এক শ্রাবণে সোমেশ্বরীর তীরে

neela haque
লীনা হক

লীনা হক: দিনটি ছিল শুক্রবার, শ্রাবণের ৫  তারিখ, ২০০৭ সালের ২০ জুলাই। আকাশ কালো করা ঝম ঝমে বৃষ্টির মধ্যে রওনা হলাম ঢাকা থেকে সুসঙ দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে | ভোর ৭ টা বাজে | একে তো শুক্রবার, তার উপরে তুমুল বৃষ্টির কারণে রাস্তা ঘাট একদম  খালি, প্রায় একটানে ১০ মিনিটেরও কম সময়ে আমরা মিরপুর বেড়িবাঁধ রাস্তার উপরে | আমি আর সহযাত্রী ডাক্তার দিবালোক সিংহ |

 বেশ  কিছুদিন থেকে আমি টংক বিদ্রোহ এবং কৃষক আন্দোলনের উপরে একটা লেখা তৈরি করার চেষ্টা করছিলাম | আমার কাজের জন্যই লেখাটা ।  দিবালোক সিংহের  সহযোগিতা চেয়েছিলাম বিশেষ করে তাঁর পারিবারিক অবদানের বিষয়ে তথ্য দিতে | যদিও দুর্গাপুরে দিবালোক সিংহ পরিচালিত দুস্থ্ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমাদের সংস্থার সহযোগিতায় বেশকিছু কাজ করেছি এবং আমি এর আগেও গিয়েছি অফিসের কাজে, কিন্তু আমার লেখার বিষয়বস্তু  জানার পর দিবালোক সিংহ যখন ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানালেন দুর্গাপুরে গিয়ে স্থানীয় আদিবাসী এবং কৃষকদের সাথে মত বিনিময় করার জন্য, আমি বিন্দুমাত্র দেরি না করে রাজি হয়ে গেলাম |

 কারণ আমার ভ্রমণটির মূল উদ্দেশ্য দুর্গাপুর, কলমাকান্দার প্রত্যন্ত গ্রামে, পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ মানুষের সাথে আলাপ করা এবং দিবালোক সিংহের সহযোগিতায় কাজটি অনেক সহজ হবে।

 ঢাকা থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরত্বে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত নেত্রকোনা জেলার এই উপজেলাটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তে। দূরত্বের হিসেবে ঢাকা থেকে সময় লাগার কথা খুব বেশি হলে সাড়ে তিন থেকে চার  ঘন্টা।  কিন্তু বৃষ্টি আর বেহাল রাস্তার কারণে আরো ঘন্টা দেড়েক বা দুয়েক হয়ত বেশি  লাগবে| বৃষ্টি মাথায় আমরা চলেছি,  টঙ্গী পার হয়ে গাজীপুরও পার হয়ে গেলাম, বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নাই | মনে মনে ভাবছি, তাহলে কি আমার আসাটাই বৃথা যাবে? এই বৃষ্টির মধ্যে তো বেরও হতে পারব না, পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটাও যাবে না, আর গ্রামের মানুষজনের সাথে আলাপও করা যাবে না ।

মনটা বিষন্ন হতে শুরু করলো!  ত্রিশাল পার হওয়ার পরে বৃষ্টি কিছুটা ধরে আসলো- মনে মনে আশা হয়ত দুর্গাপুর পৌঁছুতে পৌঁছুতে বৃষ্টি থেমে যাবে, আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে | সকাল  প্রায় ১০ টার কাছাকাছি। ময়মনসিংহ শহর হাতের বাঁয়ে রেখে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে পাশ কাটিয়ে সুতিয়াখালী মোড় ডানে রেখে ব্রহ্মপুত্র নদের উপরে তৈরী চীন-বাংলা  মৈত্রী ব্রিজ পার হয়ে চললাম আমরা | এর মাঝে একটু  থেমে চা খেলাম বাই পাসের একটি রেঁস্তোরাতে | সেতু পার হওয়ার সময় দেখলাম ব্রহ্মপুত্রের দুকুল প্লাবিত, অবিরত বৃষ্টি আর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঘোলা জলের স্রোত ঘূর্ণি তৈরি করেছে নদের মধ্যিখানে |  ব্রিজের টোল ঘর পার হয়ে আরো কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আমরা শ্যামগঞ্জ থেকে বাঁয়ে টার্ন নিলাম | রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ | শ্যামগঞ্জ থেকে পূর্বধলা পর্যন্ত পুরোটা রাস্তাই খানা খন্দে ভরা, বহু জায়গায় রাস্তার পিচ উঠে গিয়ে এখন শুধু মাটির কাঠামোটি রয়েছে | তবে বৃষ্টি থেমে গেছে | বিখ্যাত শুকনাকুড়ি ব্রিজ (বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যা গত পাঁচ বছরেও নির্মাণ করতে পারেন নাই, বা করেন নাই কিন্তু তাঁর সোনার বাংলা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকা ঠিকই খরচ হয়েছে!)

