতে কেউ হতাশ হয়ে সুইসাইড না করে? কাউন্সেলিং যাদের করানো উচিত, তাদের তো হয় না। আর তারা পাল্টায়ও না জম্মে। অতএব এই সমস্যা থেকেই যায়।

অনেকে, অনেকেই চাপে পরে এক অন্য জীবনে ঢুকে বাধ্য হয়ে, আর পিষে মরে অনিচ্ছার জীবনে সারাটা সময়! ভাবতে পারছেন, কতটা বিশ্রী ব্যাপার এটা! গোড়ায় গলদ! একটা মানুষ, তার ইচ্ছেমতো বাঁচতে পারবে না! প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ!

বিয়েটা দরকার পরিবারতন্ত্র আর সমাজ রক্ষা করার জন্য — তাই বিয়ে করে উদ্ধার করো! অন্য বাড়ি বউ হয়ে গিয়ে, তাদের “কেয়ারটেকার” হও; যে বাড়িতে জন্মেছো বা জন্মসূত্রে যা সম্পর্ক পেয়েছো — তারা তোমার জন্য নয়!

তাই?
তাহলে আমি বা অন্য একটি মেয়ে, পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ, সম্পর্ক, মানুষকেই বিশ্বাস করবো কেন? যার নিজের লোকরাই আপন হতে পারলো না, সে অন্যের কাছে এ দুরাশা করবে কেন? কীভাবে?!
উত্তর আছে?

জীবনে সবকিছুর দরকার আছে। সবচেয়ে দরকারি হলো — “একটা আস্ত মানুষকে, তার মতো করে গ্রহণ করা। জায়গা দেওয়া।”
এইটা করতেই ব্যর্থ সবাই। কোন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখান মশাই আমাকে, বিয়ের ওপারে!

একটা মানুষ খেটেখুটে তার জীবনচরিত একরকম তৈরি করার পর, তাকে টোটালি রিডানডান্ট করে দেওয়া সেই ফিল্ডে, কত বড় অন্যায়, কারুর ধারণা আছে? এই সমাজ ও তার মানুষরা এতো এতো হিপোক্রিট, কী আর বলবো।
একদিকে বলা হবে — “নিজের পায়ে দাঁড়াও, নিজে কিছু হও; কারণ তুমি নিজে ছাড়া তোমায় ভালো রাখতে কেউ পারবে না”!

ফাইন।
সেই সেম মানুষকেই বলছেন, “বিয়ে তো করতেই হবে! একলা থাকা যায় নাকি! কেউ একটা লাগবে শেষ বয়সে”, ব্লা ব্লা ব্লা।
তাহলে? তার কিছু করা নিজের জীবন নিয়ে, এগোনোর ইচ্ছে, সেসব ব্যাকবার্নারে তোলা থাক, ঐজন্য এতোদিনের যুদ্ধ?

কেন?
কেন? একমুখে এতো বলদামি কীভাবে করেন?

আরেকটা কথা আরো বলি।
মানুষ সঙ্গী নির্বাচন আগে যেভাবে করতো, এখন আর সেভাবে করে না। আর নিতান্ত সাধারণ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ ছাড়াও একটু অন্যরকম মানুষ থাকেন, যারা আর পাঁচজনের মতো অভ্যস্ত হতে চান না, যা চলে আসছে তার সাথে।

বিয়েটা একটা ভালো ও উন্নততর ভার্সন হোক জীবনের, দুটি মানুষের জন্যই, যারা এই পদক্ষেপটা নেবেন। বিরক্ত হয়ে বা বাধ্য হয়ে করা কোনো “অপছন্দের কাজ”, না।
জোর করে বাচ্চাকে খাবার গেলানো যায়, আরো অনেক কিছু করা যায় — বিয়ে নয়।

জানি না, এই সার সত্যটুকু মানুষ কবে বুঝবে?

লেখক: পৌষালী সেনগুপ্ত
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

শেয়ার করুন:
  • 324
  •  
  •  
  •  
  •  
    324
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.