ধর্ষণ কেবল যৌনবিকৃতি নয়, বরং সামাজিক নিপীড়নের সবচেয়ে বড় অস্ত্র

নীলিমা শীল:

যৌন বিকৃতি, যৌনাকাঙ্ক্ষা, আকাশ সংস্কৃতি,পশ্চিমা কালচার, অন্তর্জালের অবাধ প্রবাহই কিন্তু ‘ধর্ষণ’ নামক অপকর্মের একমাত্র কারণ নয়। এর অনেক কিছুই আগে আমাদের হাতের নাগালে ছিলো না। ডিশলাইন,মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ভিসিআর ইত্যাদি আমাদের হাতের নাগালে আসার আগেও সমাজে এই অনাচার ঘটতো। অনেকেই বলবেন,’আগে এতো হতো না।’
ঠিক বলেছেন। তবে আগে জনসংখ্যা কম ছিল। ঘটনার ঘনঘটাও তাই কম ছিলো। আজ জনাধিক্য প্রবল, তাই ঘটনার প্রাবাল্য ততোধিক। স্বীকার্য এসবের আমদানি যৌনতা সম্পর্কিত আগ্রহকে কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দিয়েছে। আচ্ছা বার বার বলি ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব, স্বল্প পোশাক ইত্যাদি এই ঘটনার পেছনের কারণ, কিন্তু ভাবুন তো, যেসব দেশে আমাদের মতো ধর্মীয় অনুশাসন নেই, বিধিনিষেধ নেই, মেয়েরা সব স্বল্পবসনাও বটে, সেখানে এগুলো ঘটছে না কেন?

জাপানে বাচ্চাদের কাছে তাদের ধর্ম কী জিজ্ঞাসা করলে তারা আপনার দিকে একখানা ব্ল্যাঙ্ক লুকের বেশি কোন উত্তর দিতে পারবে না। কারণ আমাদের মতো সমাজ নির্ধারিত বা সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় বিধি সেখানে নেই। তাদের বিশ্বাস নিজের কাজ নিজে করা, সময়ের কাজ সময়ে করা, কারো ক্ষতি সাধন না করা, অন্যের জিনিস না নেয়াই ধর্ম। কই সেখানে তো এমনটা ঘটছে না! অন্যান্য সকল উন্মুক্ত বিশ্বেও ধর্মীয় অনুশাসন ও পোশাক সম্পর্কিত বিধিব্যবস্থা একই রকম। এসব যদি তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, তবে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ঐগুলোর নাম করে এই বীভৎসতা কেন? আসলে এ অপকর্মের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

‘ধর্ষণ’ একটি গোটা পরিবারকে, একজন নারীকে সর্বনাশ করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ, কালের পর কাল। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি কোন পরিবারের সঙ্গে অন্য আর একটি পরিবারের বা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যদি কোন কারণে দ্বন্দ্ব-বিবাদ-ঝগড়া হয়েছে সেটা অর্থনৈতিক হোক বা জমিজমা বা অন্য যেকোনো কারণেই সামাজিক পদমর্যদার লড়াই শুরু হয়, তখন যদি বিপক্ষের পরিবারে কোন প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা থাকে, এমনকি অনেক সময় মাকে জড়িয়েও এ ধরনের হুমকি দেয়া হয়। বলা হয়, “মা-বোন নিয়ে থাকতে হবে না? আমার সাথে ঝামেলায় জড়ানোর আগে সেটা যেন ভেবে নেয়।”- এই কথাটি থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে মা-বোন তথা নারীর প্রতি অত্যাচারের খড়গ নেমে আসবে, আর এই অত্যাচার কোন ধরনের অত্যাচার সেটা বুঝতে পারা নিশ্চয় কঠিন নয়? এই অত্যাচার যদি কেবল অত্যাচারই হবে, শারীরিক হবে তবে মা-বোন কেন?পরিবারের পুরুষ সদস্য টার্গেট না করে ‘মা-বোন’কে টার্গেট করার উদ্দেশ্য কী?

কোন মেয়ে যদি কোন ছেলের বিয়ের প্রস্তাবে বা প্রেম প্রস্তাবে রাজি না হয়, তখন একই রকম হুমকির মুখোমুখি হতে হয় তাকে। শুনতে হয়,’বদনাম করে দেব।’ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, সমাজের কাছে তাকে হেয় করে দেয়া হবে। এই বদনামের অর্থ কী?

সমাজে একদল বড়াই (মধ্যস্থতাকারী) আছে তারা দেখবেন তুলনামূলক দুর্বল পক্ষকে গিয়ে বলবে, “ওদের কথা মেনে নেয়াই ভালো, মা- বোন-বয়েস্তা মেয়ে নিয়ে থাকো, কখন কী করে বসে, ঠিক আছে? ওদের কিন্তু অনেক ক্ষমতা।” এই মেনে নেয়া বা ক্ষমতার সাথে মা-মেয়ে-বয়স্ক বোনের সম্পর্কটা ঠিক কোথায়?

সিনেমা-নাটক জীবনেরই প্রতিফলন। বাংলা সিনেমার অতি পরিচিত ডায়ালগ হলো, “আমার প্রস্তাব মানলে না তো, দেখে নেবো, মা বোন নিয়ে কীভাবে সম্মান নিয়ে বাঁচো?” এই সম্মানের সঙ্গে মা-বোনই কেবল জড়িত, বাবা-ভাইদের কোন সম্মান নেই? একটু ভাবুন, ঠিক উত্তরটি পেয়ে যাবেন, কেন বার বার মা-বোনের প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে!