 এর কাছে এসে দেখি ব্রিজ তো নাই, তবে বিকল্প হিসাবে মাটির তৈরি ঢালু ডাইভারসন সড়ক তৈরি করা হয়েছে সেতুর বাম পাশ দিয়ে | প্রাণ প্রায় হাতে করে সেই পথ পার হওয়া, দিবালোককে জিজ্ঞ্যেস করলাম কিভাবে উনি প্রতি সপ্তাহে এই পথ ধরে যাতায়াত করেন! স্মিত হেসে স্বল্পবাক মানুষটি বলেন এই আর কি, আমার তো আসতেই হয় | মাকে কথা দিয়েছিলেন ডাক্তার হওয়ার পরে দুর্গাপুরের মানুষের পাশে থেকে সেবা দিবেন, যেহেতু পাকাপাকিভাবে এখনো থাকতে পারেন না দুর্গাপুরে তাই প্রতি সপ্তাহে আসেন | মা নেই কিন্তু পুত্র তো মাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গতে পারে না! অবাক হয়ে তাকিয়ে রই কেবল!

 শেষমেষ প্রায় দুপুর ১ টায় পৌঁছুলাম  বিরিশিরি, দূরে দেখা যাচ্ছে নীলচে সবুজ গারো পাহাড়ের সারি | আচ্ছা সমতল থেকে পাহাড় কেন নীলাভ সবুজ দেখায়? জানতে হবে| ঝির ঝিরে বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে, হায় রে, মনে তো হচ্ছে এই দফায় আর | কি আর করা, বৈরী প্রকৃতির সাথে তো আর বাহাস করতে পারব না |  সোমেশ্বরী ব্রিজটি তৈরি হচ্ছে এখনো- কবে শেষ হবে কে জানে? নদী পার হতে হবে | গাড়ি এই পাড়ে রেখে খেয়া নৌকো করে পার হলাম সোমেশ্বরী- তীব্র স্রোত- পাহাড় থেকে নেমে আসছে জলধারা তীব্র ঘূর্ণির সাথে ফেনা তুলে|

 জানা গেল, উজানের পাহাড়ে অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে গত এক সপ্তাহে নদীর জল বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, দুই পারের গ্রাম গুলিতে বন্যা দেখা দিয়েছে| নদীর অপর পারে দুর্গাপুর- নৌকো থেকে  সরাসরি নামা গেল না কারণ নৌকো থামলো প্রায় হাঁটু জলে, রিকশা আনা হলো কাছাকাছি যাতে নৌকোর গলুই থেকে রিকশায় উঠতে পারি। এই অত্যাধুনিক পারাপারের সিস্টেমে পাটাতনে পা নামতে গিয়ে পিছলে পড়ছিলাম আরেকটু হলেই সোমেশ্বরীর স্রোতে সাঁতার দিতে হতো!

