আমি যখন মেয়ের মা

কৃষ্ণা দাস:

আমি এক কন্যার মা, আমিও কারো মেয়ে। দেশের এই সার্বিক পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ সময়ই আতঙ্কে থাকি। যদি কিছু হয়? যদি কিছু হয়? এই আতঙ্কে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। একজন কর্মজীবী মা হয়ে সারাক্ষণ চোখেচোখে সন্তানকে রাখাও সম্ভব না।

গত বছরের একটা ঘটনা দিয়ে আজকের লেখাটা শুরু করবো, মেয়ে তার জন্মদিনে বন্ধুদের নিয়ে বাইরে খাওয়ার বায়না ধরেছে। পরক্ষণেই আমার ভেঙে পরা হতাশ চেহারা দেখে বলে, “মা তুমিও যেও। পাশের টেবিলে বসে থেকো, তাইলে তো তোমার কোন টেনশন হবে না! ওমুকরাও এইভাবেই জন্মদিন করেছে!” (ব্যাপার হচ্ছে আমি প্রায় সব বিষয় নিয়েই মেয়ের সাথে খোলামেলা আলোচনা করি আর তাই ও আমার উৎকণ্ঠা খুব তাড়াতাড়ি অনুভব করে।) রাজি হলাম, কারণ আমার পক্ষে ঘরেও এতো আয়োজন করা সম্ভব না। মেয়ের আবদার রক্ষা করতে একবেলার ছুটি ম্যানেজ করে মেয়ের ৫/৭ জন বান্ধবীদের নিয়ে এবং সাথে তাদের মায়েদের নিয়ে ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টে বসে জন্মদিন পালন করলাম।

আমরা সব মায়েরা বসে নানা রকমের গল্প করছিলাম। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে আমার মতোই সব মায়েরা আতঙ্কিত। সবার প্রায় একই কথা, আমাদের সময়ে এতটা আতঙ্কে থাকতে হতো না, এখন তো স্কুল কিংবা কোচিং, কোচিং-এর রাস্তা, ফুটপাত, খেলার মাঠ কোন জায়গায়ই মেয়েরা নিরাপদ না।

একজন বললো, সেদিন ফুটপাতে আমার চোখের সামনেই এক লুঙ্গি পরা মাঝবয়সী লোক হঠাৎ এসে মেয়েকে ধাক্কা মেরে এগিয়ে গেল, অথচ ফুটপাত কিন্তু ফাঁকাই ছিলো।
আরেকজন বলে উঠলো, সেদিন দুপুরে মেয়েকে একা ছেড়েছি কোচিং এ, কারণ শাশুড়ি মায়ের শরীর খুব খারাপ ছিল৷ মেয়েকে বললাম, কাছেই তো, তুই রিকশা নিয়ে যা, আমি বিকেলে তোকে গিয়ে নিয়ে আসবো। বিকেলে মেয়েকে আনতে গিয়ে দেখি, মেয়ের চোখ ছলছলে, জানালো পাড়ার বখাটেরা ওর রিকশা আটকিয়ে নানা ধরনের বাজে কথা শুনিয়েছে। বুঝলাম, একা আর ছাড়া যাবে না।
আমার মেয়েকে কখনও ওর মামাকে দিয়ে পাঠাই, আবার কখনও আমার দিদি ওকে দিয়ে আসে, কখনও বা একাই ওকে যেতে হয়।

দু’একজন হাউজওয়াইফ মায়েরা কর্মজীবী মায়েদের বাহবা দিয়ে বললো, আপনাদের সাহস আছে, মেয়েকে একা রেখে কী সুন্দর ছুটে বেড়ান, আমাদের তো সকাল -সন্ধ্যা ওই মেয়ের পেছনেই ছুটতে হয়।

এরই ফাঁকে বাচ্চাদের দেখে আমি হতাশ হচ্ছিলাম। সত্যি কী জীবন এদের! এতোটুকু ফ্রি হয়ে ঘুরে বেড়াবার কোন ছাড় নেই। চাইলেও দিতে পারছিলাম না ওইটুক ছাড়৷ বারবার ফিরে ফিরে যাচ্ছিলাম খোলা মাঠে, একদল মেয়েরা দুপুর গড়িয়ে বেলা অব্দি খেলে বেড়াচ্ছে। যা মন চায়, যেদিকে ইচ্ছা পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। সাঁতরে পার হচ্ছে পুকুরের এপার-ওপার। ইচ্ছে মতো ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথতে গাঁথতে আপন মনে কোন গান হয়তো গুনগুনিয়ে উঠছে৷  শহরের ছোঁয়ায় এতোটা হয়তো দেয়া সম্ভব না কিন্তু একটু নিরাপদ আশ্রয়ও কি দিতে পারছি আমরা আমাদের সন্তানদের? যেখানে প্রাণ খুলে আপনমনে গেয়ে উঠবে কোন গান, সারাক্ষণ প্রহরির মতো কোন চোখ ওদের উপর কোনরকম নজরদারি করবে না, এমন একটা ক্ষণ! ওরাও তো নিজের মতো করে কিছু করতে পারে না, জানে, আশেপাশে কেউ না কেউ ওদের উপর নজরদারি রাখছে। কাজেই ওদের সঙ্গী এখন যন্ত্র, আবার ওদের কাছ থেকেই কথায় কথায় আমরা মানবিকতা আশা করি! হিপোক্রেসি করছি না আমরা?