বহু সিনেমা- নাটকে দেখা যায় রাতের আঁধারে প্রাপ্তবয়স্ক বোন বা কন্যাকে আগলে একটি দুর্বল পরিবার তার সমস্ত অধিকার তার পিতৃপুরুষের সম্পত্তি, তার শেকড় উপড়ে সকলের অজান্তেই কোথায় দেশান্তরিত হয় চিরদিনের মতো। তাদের জীবনে একম কিছু ঘটে যার থেকে মুখ লুকাতে একজন পিতা বা মাতা বা কোন কিশোরী বা যুবতী কন্যা আত্মহত্যার মতো চরমতম সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হয়। আর আমাদের সমাজ জীবনে এরকম সব ঘটনাবলি মোটেও বিরল নয়।

আমরা পূর্ণিমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে তো ভুলিনি। সেখানেও কিন্তু দুর্বলকে অত্যাচার করার পথ হিসেবে কন্যাটিকেই বেছে নেয়া হয়েছিল,আর হাতিয়ার ছিলো ওই ধর্ষণ নামক অস্ত্র, বিপরীত পক্ষের রাগ হিংসা রিরংসা চরিতার্থ করতে তার পরিবারকে সামাজিকভাবে অসম্মান করতে এবং একটা গোটা শ্রেণিকে হুঁশিয়ারির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল ‘গণধর্ষণ’কেই।

পূর্ণিমা কেবল একটি নামমাত্র। এমন অগণিত পূর্ণিমার খোঁজ আমরা জানি, হয়তো অনেক সময় অজানা রয়ে যায়, তবে তাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ চলে অবিরাম। অত্যাচারিরা এই পথে না গিয়ে তাকে বা তার পরিবারের একজন সদস্যকে হত্যা করতে পারতো, তাই না? কিন্তু তা কেন করলো না? কারণ আমাদের সমাজে মৃত্যুর চেয়ে বড় ক্ষতি কারো সামাজিক সম্মান লুটে নেয়া; আর তা যদি হয় কোন মেয়ের সোকলড ‘সম্ভ্রমহানি’, তবে তো কথাই নেই। তাই তো তাদের ক্ষোভের সবটুকু আগুন ঢেলে দিল সেই কন্যা শিশুর উপর। কারণ সমাজের চোখে একটা মেয়ের মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হলো একটি মেয়ের ‘সম্মান’। মৃত্যু সেখানে কাঙ্ক্ষিত। কী অদ্ভুত এই সামাজিক চিন্তা! যে ‘সম্মান’ সে নিজে বিসর্জন দিলো না, যা লুট করা হলো, সেটার দায় গিয়ে পড়লো তার এবং তার গোটা পরিবারের উপর। ঔ পরিবার চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হলো, সে পরিবারে আর কেউ কন্যাকে বিয়ে দেবেন না, তার নিজের কথা তো দূরে যাক, তার বোনের বিয়ে আটকে যাবে চিরকালের জন্য। সে পরিবার আজীবনের জন্য কলুষিত হবে, একঘরে হবে, ঘৃণিত হবে।

কিন্তু কেন? একজন মানুষকে যখন শারীরিকভাবে আক্রান্ত করা হয়, যদি কাউকে হত্যাও করা হয়, তখন যদি আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার পরিবার সবার আনুকূল্য লাভ করে, যদি নিহত ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য সবার সমবেদনা জন্মে এবং এই আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যুর জন্য তাদের কোন দোষ না হয়, সম্মানহানী না হয়, তবে এক্ষেত্রেও একইভাবে আক্রান্ত, আহত কন্যা বা তার পরিবার কেন দোষী হবে, কেন তার ‘সম্মান’ চলে যাবে? এই যে ‘সম্মান’, এটা কি কেবল একটা নির্দ্দিষ্ট অঙ্গের সাথেই জড়িত?

একজন ব্যক্তির বাড়ি যখন লুট হয় বা যদি কোন ব্যক্তি তা সে ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন, তার সম্পত্তি হাইজ্যাকার যখন হাইজ্যাক করে তখন হাইজ্যাকার কেবল দোষী হয়, কই যাদের সম্পত্তি খোয়া গেল তাদের তো কোন অসম্মান, বদনাম কিছু হলো না, তবে এক্ষেত্রে কেন সম্মান যাবে? সমাজই তো বেঁধে দিয়ে বলছে, ‘সম্ভ্রম’ নারীর সম্পদ, তো সে সম্পদ যে লুট করলো, সম্মান তো কেবল তার যাবার কথা, যে হারালো তার তো নয়।

সমাজ যতদিন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারছে যে, ‘ধর্ষণের কারণে নারীর সম্মানহানী হয় না, যেখানে তার কোন দায় নেই, তার কিছুই হারায় না, এটা তার অপমান নয়, সে শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, যথাযথ চিকিৎসায় সেটা সেরে যাবে, ততদিন সমাজ থেকে ‘ধর্ষণ’ নামক অপকর্ম দূর হবে না। বরং বার বার নানাভাবে পেশিশক্তির অধিকারী পশুগুলো অত্যাচারের অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণ করবে, গণধর্ষণ করবে আমাদেরকে, আমাদের মা-বোন ও কন্যাদেরকে।

সহকারী অধ্যাপক
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)

শেয়ার করুন:
  • 92
  •  
  •  
  •  
  •  
    92
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.