 এইবার আমি বিরিশিরি ওয়াইডাব্লিউসিএ গেস্ট হাউজে থাকছি না | দিবালোক সিংহ যখন আমন্ত্রণ জানালেন তাঁদের পৈত্রিক বাড়িতে আতিথ্য নিতে, আমি দেরি না করে রাজি হয়ে গেলাম (যদি আবার মন বদলিয়ে ফেলেন!)  কারণ প্রবাদ প্রতিম বিপ্লবী নেতা কমরেড মনি সিংহের বাড়িতে থাকার এই দুর্লভ সুযোগ আর কখনো পাবো কিনা কে জানে! কমরেড মনি সিংহ আর অণিমা সিংহের একমাত্র সন্তান দিবালোক।

 নিরিবিলি দুর্গাপুর শহরের মোটামুটি কেন্দ্রস্থলে বাগিচাপাড়া, কমরেড মনি সিংহের পৈত্রিক ভিটা | ছোট এক টুকরা জমির উপরে একটি ছোট হাফ দোতলা বাড়ি, ইটের দেয়াল আর  টিনের চাল | সামনে এক চিলতে বাগান – সরু ইটের পথ চলে গেছে বাড়ি পর্যন্ত | বাগানে ফুটে থাকা রঙ্গন, জবা আর দোলন চাঁপার সাথে সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে নারকেল গাছ, কয়েকটা মেহগনি গাছ আর একটি শিশু কৃষ্ণচূড়া | ছোট ছোট নয়নতারা ফুটে আছে বাগান আলো করে | আসলে এই বাড়িটি মনি সিংহ পরিবারের আদি বাড়ি নয় | এটি দিবালোক তৈরি করেন ৯০ দশকের শেষ দিকে- তাঁদের নিজের জমি কিনে নিতে হয়েছে অন্যের কাছ থেকে। কারণ পাকিস্তান আমলে ১৯৫২ সালে আইয়ুব খান মনি সিংহের ভিটেমাটি ক্রোক করে এবং পরে তা অন্যের দখলে চলে যায় | আশির দশকে দিবালোক যখন মস্কো থেকে ডাক্তারি পড়া শেষ করে দেশে ফিরেন, তখন তিনি দুর্গাপুরে এলে অন্যের বাড়িতে থাকতেন, পরবর্তীতে বিদেশে চাকরি করার সুবাদে কিছু টাকা জমিয়ে এই জমিটুকু কিনে নিয়ে বর্তমান বাড়িটি তৈরি করেন | তবে এই জায়গাটিতেই নাকি তাঁদের আদি বাড়ি ছিল |  এই সব কথা গাড়িতে আসতে আসতে জেনেছি | নিজে থেকে তো কিছু বলতে চাননা এই নিভৃতচারী মানুষটি, আমিই  প্রশ্ন করে করে জানলাম|

 আমাকে থাকতে দেয়া হলো হাফ দোতলায় , সত্যি বলতে কি আমি মনে মনে ভাবছিলাম ইস যদি আমাকে উপরে থাকতে দিতেন | যাক, চক্ষু লজ্জার মাথা খেয়ে আর বলতে হয়নি।

 দুপুরের খাবার শেষে দিবালোক সিংহ বের হয়ে গেলেন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে আর তাঁর দুজন সহকর্মীকে রেখে গেলেন আমাকে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরিয়ে দেখাতে। কয়েকটা উঠান বৈঠক মতো ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে আমার জন্য | যাক, নিজের মত করে ঘুরে দেখতে পারব আর উনার উপস্থিতিতে হয়ত আলাপটা আমার মত করে করতে পারতাম না |

নিরন্তর বনোয়ারী নামের গারো সম্প্রদায়ভুক্ত  সহকর্মীর মোটর বাইকের পিছনে সওয়ার হয়ে ঝির ঝিরে বৃষ্টি মাথায় চললাম নদীর ঘাটে, আবার সোমেশ্বরী পার হতে হবে | একই নৌকায় যাত্রী এবং মোটর সাইকেল পার হচ্ছে | নদী সত্যি প্রবল স্রোতে বইছে- উজানে দেখা যাচ্ছে ধূসর  নীল গারো পাহাড় | বৃষ্টি হচ্ছে পাহাড়ে | নদীতে ভেসে আসছে দেখলাম গাছের গুড়ি, কাঠের টুকরো | বেশ কিছু নারী এবং কিশোরকে (শিশুও বোধ হয় আছে) দেখলাম সেগুলো সংগ্রহ করতে – এটাই তাঁদের জীবিকা! কয়লাও ছেঁকে তুলছেন অনেক শ্রমজীবী নারী- বৃষ্টি মাথায় নিয়েই চলছে এই কাজ|