মায়েদের সাথে কথা হচ্ছিল পোশাক নিয়েও। মেয়ের বেশিরভাগ বান্ধবীরা সালোয়ার-কামিজ-হিজাব পরে। এক ভাবী নিজে হিজাব না পরলেও মেয়েকে জোর করে পরিয়ে রাখেন, কারণ চিল-শকুনের হাত থেকে যতটা আড়াল করা যায়। এদের অনেকেই আবার আমাকে চিহ্নিত করে বলেন, আপনার সাহস আছে, কী সুন্দর মেয়েকে জিন্স-টপস পরান! আমি বলি, এই যে এতো আড়াল করে রাখছেন মেয়েদের, তাও কি নিশ্চিত হতে পারছেন? পারছেন এতো ঢাকার পর, আড়াল করার পর একা ছাড়তে? তাহলে কেন এতো জোরজবরদস্তি? ও যেভাবে স্বাচ্ছন্দবোধ করে, সেভাবেই রাখুন, চাপিয়ে দেয়া কেন? পিনপতন নিরবতা! বললাম, ধর্ষকের নোংরামি থাকে তার মস্তিষ্কে, তা না হলে তিন মাসের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা কী করে ধর্ষিত হয়? আপনি যতই ঢেকে রাখুন না কেন, নোংরা মস্তিষ্কের নোংরামো দিয়ে, শকুনির চোখ শুধু মরা মাংসই দেখবে।

আর এ পরিস্থিতির জন্য আমি-আপনি-আমরা দায়ী। কারণ আমরা এদের ভয়ে গুটিয়ে থাকি। লজ্জায় অপমানে কথা বলি না। আরোও বলিনা, আমাদের মতোই দু’একজন আবার গর্ব করে বলে উঠে, কই আমার সাথে তো এমন হয় না! অথচ বুঝে না, আজ হয় নাই, কালকে হবে না সে কথা কিন্তু সে গ্যারান্টি সহকারে বলতে পারবে না। কিন্তু তাও অন্যদের ছোট করে নিজেকে তুলে ধরার জন্য এমন একটা কথা জোড় দিয়ে বলে উঠেন৷ কিন্তু তা না করে সবাই যদি একজোট হয়ে প্রতিবাদ করে উঠেন, একটু হলেও এরা থমকে যাবে। বাসে, ট্রেনে কোথাও এতটুকু স্বস্তিতে বসবার জো নেই। আমি নিজে একদিন ট্যাম্পুতে এমন এক হয়রানির শিকার হই। আপনারা জানেন, ট্যাম্পুতে কতটা গাদাগাদি হয়ে বসতে হয়। আমিও বসেছি, রোজ এতো এতো রিকশা ভাড়া দেয়ার ক্যাপাসিটি আমার নাই। আমার থেকে ১০-১২ বছরের এক ছেলের পাশে। দেখছি আমি বসবার পর থেকেই ক্রমশ ও আমাকে চেপে বসছে এবং প্রতিবার ব্রেক করার পর আমার গায়ে হেলে পড়ছে। প্রথমে ভেবেছি ওর বসতে সমস্যা হচ্ছে, একজন নেমে যাওয়ার পরও ও আমার দিকে চেপেই বসছে। তাকিয়ে দেখলাম, ছেলেটার চোখ প্রচণ্ড লাল। আমি এবার ওকে বললাম, ভাই একটু সরে বসো। সে হুংকার দিয়ে বলে আর কত সরে বসবো? সাথে সাথে আরেকজন বলে উঠলো, যাদের এতো সমস্যা তারা প্রাইভেট পরিবহনে চড়লেই পারে। আমার সাথে অনেক তর্কাতর্কি হয় এদের দু’জনের। অথচ আমার হয়ে সিটে বসা কোন নারী/পুরুষ কোন কথাই বললো না। কারণ এগুলো তাদের সাথে হয় নাই, কাজেই কোন দায়ে কথা বলবে? অথচ আমার যে বসতে সমস্যা হচ্ছে দু’একজনের চোখ কিন্তু বারবার তাতে ধাক্কা খাচ্ছিল, কিন্তু ওই যে, অযথা কেন বলবো ভেবে কিংবা অন্য কেউ বলবে ভেবে আর বলা হয়ে উঠে না।