 প্রথমেই গেলাম বাকৈলঝরা ইউনিয়নের এর নাজিরপুর গ্রামে| গারো পাহাড়ের পায়ের কাছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এই গ্রামটির ।  নিরিবিলি এই গ্রামটিতে হিন্দু মুসলিম, গারো আর হাজংদের  চমৎকার সহাবস্থান রয়েছে | বসলাম একটি বাড়ির উঠানে| সব নারীরা (প্রায় ২৫ জন হবেন) তাঁদের সংসারের কাজ সেরে এসেছেন আমার সাথে কথা বলতে | সবাই যাঁর যাঁর সাধ্যমত পরিষ্কার পোশাকে, চুল বেঁধে, অনেকেই মুখে পান ঠোঁট লাল, কি যে চমৎকার লাগছিল টিপটপ করে সেজে আসা নারীদের।

 সাজ সজ্জা করার মতন উপলক্ষও হয়তো তেমন একটা আসে না তাঁদের জীবনে | খেয়াল করলাম প্রায় সবারই কোলে একটি এবং হাতে ধরা আরেকটি শিশু সন্তান নিয়ে এসেছেন | জানলাম এই এলাকায় জন্মহার জাতীয় গড়ের চাইতে বেশি, প্রতিটি পরিবারেই আছে চার বা তার বেশি সন্তান | মূল কারণ জন্ম নিয়ন্ত্রণ তথ্য না জানা, আরো বড় কারণ জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ততটা সহজলভ্য নয় এখানে। এছাড়া নারীরা এখনো সন্তানধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

 আরো একটি বিষয়, এলাকাটি প্রত্যন্ত হওয়ায় গর্ভকালীন চিকিত্সা সেবা পাওয়া যায় না বললেই চলে। ফলে শিশু মৃত্যুহারও বেশী । সব চেয়ে দুঃখজনক তথ্যটি হলো যে দরিদ্র পরিবারে মনে করা হয়- একটি সন্তান বেশি মানে একটি কাজের হাত বেশি!  অপ্রিয় সত্য, ভালো না লাগলেও তাই-ই সত্য|

 কৃষিজীবী  সমাজ, যদিও এলাকার শতকরা ৭৫ ভাগ কৃষি জমির মালিক ধনী ব্যক্তিরা এবং তাঁদের কেউই গ্রামে তো দূরের কথা, এমনকি দুর্গাপুরেও থাকেন না| শতকরা ৮০ ভাগ পরিবার কৃষি শ্রমিক অথবা বর্গা চাষী| বর্গা চাষের ক্ষেত্রে দুই ভাগ যায় জমির মালিকের কাছে, এক ভাগ খরচ হয়  বীজ , সার , নিড়ানি, সেচ ইত্যাদিতে, আর এক ভাগ চাষী পান- যা দিয়ে বছরের ৪ মাসের খোরাকিরও পুরো  সংস্থান হয় না | ফলশ্রুতিতে চাষী প্রায় সারা বছরই ঋণ দায়বদ্ধ থাকেন জমির মালিক নয়তো মহাজনের কাছে| আর যদি অকাল বন্যা হয় , এই এলাকায় পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রায়ই ফসল, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তো দুরবস্থার আর শেষ নাই|  সরকারের দেয়া কৃষি ভর্তুকি পান জমির মালিকরা- প্রান্তিক কৃষকের  হিসেবের খাতা শূন্যই থেকে যায় | কথা বলতে বলতে সময় কোনদিক দিয়ে চলে গেছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় সাড়ে ৬  টা বাজে|

হুড়োহুড়ি  করে ফিরে চললাম দুর্গাপুরের দিকে | এদিকে আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তুমুল বেগে-  শো শো হাওয়ার সাথে  তীক্ষ্ণ ফলার মতন শ্রাবণের বৃষ্টি, ভিজে চুপচুপে হয়ে গেলাম| পাকা পিচের সড়ক, তবু নিরন্তর  জানালেন বাইক চালানো সমস্যা হচ্ছে- থামতে হবে| থামলাম রাস্তার পাশে। ঝাকড়া করই গাছের তলায়| আমার অবশ্য কোনো তাড়া নেই বৃষ্টি থেকে বাঁচার কিন্তু নিরন্তর  অত্যন্ত ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে উঠলেন আমাকে তাঁর নিজের বর্ষাতি দিতে, কিন্তু যখন বললাম লাগবে না, এমনকি ছাতার ও দরকার নাই, অবাক হয়ে তাকালেন, হয়ত মনে মনে ভাবলেন এ কোন উন্মাদের পাল্লায় পরলাম রে বাবা!

 যেখানে আমরা থেমেছিলাম সেই জায়গা থেকে অল্প দূরত্বে ছোট একটা মুদি দোকান, উঁকি দিয়ে দেখি অন্য পাশে চায়ের কেতলি দেখা যায় | চললাম চা পান করতে, জিজ্ঞ্যেস করলাম নিরন্তর চা খাবে কিনা, জবাব এলো, এই খানের চা তো আপা ভালো হবে না! এক পেয়ালা গরম জলই এখন অনেক আমার কাছে| দোকানি বসতে দিলেন ভিতর দিকের বেঞ্চে, ইতস্তত করছিলাম ভেজা কাপড় থেকে টুপ টুপ জল ঝরছে যে! কিন্তু সহৃদয় দোকানি বললেন, কোনো অসুবিধা নাই আপা বসেন| গ্রামের প্রান্তিক মানুষের এই মায়া আর সহৃদয়তার উষ্ণতা সব সময়েই আমাকে টানে| গরম জলে কাপ ধুয়ে চা দিলেন দোকানি, গরম ধোঁয়া উঠা চা, প্রচুর দুধ আর চিনি মিশ্রিত, সত্যি সত্যি অমৃত মনে হলো | শীত লাগতে শুরু করেছে| চা শেষে ফিরে চললাম, বৃষ্টি না থামলেও হাওয়া কমে এসেছে| ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে পুরোপুরি, ১৫ কিলোমিটার আসতে লাগলো প্রায় আধাঘন্টা |

 বাগিচাপাড়ায় পৌঁছে দেখি বিদ্যুত নাই, দিবালোক অবশ্য আগেই বলে রেখেছিলেন যে, লম্বা সময় বিদ্যুত থাকে না | যাই হোক, বাড়ির কেয়ারটেকার খালেক ভাই আমার কাকভেজা অবস্থা দেখে স্নানের জন্য গরম জলের ব্যবস্থা করতে চাইলেন, কিন্তু আমার ততক্ষণে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেছে| কোনো রকমে গায়ে জল ঢেলে কাপড় ছেড়ে এলাম নিচ তলায় চায়ের আশায়| গরম গরম চায়ে চুমুক দিয়ে জানলাম দিবালোক তখনো ফিরেন নাই| তবে আমি যাতে একলা ভয় না পাই সেইজন্য ডিএসকে হাসপাতাল থেকে শেফালী নামে একজন নারী কর্মী আমার সাথে রাতে থাকবেন | থাকতে দিয়েছেন তাঁদের বাড়িতে, সেই খুশিতেই তো আমি আত্মহারা, তার উপরে এতটা আন্তরিকতা, সত্যি অভিভূত হয়ে গেলাম|