আমার এক কলিগ ওর টিনএজকালীন ঘটনার কথা বলার পর আমি শিউরে উঠেছিলাম। ঘটনাটা ফার্মগেট ব্রিজের। মেডিকেল কলেজে ভর্তি কোচিং এর জন্য ওকে প্রতিদিন ব্রিজটা পার হতে হয়। একদিন মোটামুটি ফাঁকা ব্রিজটায় কোথা থেকে এক লোক এসে হঠাৎ ওর ব্রেস্টে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে এবং মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় ও এতোটায় ঘাবড়ে গেছে যে ও ওখানেই ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। আশেপাশের লোকজন আইডি কার্ডের সহযোগিতায় বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে। অনেকটা দিন লোগেছে এ ঘটনা ভুলতে! আসলেই কি ভুলতে পেরেছে?

মানবাধিকার সংস্থায় ইন্টার্ন করার সময় এক অসহায় মা’কে আমি দেখেছি। আমার কাজ ছিল, উক্ত মায়ের অভিযোগ এন্ট্রি করা। তিনি কিছু বলতে পারছেন না, দেখলাম কেবল তার ৮/৯ বছরের মেয়েটাকে শুধু আড়াল করতে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, যেন বাকরুদ্ধ। অবশেষে আমার সিনিয়র এসে উক্ত মাকে বিভিন্ন ভাবে আশ্বস্ত করে বললেন, তোমার কোন ভয় নেই, তুমি যা বলতে চাও বলো। মায়ের কথা শুনে সেসময় আমি বাকরুদ্ধ কারণ, উনার সেই ৮/৯ বছরের মেয়েটিকে প্রতিরাতে উনার স্বামী বিছানায় নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। আর বলেছে একথা কাউকে বললে মা-মেয়েকে মেরে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে আসবে। কাজেই উনার একটা নিরাপদ আশ্রয় চাই৷ উনি নিজের চোখের সামনে মেয়েটার উপর এই নির্যাতন আর সহ্য করতে পারছেন না ৷

আমাদের আড্ডা শেষ করে একে একে সবাইকে বিদায় করে, মেয়েকে নিয়ে ফিরলাম। মনটা ভারী হয়ে আছে, কখন কী হবে ভেবে! আসলে এভাবে বাঁচা তো কোন বাঁচা না৷ প্রতি মুহূর্তে হিংস্র জানোয়ারদের হাতে থেকে বাচ্চাদের রক্ষা করে চলা, এ যে কি যন্ত্রণা! একেকটা দিন যায়, আর আসন্ন দিনের কথা ভেবে আতংকগ্রস্থ হই। একেকটা সকাল আসে, আলোয় ঝলমলে রোদ্দুরে আলোকিত হই পরক্ষণেই আবার আসন্ন অন্ধকারকে ভেবে শংকিত হই। এর থেকে আসলে নিষ্পত্তি কবে পাবো? পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে।

মেয়েকে বুকে নিয়ে ভাবি, আমি সবসময় যদি এভাবেই একটা নিরাপদ আর সুন্দর আশ্রয় উপহার দিতে পারতাম, শুধু আজ নয়, আগামীর জন্যও নিশ্চিত নিরাপত্তার অঙ্গিকার। কোন সমাধানে আজ আর যাবো না। এইসব দু’পায়া জন্তুদের ফাঁসি হবে না ক্রসফায়ার এর কোনটাতেই আজ আর কোন মত প্রকাশ করবো না, আমাদের প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ, এরজন্য যা করা প্রয়োজন তাতেই আমি একমত।

শুধু বলবো এসব মানসিক বিকৃত জন্তুদের আসলে চিকিৎসা প্রয়োজন, আর তা কার্যকর করতে আমরা যারা সুস্থ আছি তাদের সবাইকে একমত, ঐক্যবদ্ধ হয়ে একসাথে চলতে হবে। সমস্ত বাবা-মায়ের উদ্দেশ্য আমার একটাই আবেদন, আপনারা প্লিজ আর এর মধ্যে রাজনীতিকে টানবেন না। রাজনীতি করার অনেক সুযোগ পাবেন, ঐক্যবদ্ধ হয়ে শুধু মাত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখুন। কেন, কিজন্য, কিভাবে, কি করা যেত আর কি করা উচিত ছিল এসব না দেখে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। অনেক মা-বোন-কন্যার রক্তে এ জন্মভূমি রঙিন হয়েছে, এখনও যদি বোধদয় না হয় আর কবে হবে, বলতে পারেন? মনে রাখবেন, আজ প্রতিবেশীর ঘরে আগুন ধরেছে, পরবর্তী ধাপ কিন্তু আপনার!

শেয়ার করুন:
  • 204
  •  
  •  
  •  
  •  
    204
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.