 রাত প্রায় ৯ টার দিকে ফিরলেন দিবালোক| আমি ততক্ষণে উপরের রুমটিতে আয়েশ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে শেফালির সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছি| শেফালী নিম্ন বর্গীয় হিন্দু পরিবারের মেয়ে, ৩০ এর ঘরে বয়েস হবে,শ্যামলা বর্ণের মিষ্টি দেখতে হাসিখুশি একটি মেয়ে ।বিয়ে হয়েছে সমপর্যায়ের পরিবারের একজনের সাথেই| বিয়ের সময় শেফালির পরিবার যৌতুক হিসেবে দিয়েছে দুই ভরি রুপার গহনা, বরের পোশাক, শেফালির পোশাক, একটি খাট আর বিছানা সামগ্রী, এবং নগদ ৭ হাজার টাকা | বর পক্ষের প্রায় ২০ জন মানুষকে আপ্যায়ন  ও করতে হয়েছে খাসি কেটে| বরপক্ষ  একটি ৫০ সিসি  মোটর বাইক চেয়েছিল, প্রান্তিক চাষী শেফালীর  বাবা  তা  দিতে পারেননি। সে  কারণে  আজও  কারণে অকারণে সেই খোঁটা শেফালীকে সহ্য  করতে  হয় এবং  মৌখিক বাণের  সাথে সাথে  শারীরিক প্রহারও  অবধারিত ।  শেফালির দুটি সন্তান, স্বামীটি তেমন কিছু করে না, উল্টো আরো শেফালির টাকায় তার চা সিগারেটের যোগান চলে| কথাবার্তায় বুঝলাম স্বামীটি মাদকাসক্ত । শেফালির আয়ের টাকায় সংসার চলে| ছেলে দুটি স্কুলে পড়ে| তার স্বপ্ন ছেলেদের উচ্চশিক্ষা দেবে। কিন্তু তা সম্পূর্ণ হবে কিনা তা শেফালীর জানা নাই । শুধু অনুরোধ করলো, যদি আমি দিবালোককে বলে তার স্বল্পমেয়াদের প্রকল্প ভিত্তিক চাকুরীটি স্থায়ী করে দিতে পারি ! জীবনের অবিরত সংগ্রামের কথা বলতে বলতে বেশ অনেকবারই শেফালীর চোখ ভিজে উঠে।  ভাবি, খাটে বসা আমি আর মোড়ায় বসা শেফালীর জীবন সংগ্রামের

মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ঠিক কোন জায়গাতে?

 নিচে থেকে খালেক ভাই খেতে ডাকলেন, ক্ষুধার্ত ছিলাম খুব – খেলাম গরম ধোঁয়া উঠা ভাতের সাথে ডাল, সবজি আর মুরগির ঝোল| খাবার পরে এক কাপ চা নিয়ে বসলাম দিবালোকের সাথে কথা বলতে| বাইরে বৃষ্টি আরো ঝেঁপে এসেছে| টিনের চালে শব্দ হচ্ছে|  চায়ে চুমুক দিতে দিতে দিবালোক শুরু করলেন তাঁর পরিবার , মূলত তাঁর বাবা এই উপমহাদেশ  তথা বাংলাদেশের  বাম রাজনীতি তথা কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ কমরেড মনি সিংহের জীবন কাহিনী| সেই সাথে এলো তাঁর মা, কমরেড অনিমা সিংহের কথা, যিনি ছিলেন মনি সিংহের যোগ্য সহধর্মিনী, সহযোদ্ধা ও  বটে|

 ৪০ দশকের সেই সব কৃষক আন্দোলনের কাহিনী শুনতে শুনতে যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সব কিছু| কথা বলতে বলতে দিবালোক জানালেন, তাঁর যা কিছু ভালো সে সবই তাঁর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া| বুঝতে অসুবিধা হয় না কোত্থেকে আসে এই প্রবল জীবনীশক্তি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য|  কথায় কথায় রাত বাড়ে, বৃষ্টি আরও ঝেঁপে এসেছে, আগামীকাল আবার গ্রামে যেতে হবে, বাকি কাজ সেরে সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হতে হবে| শুভরাত্রি জানিয়ে ঘুমাতে চললাম| শেফালী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন | আমিও শুয়ে পরলাম, মানুষের প্রতি মানুষের নি:স্বার্থ ভালবাসার যে অনুভব আমি আজ জানলাম, জীবনের কোনো হিসেবের নিক্তিতে তো তাকে মাপা যাবে না | টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দ শুনতে শুনতে মনে এক ধরনের বিভ্রম জেগে উঠলো, এই বাড়িটি যেই জমির উপরে তৈরি, একসময় এখানে কেটেছে মনি সিংহের যৌবন, এই জমিতেই কোনো এক ঘরে বসে হয়ত পরিকল্পনা হয়েছে টংক আন্দোলনের রূপরেখার, অনিমা সিংহ এই বাড়িতে তাঁর স্বামী-পুত্র নিয়ে সংসার করার  স্বপ্ন  দেখেছিলেন হয়তো। সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নাই, কিন্তু তবুও মানুষকে সেবা করার প্রবল আকুতি তিনি বপন করে গেছেন একমাত্র পুত্রের মনে|  পুত্র সেই আদর্শের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে| এভাবেই মানুষ তাঁর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে| ভাবতে ভাবতে কখন যেন এক সময় ঘুমিয়ে পরলাম|

 অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল….মেঘলা আকাশ, টিপ টিপ বৃষ্টি, আবার যে কোনো সময় ঝেঁপে আসবে…..তবু ও ভাবলাম যাই একটু নদীর ধারে….নিচে নেমে দেখি গেটে তালা, খালেক  ভাই অত ভোরে ঘুম থেকে জাগেন নাই ! হায় সোমেশ্বরী এবার অধরাই থেকে গেল বোধ হয়!

 সকালে নাশতা সেরে দিবালোক গেলেন তাঁর রোগীদেরকে চিকিত্সা সেবা দিতে | জানলাম প্রায় ৫০-৬০ জন রোগী তিনি দেখবেন বিকেল ৫ টা পর্যন্ত , সবই  বিনা পয়সায়  আবার কাউকে কাউকে নিজের পয়সায় গাড়িতে করে নিয়ে যাবেন ঢাকায় তাঁর সংস্থা চালিত হাসপাতালে এবং অপারেশন  দরকার হলে নিজেই  করবেন অবশ্যই বিনা পয়সায় আর অন্য ডাক্তার দিয়ে চিকিত্সা করাতে হলেও ভর্তুকির ব্যবস্থা  করে দিবেন|

 দিবালোকের রাজনৈতিক দর্শন সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ। দিবালোক সিংহ বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, এলাকার সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের হৃদয়ের অত্যন্ত কাছের মানুষ তিনি । গত প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে কম্যুনিস্ট পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে কাস্তে হাতুড়ি মার্কায় নির্বাচন করে আসছেন! মনে মনে চিন্তা করলাম উনার রোগীরাও যদি যার যার নিজের ভোটটা উনাকে দিতো, কিন্তু সত্যিটা হলো আমাদের এই গণতান্ত্রিক দেশে ভোটের বাক্সের বাজনা বাজানোর জন্য যা দরকার সেটাতো আর দিবালোক বা তাঁর পার্টির নাই! আরও যেটা আমার মনে হলো আমাদের দেশের মানুষ একজন সৎ ও যোগ্য, কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত বাম নেতাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় পাঠানোর ব্যাপারে হয়তো কিছুটা অনিশ্চয়তায় ভোগে যে তিনি ক্ষমতাবান মূল স্রোতধারার আসুরিক শক্তির সাথে দ্বৈরথে পারবেন কিনা !  এটা আমার একদম ব্যক্তিগত পর্যালোচনা !  দিবালোকের অবশ্য এ নিয়ে দুঃখবোধ তেমন আছে বলে মনে হলো না , তিনি মানুষকে সেবা দিতে পেরেই খুশী !

 আমি গেলাম মিনকি ফান্দা গ্রামে, দুর্গাপুর উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে| আদিবাসী গ্রাম| গ্রামটি সরকারী খাস জমিতে । সরকারী খাতায় এর নাম গুচ্ছ গ্রাম ।বসলাম একজনের ঘরের ভিতরে কারণ ঝম ঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে , বাইরে বসার উপায় নাই| গ্রামটিতে মূলত গারো সম্প্রদায়ের বসবাস| জানলাম আদিবাসীরা সবাই ভূমিহীন, যদিও চাষযোগ্য জমিগুলো একসময় তাঁদের পূর্ব পুরুষেরই ছিল| ক্রমশ তা আমার মতন মূল স্রোতধারার মুসলিম সম্প্রদায়ের হস্তগত হয়েছে আর এই হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি মূলত দখল প্রক্রিয়া ছিল, যদিও আইনগত বৈধ কাগজ পত্র  দখলকারীদের পক্ষে| কিভাবে সেটা সম্ভব হয়েছে তা সহজেই অনুমেয় ।  সরকার কি কোনো পদক্ষেপ কোনো দিন নেবে ভূমি পুত্রদের কাছে তাঁদের ভূমি ফিরিয়ে দেয়ার? মিনকি ফান্দা গ্রামের পরিবার গুলির আয়ের মূল উত্স বনের থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে তা দুর্গাপুর বাজারে বিক্রি করা |  ইদানিং বনের ভারতীয় অংশে কাঁটা তারের বেড়া দেয়ার ফলে, এই জীবিকাও কঠিন হয়ে পরেছে,অনেকেই তিন বেলার  আহার সংস্থান করতে পারছেন না, এই অবস্থায় ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা বেশি দূর করা যায় না|  ফিরে এলাম, বৃষ্টি মাথায় অনেকটা হেঁটে কারণ কর্দমাক্ত পথ ধরে মোটর বাইক চালানো ঝুঁকি পূর্ণ |

 মনের মধ্যে ঘুরতে থাকলো, কিছু একটা করতে হবে এই এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য|  কিন্তু কি করব আমি, নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এতটা প্রকট হয়ে কোনোদিন দেখা দেয় নাই| আদিবাসী নারীদের মুখ গুলো ভাসছিলো মনের মধ্যে , নিজস্ব সৌন্দর্যে সুন্দর কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃশ্চিন্তায় মলিন । সবাই বলছিলেন তাঁরা তাঁদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান । কিন্তু প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করাই যেখানে জীবনের প্রধান ও প্রথম বিষয় সেখানে শিক্ষার সুযোগ সবচেয়ে শেষে বিবেচিত হয় , সত্যি বলতে কি শিক্ষা আসলে হিসেবেই থাকে না । অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন সীমান্তের অপরপাড়ে – সেখানে স্বজনরা আছেন , তাও অত সহজ নয় যাওয়া , অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের পাঠিয়ে দেয়া হয় বিয়ের জন্য কিন্তু এইভাবে কতদিন ? বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ড থেকে কি তবে আদিবাসী সম্প্রদায় বিলীন হয়ে যাবে ?

 বিকালে মিটিং ছিলো স্থানীয় প্রশাসন , সুশীল সমাজ আর আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে বিরিশিরি উপজাতীয় কালচারাল একাডেমীর মিটিং রুমে – সামনে আগস্ট মাসের ৯ তারিখে  ‘ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ‘ পালনের কর্মপরিকল্পনা আলোচনা করবার জন্য । আদিবাসীদের জীবন জীবিকার সমস্যার কথা, মূল জনগোষ্ঠী থেকে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে যাওয়া, আদিবাসী সংস্কৃতি আর রীতিনীতির পালন আর বিকাশ ক্ষীন হয়ে আসার কথাই আলোচনায় মূল বিষয় হয়ে আসছিল । দাতা সংস্থার কর্মরত হিসেবে সবাই একধরনের আশা বাদ নিয়ে আমার কথা শুনতে চাচ্ছিলেন , কিন্তু আমিতো আসলে সিধ্বান্ত গ্রহণকারীদের কেউ নই । তবু কথা দিয়ে আসলাম , করবো যা কিছু সম্ভব আমার সাধ্যের মধ্যে , মনের ভিতরে জানলাম আসলে সাধ্যের বাইরেও  চেষ্টা করতে হবে । সেই চেষ্টার গল্প আরেকদিন ।

 লেখক: উন্নয়নকর্মী।

শেয়ার করুন:
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.